কূটনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ভারতের অবস্থান পরিবর্তন যেন এই চিরন্তন সত্যকে আবারও প্রমাণ করল। গত মার্চ মাসে এক সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাফ জানিয়েছিলেন, ভারত কোনো দেশের ‘দালাল’ হতে চায় না। তবে আগস্টের শুরুতে এসে সেই অবস্থান থেকে নাটকীয়ভাবে সরে দাঁড়িয়েছে নয়াদিল্লি।
Advertisement
গত ৩১ জুলাই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ করেন জয়শঙ্কর। এই ফোনালাপে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সংঘাতের উত্তাপ কমাতে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে ভারত।
আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের উত্তাপ কমাতে সহযোগিতা করতে চায় ভারতএই প্রস্তাবের পরেই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, ভারত এখন কেন আচমকা মধ্যস্থতাকারী বা জয়শঙ্করের ভাষায় ‘দালাল’ হতে চাইছে?
ইরানের কাছে ভারতের প্রস্তাবভারত ও ইরানের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এই ফোনালাপ ছিল মূলত কৌশলগত। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। নয়াদিল্লি আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত ও উত্তেজনা কমানোর সপক্ষে তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
Advertisement
এস জয়শঙ্কর/ ফাইল ছবি: ফেসবুক
হরমুজ প্রণালিসহ আঞ্চলিক সমুদ্রসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও ক্রুদের ওপর হামলা বন্ধে ইরানের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জবাবে এই পরিস্থিতির জন্য মার্কিন নৌ-অবরোধকে দায়ী করেছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে আলোচনার দরজা খোলা রাখার বিষয়ে দুই পক্ষই একমত হয়েছে।
মার্চের সেই অনড় অবস্থান এবং ইউ-টার্নচলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত ও বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। এ অবস্থায় গত ২৫ মার্চ ভারতকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার অনুরোধ জানান ইরানি রাষ্ট্রদূত ।
আরও পড়ুন প্রশংসায় ভাসছে পাকিস্তান, ইরান যুদ্ধে নীরব কেন ভারত?কিন্তু এর ঠিক পরেরদিনই, অর্থাৎ ২৬ মার্চ এক সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিরোধী দলগুলোর চাপের মুখে স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘ভারত কোনো দালাল রাষ্ট্র হতে পারে না’।
Advertisement
ভারত তখন নিষ্ক্রিয় ‘ধীরস্থির নীতি’ বা ‘ওয়েট-অ্যান্ড-সি পলিসি’ অবলম্বন করেছিল। অথচ সেই অনড় অবস্থান থেকে সরে এসে ভারত এখন নিজেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত থামাতে উদ্যোগী হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের দ্রুত পরিবর্তনই ভারতকে এই ইউ-টার্ন নিতে বাধ্য করেছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ামার্চ মাসে ভারতের অনীহার সুযোগে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সেতু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল পাকিস্তান। এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’ বা দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
আরও পড়ুন ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রেরপরে কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ মধ্যস্থতায় জুনে ৬০ দিনের আরও একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সমঝোতা হয়েছিল।
তবে সম্প্রতি সেই যুদ্ধবিরতি চুক্তি পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও চরম অস্থিতিশীলতার মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে পাকিস্তান যখন দৃশ্যপট থেকে প্রায় ছিটকে গেছে, ঠিক তখন ভারত সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। ইসলামাবাদকে পাশ কাটিয়ে এ অঞ্চলে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এটিই মোক্ষম সুযোগ বলে মনে করছে মোদী সরকার।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদী/ ফাইল ছবি: ফেসবুক
ভারতের অর্থনৈতিক সংকট ও মূল স্বার্থভারত কেন এখন মধ্যস্থতা করতে চাইছে, তার সবচেয়ে বড় কারণ হলো দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও স্বার্থ।
জ্বালানি তেলের বাজারে আগুন: যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি আংশিক অবরুদ্ধ থাকায় ভারতের জ্বালানি তেল ও এলপিজি আমদানি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি আমদানি এই রুট দিয়ে আসত। জ্বালানি সংকট ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইরানের চাবাহার বন্দরে অর্থায়ন বন্ধ করলো ভারত প্রবাসীদের নিরাপত্তা: মধ্যপ্রাচ্যে লাখ লাখ ভারতীয় নাগরিক কাজ করছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ ভারতীয়কে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই বিশাল রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধ থামানো ভারতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বৈশ্বিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা ও ট্রাম্প ফ্যাক্টরভারত নিজেকে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে এবং ওয়াশিংটনের চোখে নিজের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ধরে রাখতে এই মধ্যস্থতা ভারতের জন্য একটি বড় কার্ড।
তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশ গভীর।
আরও পড়ুন স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি? ট্রাম্পকে বলেন মোদীঅন্যদিকে, ইরানের সঙ্গেও রয়েছে ভারতের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক।
নয়াদিল্লি মনে করছে, পাকিস্তান বা কাতারের চেয়ে ভারত অনেক বেশি শক্তিশালী বৈশ্বিক অংশীদার। দুই চিরবৈরী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান—উভয়ের সঙ্গে সমদূরত্ব বজায় রেখে কথা বলার মতো গ্রহণযোগ্যতা এই মুহূর্তে কেবল ভারতেরই রয়েছে।
এ কারণেই মার্চের ‘নিষ্ক্রিয়’ ভারত আগস্টে এসে ‘সক্রিয়’ মধ্যস্থতাকারীর রূপ ধারণ করেছে। নিজের অর্থনীতিকে বাঁচানো এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে পাকিস্তানকে টেক্কা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে নিজেদের জাহির করতেই নয়াদিল্লি এখন তথাকথিত এই ‘দালালির’ সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাইছে না।
সূত্র: দ্য ওয়ার, ইন্ডিয়া টুডে, মেহর নিউজকেএএ/