সারাদেশে চলমান গ্যাস সংকটের তীব্র প্রভাব পড়েছে ফেনী জেলায়। শনিবার (১ আগস্ট) সন্ধ্যা থেকে জেলা জুড়ে কার্যত শতভাগ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় দেখা দিয়েছে চরম ভোগান্তি। আবাসিক গ্রাহক, গণপরিবহন এবং শিল্প-কারখানার মালিকরা পড়েছেন এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতিতে।
Advertisement
স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন চালক এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেনীর ১২টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কোনোটিতেই বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ নেই। এর ফলে সিএনজিচালিত অধিকাংশ যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস না পেয়ে চালকদের ফিরে যেতে হচ্ছে। যানবাহন না থাকায় যাত্রীরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। জেলায় যেন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে গ্যাস না থাকায় শিল্প-কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। জেলায় থাকা ৪৫০টিরও বেশি বাণিজ্যিক সংযোগ এবং ৩২ হাজারের বেশি আবাসিক সংযোগে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
আবাসিক গ্রাহকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই তারা কম গ্যাসের সমস্যায় ভুগছিলেন, তবে বর্তমানে পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রান্নাবান্নার জন্য বাধ্য হয়ে মাটির চুলা বা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে বাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করার অভিযোগ তুলেছেন অনেক ভোক্তা। ফলে গ্রাহকদের দ্বিগুণ খরচের বোঝা টানতে হচ্ছে।
Advertisement
অন্যদিকে, গ্যাস না পেলেও তাদের নিয়মিত সরকারি বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ জানান তারা। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস বিল আদায় স্থগিত বা নমনীয় করার দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।
পূর্ব উকিলপাড়ার গৃহিণী ফাহিমা আবেদীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাসায় তিন রকমের রান্নার ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে- লাইন গ্যাস, সিলিন্ডার আর ইলেকট্রিক চুলা। তিন জায়গায় খরচ দিয়ে সংসার চালানো এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
শারমিন আক্তার নামে ডাক্তার পাড়ার এক গৃহিণী বলেন, গত কয়েকদিন ধরে গ্যাসে একদমই আঁচ নেই, গতকাল থেকে পুরোপুরি বন্ধ। বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে মাটির চুলা আর এলপিজি সিলিন্ডার কিনে এনেছি। বাজারে ১২০০ টাকার সিলিন্ডার ১৫০০-১৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। প্রতিদিনের রান্নাবান্না নিয়ে যে কি দুর্ভোগে আছি, তা বলে বোঝানো যাবে না।
শহরতলীর লালপুলের মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন নামে এক আবাসিক গ্রাহক বলেন, চুলায় একদিনও গ্যাস পাব না, অথচ মাসের শেষে লাইনের বিল এক টাকাও কম দেওয়া যাবে না! বিল না দিলে সংযোগ কেটে দেওয়ার ভয় থাকে। সরবরাহ যদি ঠিকই না থাকে, তবে আমাদের থেকে কেন নিয়মিত পুরো বিল আদায় করা হবে? সরকারিভাবে গ্যাস না দেওয়া পর্যন্ত এই বিল বাতিল বা স্থগিত রাখা উচিত।
Advertisement
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও গ্রাহক কামরুল হাসান বলেন, একদিকে চুলায় গ্যাস নেই, অন্যদিকে সিলিন্ডার বিক্রেতারা এই সুযোগে কৃত্রিম সংকট বানিয়ে ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাচ্ছে। তদারকি করার কেউ নেই। আমরা দ্বিগুণ খরচের চাপে পিষ্ট হচ্ছি। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।
গ্যাস সংকটে বৈদ্যুতিক চুলায় করা হচ্ছে রান্না/ /ছবি জাগো নিউজ
বর্তমানে ফেনীর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লালপুল এলাকার ‘স্টার লাইন সিএনজি ফিলিং স্টেশন’ সহ অন্যান্য স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি।
মো. খোরশেদ আলম নামের এক সিএনজি অটোরিকশা চালক বলেন, সারারাত গাড়ি নিয়ে স্টেশনে লাইন ধরি, সকালে মালিক স্টেশনের পাম্প বন্ধ করে দিল। গাড়ি চালাইতে না পারলে দিনশেষে মালিকের জমার টাকা দিব কোথা থেকে, আর বাড়িতে বাজার নিয়ে যামু কেমনে?
সিএনজি অটোচালক আবদুল জলিল বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। সরকার দ্রুত গ্যাস না দিলে আমরা পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরবো।
আরও পড়ুন বন্ধ হচ্ছে সিএনজি স্টেশন, বাসায়ও জ্বলছে না চুলাসংকট কেবল বাসা-বাড়ি বা পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নেই, থাবা বসিয়েছে স্থানীয় শিল্প-কারখানাতেও। গ্যাসের প্রেশার বা চাপ স্বাভাবিক না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে, প্রতিদিন গুণতে হচ্ছে লোকসান।
ফেনী বিসিক শিল্প নগরীর শিল্প উদ্যোক্তা আতাউর রহমান টিটু বলেন, শিল্প-কারখানাতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি কীভাবে হবে? এক বছরে নাকি দেড় কোটি চাকরির ব্যবস্থা করবে সরকার। শনিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়া ফেনী শিল্পনগরীতে গ্যাস নেই। উৎপাদন বন্ধ।
গ্যাস না থাকার বিষয়ে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় ফেনীতে গ্যাস বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে।
দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে জনভোগান্তি লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সমাজ।
আবদুল্লাহ আল-মামুন/এসজেডএইচ/এএসএম