আন্তর্জাতিক

জেন-জি’র দ্রুত চুল পড়ে যাওয়া নিয়ে শত কোটি ডলারের ব্যবসা

বয়স মাত্র বাইশের কোঠায়। কোনো এক বন্ধুর সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা পোস্টে নিজের ছবি দেখে চমকে উঠলেন এক তরুণ। ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলোয় স্পষ্ট ধরা পড়লো, কপালের রেখা পেরিয়ে চুল অনেকটাই পেছনের দিকে সরে গেছে। এটি কোনো একক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশ্বজুড়ে আজ বিশের কোঠার তরুণরা ব্যাপক হারে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও ডার্মাটোলজি ক্লিনিকগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন, যে সমস্যা কয়েক দশক আগেও তাদের দ্বিগুণ বা তিনগুণ বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্র ছিল।

Advertisement

স্বাস্থ্যখাতের এই পরিবর্তনটি কেবল চিকিৎসা তথ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও রূপচর্চা শিল্পে গড়ে তুলছে বিলিয়ন বা শত শত কোটি ডলারের এক বিশাল বাণিজ্যিক ক্ষেত্র।

রোগীদের বয়স কমছে বিশ্বজুড়ে

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দশক আগে চুল পড়ার চিকিৎসায় আসা রোগীদের গড় বয়স ছিল ৩৫ থেকে ৫০ বছর। তারা সাধারণত ‘স্টেজ ৩’ বা ‘স্টেজ ৪’ পর্যায়ের উন্নত টাক বা চুল পাতলা হওয়ার সমস্যা নিয়ে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে পরামর্শ নিতে আসা নতুন গ্রাহকদের বড় একটি অংশই শেষ কিশোরাবস্থা বা বিশের কোঠার শুরুতে থাকা তরুণ জেন-জি প্রজন্ম।

Advertisement

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফ্রন্ট ক্যামেরা, সোশ্যাল মিডিয়া ও হাই-ডেফিনিশন ফিল্টারের যুগে তরুণরা এখন নিজেদের উপস্থিতি ও বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও খুঁতখুঁতে। তবে পরিবর্তনটি শুধু মনস্তাত্ত্বিক নয়। আধুনিক শহুরে জীবনযাপন, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যগ্রহণ, কাজের তীব্র মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত ঘুম ও বায়ুদূষণ মানবদেহে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের জন্ম দেয়। এই প্রদাহের কারণে বংশগত টাকের জিন বা প্রবণতা আগের প্রজন্মের তুলনায় বহু বছর আগেই সক্রিয় হয়ে উঠছে।

চিকিৎসার ফাঁক ও বাণিজ্যিক সুযোগ বিশ্বজুড়ে চুলের সমস্যায় ভোগা ও এর পেছনে খরচ করা গ্রাহকদের মধ্যে এক বিরাট ব্যবধান রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আধুনিক শহরের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ চুল পড়ার সমস্যায় ভুগছেন, কিন্তু তাদের সিংহভাগই প্রথাগত টোটকা বা দোকান থেকে কেনা সাধারণ শ্যাম্পু ও সিরামেই সীমাবদ্ধ থাকেন। খুব কম সংখ্যক মানুষই সরাসরি চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চিকিৎসানির্ভর সমাধান নেন। আর এই জায়গাটিতেই প্রবেশ করেছে বৈশ্বিক কনজিউমার হেলথ ও টেকনোলজি স্টার্টআপগুলো।

বিশ্বজুড়ে চুল পড়ার চিকিৎসা ও পণ্যের বাজার বর্তমানে ৩ থেকে ৩.২৫ বিলিয়ন বা ৩০০ থেকে ৩২৫ কোটি মার্কিন ডলার অতিক্রম করে ২০৩৪-২০৩৫ সালের মধ্যে ৬.৫ বিলিয়ন বা ৬৫০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর দিকে ধাবিত হচ্ছে। সমগ্র হেয়ার কেয়ার ও ট্রান্সপ্লান্ট খাতের পরিসর বিবেচনায় নিলে এই অঙ্ক বিশ্ববাজারে হাজার কোটি ডলারের বৈশ্বিক শিল্পে রূপ নিয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও ডি২সি (D2C) বিপ্লব

Advertisement

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ‘হিমস অ্যান্ড হার্স’ (Hims & Hers)-এর মতো গ্লোবাল হেলথ টেক স্টার্টআপের উদ্ভাবনী মডেল অনুসরণ করে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য কনজিউমার (ভোক্তা) ব্র্যান্ড গড়ে উঠেছে। তারা প্রথাগত শ্যাম্পুর ধারণা বদলে দিয়ে রোগ নির্ণয়ভিত্তিক সাবস্ক্রিপশন মডেলে কাজ করছে। অনলাইন অ্যাসেসমেন্ট, টেলি-মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও অ্যালোপ্যাথিক, নিউট্রাসিউটিক্যালস ও প্রাকৃতিক উপাদানের সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে জেন-জি গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার আওতায় আনা হচ্ছে।

বিনিয়োগকারী ও ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলোও এই ব্যবসায়িক মডেলে শত শত কোটি ডলার ঢালছে। নতুন প্রজন্মের এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বুঝতে পেরেছে যে তরুণ গ্রাহকরা কেবল সাধারণ কসমোটিক পণ্য কিনতে রাজি নয়, বরং তারা সঠিক রোগ নির্ণয় ও কার্যকর সমাধানের জন্য অতি উন্নতমানের চিকিৎসাসেবার সমপরিমাণ অর্থ খরচ করতে প্রস্তুত।

রূপচর্চা ছাড়িয়ে দূরদর্শী অর্থনৈতিক মডেল

বিশ্ববাজারে যে পরিবর্তনটি ঘটছে, তা কেবল এক বোতল শ্যাম্পু বা তেলের সাধারণ কেনাবেচা নয়। এটি গ্রাহকের ৫ থেকে ৬ মাসের একটি ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি। দ্রুত কেনাকাটা বা গণহারে ছাড় দেওয়ার পুরোনো এফএমসিজি (FMCG) মডেল ভেঙে ডিজিটাল হেলথ স্টার্টআপগুলো তরুণদের চিকিৎসা ও জীবনধারার মধ্যে এক মেলবন্ধন তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞ ডার্মাটোলজিস্টদের আন্তর্জাতিক বার্তা খুব স্পষ্ট- ইন্টারনেটের যাচাইহীন টোটকা ও ভুয়া প্রসাধনীতে সময় ও চুল নষ্ট না করে শুরুতেই সঠিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে এই বার্তাটি স্বাস্থ্যসচেতনতার, কিন্তু বাণিজ্যিক দিক থেকে তরুণ প্রজন্মের এই আত্মসচেতনতাই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সেবার ওয়েটিং রুমগুলোকে পরিণত করছে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের এক সম্ভাবনাময় গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রিতে।

সূত্র: এনডিটিভি, পি&এস ইনটেলিজেন্স, স্ফেরিক্যাল ইনসাইট

এসএএইচ