ধর্ম

নবী লুতের (আ.) জাতির বিকৃত যৌনাচার ও ধ্বংসের ইতিহাস

নবী ইবরহিমের (আ.) ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলেন নবী লুত (আ.)। তাঁর বাবা ইন্তেকাল করার পর তিনি প্রথমত দাদা আজর এবং পরে চাচা ইবরাহিমের (আ.) কাছে প্রতিপালিত হন। যখন বাবেলের অধিবাসীরা ইবরাহিমকে (আ.) অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে এবং আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে তিনি সেখান থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন, তখন বাবেলে ইবরাহিম (আ.) ও তার স্ত্রী সারা ছাড় শুধু লুতই (আ.) ছিলেন মুমিন, এ ছাড়া কেউ ইমান আনেনি। আগুনে নিক্ষেপের ঘটনার পর ইবরাহিম (আ.) হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন এবং লুতও (আ.) তাঁর সহগামী হন।

Advertisement

পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা লুতকে (আ.) নবুয়ত দান করেন এবং তাকে জর্ডান নদীর তীরবর্তী ও বর্তমান মৃত সাগরের (ডেড সি) সন্নিকটে অবস্থিত 'সদুম' নগরে গিয়ে ওই নগরের অধিবাসীদের আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দেন। তৎকালীন সময়ে চার হাজার জনসংখ্যার এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রটি একটি অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট ছিল।

সাদুমের অধিবাসীরা চরিত্রহীনতা ও পাপাচারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল। লুত (আ.) এবং তাঁর দুই কন্যা ব্যতিত পুরো জনপদে একজন ইমানদার ব্যক্তিও ছিল না।

পবিত্র কোরআনের আল্লাহ তাআলা বলেন, (শাস্তি আসার আগে) সেখানে যেসব মুমিন ছিল আমি তাদেরকে বের করে নিয়ে আসলাম। তবে আমি সেখানে একটি বাড়ী ছাড়া কোন মুসলমান পাইনি। (সুরা জারিয়াত: ৩৫-২৬)

Advertisement

সাদুমের অধিবাসীরা এমন কিছু জঘন্য পাপের সূচনা করেছিল, যা তাদের পূর্বে পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো জাতি কখনোই করেনি। তারা পুরুষে-পুরুষে যৌনাচার বা সমকামী ব্যভিচারে লিপ্ত হতো। এ ছাড়া তাদের অপরাধের তালিকায় ছিল, শিশু-কিশোরদের ধর্ষণ, ছিনতাই, মুসাফিরদের সম্পদ লুণ্ঠন, জনসমক্ষে প্রকাশ্যে নির্লজ্জ কর্মকাণ্ড ইত্যাদি।

লুত (আ.) ওই নগরে ছিলেন সুদূর বাবেল থেকে আসা একজন প্রবাসী। তিনি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুযায়ী নম্র ভাষায় তাঁদের হেদায়েতের পথে আহ্বান জানালেন। আল্লাহর ওপর ইমান আনা ও ঘৃণ্য পাপাচার ছাড়ার দাওয়াত দিলেন। তিনি তাদের বোঝাতে চাইলেন যে, তারা যা করছে এটা অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ এবং এ রকম কাজ তাদের আগে কেউ করেনি।

কিন্তু সাদুমের অধিবাসীরা লুতের (আ.) উপদেশ গ্রহণ করা তো দূরের কথা, উল্টো তাঁকে সাদুম থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিল। বিদ্রূপ করে বললো, তুমি তো খুব পবিত্র-চরিত্রবান মানুষ! আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দাও, এই শহর ছেড়ে চলে যাও। পাপাচারের অন্ধকার যাদের বিবেককে এতটা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে তাদের মতো বিকৃত রুচি ও চরিত্রের না হওয়াই ছিল তাদের চোখে অপরাধ।

দীর্ঘদিন আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার পরও যখন তারা হেদায়াতের পথে এলো না, উল্টো তাদের ঔদ্ধত্য ও জুলুম বেড়েই চললো, তখন লুত (আ.) আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন, ‘হে আমার রব! এই বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করুন।’ (সুরা আনকাবুত: ৩০)

Advertisement

আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীর দোয়া কবুল করলেন এবং সাদুমের অধিবাসীদের ওপর আজাব নাজিল করার জন্য ফেরেশতাদের পাঠালেন। তারা মানবরূপ ধারণ করে পৃথিবীতে এলেন। প্রথমে গেলেন হজরত ইবরাহিমের (আ.) ঘরে। তিনি ও সারা (আ.) তখন বৃদ্ধ। তারা তাকে সুসংবাদ দিলেন আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় এই বৃদ্ধ বয়সেও তাদের সন্তান হবে। পাশাপাশি সাদুম নগরি ধ্বংসের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা তাকে জানান।

কোমলহৃদয় ইবরাহিম (আ.) সাদুমের অধিবাসীদের আরও কিছুদিন সময় দেওয়ার যায় কি না এ ব্যাপারে ফেরেশতাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ বাদানুবাদ করলেন। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তির সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ইবরাহিমকে (আ.) জানানো হলো, তাদের ধ্বংস করে দেওয়ার ফয়সালা চূড়ান্ত হয়ে গেছে, তারা আর সময় পাবে না।

নবী লুতের (আ.) স্ত্রীও ছিলেন অবিশ্বাসী ও সত্য প্রত্যাখ্যানকারী। দাম্পত্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক যে মানুষকে হেদায়াতের পথে আনতে পারে না, শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারে না, কোরআনে নবী নুহের (আ.) স্ত্রী ও সন্তান এবং লুতের (আ.) স্ত্রীর দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে সে সত্যই স্পষ্ট করা হয়েছে।

ফেরেশতারা সাদুম নগরে সুদর্শন তরুণের বেশে লুতের (আ.) অতিথি হলেন। লুত (আ.) তাদের পরিচয় জানতেন না। তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কারণ তিনি জানতেন, সাদুমের সমকামী লোকেরা এই সুদর্শন অতিথিদের ধর্ষণ করার চেষ্টা করবে।

লুতের (আ.) অবিশ্বাসী স্ত্রী গোপনে গিয়ে নগরবাসীদের এই সুদর্শন তরুণদের আগমনের খবর পৌঁছে দিল। লম্পটের দল লুতের (আ.) ঘরের সামনে এসে হট্টগোল শুরু করল এবং অতিথিদের তাদের হাতে সোপর্দ করার দাবি জানাল।

লুত (আ.) দরজা বন্ধ করে তাদের কাছে এই অনাচার থেকে বিরত হওয়ার জন্য আকুল মিনতি করলেন। কিন্তু কামনার নেশায় অন্ধ সেই জাতি নবীর মিনতি প্রত্যাখ্যান করল।

অবশেষে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) নিজের পরিচয় প্রকাশ করলেন এবং ক্ষণিকের জন্য ঘরের বাইরে এসে তাঁর ডানার এক আঘাতে উন্মত্ত জনতার দৃষ্টিশক্তি চিরতরে ছিনিয়ে নিলেন। তারা অন্ধ হয়ে দেয়াল ধরে অন্ধকারের মধ্যে হাতড়াতে হাতড়াতে পালিয়ে গেল।

জিবরাইল (আ.) লুতকে (আ.) নির্দেশ দিলেন, শেষ রাতে যেন তিনি তার দুই কন্যাকে নিয়ে শহর ত্যাগ করেন এবং যাত্রাপথে কেউ যেন পেছনে ফিরে না তাকায়। তবে লুতের (আ.) স্ত্রীকে পেছনেই ফেলে যেতে বলা হলো, কারণ সেও অপরাধীদের সহযোগী ছিল এবং তার জন্যও শাস্তি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।

সকাল হওয়ার সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলার ভয়ঙ্কর শাস্তি সাদুমের ওপর নেমে এলো। আকাশ থেকে বিরামহীনভাবে পোড়ামাটির পাথরের বৃষ্টি বর্ষিত হলো, সাথে চললো প্রচণ্ড বিকট গর্জন। অবশেষে জিবরাইল (আ.) তার ডানার সাহায্যে পুরো সাদুম শহরকে শূন্যে তুলে উল্টে দিলেন। ওই জায়গাটি ডেড সি বা মৃত সাগরে রূপান্তরিত হলো যা কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত মানবজাতির জন্য নিদর্শন হিসেবে থাকবে।

তথ্যসূত্র:

সুরা হুদ (আয়াত: ৭০–৮৩) সুরা আরাফ (আয়াত: ৮০–৮৪) সুরা আনকাবুত (আয়াত: ২৮–৩৫) সুরা হিজর (আয়াত: ৫৮–৭৭) সুরা শুআরা (আয়াত: ১৬০–১৭৫) সুরা জারিয়াত (আয়াত: ৩১–৩৭) সুরা তাহরীম (আয়াত: ১০) সুনানে ইবনে মাজাহ (হাদিস: ২৫৬১) সুনানে আবু দাউদ (হাদিস: ৪৪৬২) জামে আত-তিরমিজি (হাদিস: ১৪৫৬) আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির কাসাসুল আম্বিয়া, ইবনে কাসির তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা হুদ ও আনকাবুতের ব্যাখ্যাংশ

ওএফএফ