কর্মীদের চাকরির অবসান নিয়ে অবশেষে ব্যাখ্যা দিয়েছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। কোনো ধরনের অগ্রিম নোটিশ ছাড়াই গত ২৫ জুন ডিএসইর বেশ কয়েকজন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
Advertisement
এ নিয়ে এক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জুলাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) চিঠি দেওয়া হয়।
এরপর সম্প্রতি আর এক দফায় বেশ কয়েকজন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এই চাকরিচ্যুতির ঘটনার প্রতিবাদে রোববার (২ আগস্ট) মতিঝিলে ডিএসইর পুরাতন ভবনের সামনে মানববন্ধন করেন চাকরি হারানোরা।
এর পরই রোববার বিকেলে গণমাধ্যমে এক বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে কর্মীদের চাকরির অবসান নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে ডিএসই। ডিএসইর ব্যাখ্যা হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো—
Advertisement
সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসিতে কিছু কর্মচারীর চাকরির অবসান (Termination) নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা আলোচনা ও বক্তব্য প্রচারিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে এবং সঠিক তথ্য জনসমক্ষে উপস্থাপনের লক্ষ্যে আমরা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান স্পষ্ট করতে চাই।
প্রথমত, এটি স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগ যেমন একটি স্বাভাবিক ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া, তেমনি প্রয়োজনের ভিত্তিতে কর্মীর চাকরির অবসানও একটি স্বাভাবিক, স্বীকৃত ও আইনসম্মত ব্যবস্থাপনা-প্রক্রিয়া। বিশ্বের প্রায় সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই ব্যবসায়িক বাস্তবতা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কিংবা কৌশলগত প্রয়োজনে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সময়ে সময়ে নেওয়া হয়ে থাকে এবং বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি দেশের পুঁজিবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও ভবিষ্যৎ উপযোগী করে গড়ে তুলতে আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক রূপান্তর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছি। এটি কোনো হঠাৎ গৃহীত সিদ্ধান্ত নয়—২০২২ সাল থেকেই প্রতিষ্ঠান এই রূপান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে। সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই কিছু পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং সীমিত সংখ্যক কর্মচারীর চাকরির অবসান ঘটানো হয়েছে। স্পষ্টতার স্বার্থে উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রতিষ্ঠানের মোট ৩৫০ জন কর্মীর মধ্যে মাত্র ১৭ জনের চাকরির অবসান ঘটানো হয়েছে—যা মোট জনবলের ৫ শতাংশেরও কম।
আরও পড়ুন স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে মিলবে কোম্পানির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক তথ্যএই সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ব্যক্তিগত বিবেচনা বা বৈষম্যের আশ্রয় নেওয়া হয়নি। প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন, কার্যকারিতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনা করেই নেওয়া হয়েছে।
Advertisement
ব্যাখ্যায় ডিএসই আরও উল্লেখ করেছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২৬ এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বিদ্যমান সার্ভিস রুল অনুযায়ী আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই ধারা নিয়োগকর্তাকে নোটিশ প্রদান অথবা নোটিশের পরিবর্তে আইন-নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ প্রদান করে, কোনো কারণ প্রদর্শন ছাড়াই চাকরির অবসান ঘটানোর ক্ষমতা দিয়েছে। এটি শ্রম আইনের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান, যা বহু বছর ধরে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুসৃত হয়ে আসছে।
একজন কর্মচারী যেমন নির্ধারিত নোটিশ প্রদান করে বা নোটিশের পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ দিয়ে কোনো কারণ ব্যাখ্যা ছাড়াই পদত্যাগ করতে পারেন, তেমনি আইন নিয়োগকর্তাকেও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে চাকরির অবসান ঘটানোর অধিকার দিয়েছে। সুতরাং এই প্রক্রিয়াকে কোনোভাবেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, অসদাচরণের অভিযোগ বা অন্য কোনো নেতিবাচক বিষয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার অবকাশ নেই। আরও উল্লেখযোগ্য যে, আইন অনুযায়ী ৪ (চার) মাসের বেতনের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করলেই নিয়োগকর্তার আইনগত দায়িত্ব পূরণ হয়। কিন্তু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ শুধু আইনের ন্যূনতম বাধ্যবাধকতা পূরণ করেই থেমে থাকেনি; মানবিক বিবেচনায় এবং বিদায়ী কর্মচারীরা যাতে নতুন কর্মসংস্থানের জন্য পর্যাপ্ত সময় পান, সেই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান আইনগত প্রাপ্যের অতিরিক্ত আরও ২ মাসের বেতন প্রদান করেছে—অর্থাৎ প্রত্যেককে মোট ৬ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন মুনাফা বেড়েছে পাঁচ বিমা কোম্পানির, কমেছে একটিরএছাড়া প্রত্যেক কর্মচারীকে তার চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী ফাইনাল সেটেলমেন্টের আওতায় প্রাপ্য সব অর্থ যথাযথভাবে প্রদান করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, অব্যবহৃত ছুটির নগদায়ন ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা। অনেকের ক্ষেত্রে এই চূড়ান্ত প্রাপ্ত অর্থ বহু মাসের বেতনের সমপরিমাণ। এরই মধ্যে কোম্পানির পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে, যেন তারা তাদের প্রাপ্য অর্থ দ্রুত বুঝে নিয়ে যান।
আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে নিশ্চিত করছি যে, পুরো প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক কর্মচারীর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। তাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সংবেদনশীলতা ও মানবিক আচরণ করা হয়েছে; কোনো ধরনের অপমানজনক বা অসম্মানজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়নি। তাদের জানানো হয়েছে যে সবাইকে যথাযথ অভিজ্ঞতা সনদ (Experience Certificate) প্রদান করা হবে এবং তাদের আইনগত প্রাপ্য ও প্রশাসনিক সহায়তার বিষয়েও প্রতিষ্ঠান পাশে থাকবে।
দুঃখজনকভাবে, চাকরির অবসানের পর কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন মাধ্যমে এমন কিছু বক্তব্য দিচ্ছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ তথ্য বা প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করেই উপস্থাপিত হচ্ছে। আমরা প্রত্যেক নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করি। তবে আমরা বিশ্বাস করি, কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে—এমন কোনো বক্তব্য দেওয়ার আগে তথ্য যাচাই করা প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সবসময় আইনের শাসন, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। আমরা আমাদের কর্মীদের অবদানকে সম্মান করি এবং যেসব সহকর্মী প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্য ও মঙ্গল আন্তরিকভাবে কামনা করি।
একইসঙ্গে আমরা আমাদের সব স্টেকহোল্ডার, বিনিয়োগকারী, তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও সাধারণ জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই—ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও ভবিষ্যতমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইন, নীতি ও সর্বোচ্চ পেশাদার মান বজায় রেখেই তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
এমএএস/এমএমকে