খেলাধুলা

বিশ্বকাপ ইস্যুতে বড় ধাক্কা, ফিফা সভাপতির পদ হারাতে পারেন ইনফান্তিনো!

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে এক দশক ধরে নিজের অবস্থান শক্তভাবে ধরে রেখেছিলেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের পর একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে এখন তার নেতৃত্বই বড় প্রশ্নের মুখে। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর ফিফা সভাপতির পদে তার ভবিষ্যৎ নিয়েও শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।

Advertisement

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, গত এক সপ্তাহে ইনফান্তিনোর একাধিক ভুল সিদ্ধান্ত তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। যে পুনর্নির্বাচনকে এতদিন আনুষ্ঠানিকতা মনে করা হচ্ছিল, সেটিই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পথ আর সহজ নয়

২০২৭ সালে ফিফা সভাপতির নির্বাচন হওয়ার কথা। এতদিন ধারণা করা হচ্ছিল, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই আরও এক মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন ইনফান্তিনো। কিন্তু বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা সামনে আসতেই পরিস্থিতি বদলে যায়।

Advertisement

তাকে অপসারণের একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। ফিফার অন্তত ৪৩টি সদস্যদেশ অনাস্থা ভোটের দাবি তুললে বিষয়টি ভোটাভুটিতে যেতে পারে। তবে শুধু অনাস্থা ভোটই যথেষ্ট নয়, ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে একজন শক্তিশালী বিকল্প প্রার্থীও দরকার। এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রার্থী সামনে আসেননি।

আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করতে হবে। এরপর ২০২৭ সালের ১৮ মার্চ মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে ভোটাভুটি হবে।

২০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনাই কাল?

ইনফান্তিনোর সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয় ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) গঠনের পরিকল্পনা। এই নতুন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় টুর্নামেন্টগুলোর সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি ও লাইসেন্সিংয়ের বাণিজ্যিক অধিকার পরিচালনার কথা ছিল।

Advertisement

এর ছোট একটি অংশের মালিকানা ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মূল্যায়নে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেন ইনফান্তিনো।

প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে ফিফার ২১১টি সদস্যদেশকে তাৎক্ষণিকভাবে ২ কোটি ডলার এবং ২০৩৭ সালের মধ্যে আরও ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত বড় আর্থিক প্রস্তাবও সদস্য দেশগুলোর আপত্তি দূর করতে পারেনি।

ইউরোপ, এশিয়া ও কনকাকাফের সরাসরি ‘না’

ইনফান্তিনোর সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে তিন মহাদেশীয় কনফেডারেশন থেকে। উয়েফা (ইউরোপ), এএফসি (এশিয়া) এবং কনকাকাফ (উত্তর ও মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান)- তিন সংস্থাই প্রকাশ্যে এই পরিকল্পা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই তিন কনফেডারেশনের সদস্যসংখ্যা মিলিয়ে ১৪৩টি। অথচ প্রস্তাব পাস করাতে ইনফান্তিনোর প্রয়োজন ছিল মাত্র ১০৬ ভোট। ফলে সংখ্যার হিসাবেই পরিকল্পনাটি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন উয়েফা জানিয়ে দেয়, পরিকল্পনা বাতিল না হলে ইউরোপের ৫৫টি সদস্যদেশ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বয়কট করবে। স্পেন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি কিংবা ইতালির মতো দল ছাড়া বিশ্বকাপ আয়োজনের চিন্তাই যে অবাস্তব, সেটি পরিষ্কার হয়ে যায়।

নিজের ঘরেও ভাঙন

শুধু বাইরের বিরোধিতাই নয়, ফিফার ভেতরেও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। ফিফার সিনিয়র উপদেষ্টা এবং সাবেক যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কার্লোস কর্দেইরো প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন। তিনি এই বিনিয়োগ পরিকল্পাকে ‘ফুটবলের জন্য খারাপ চুক্তি’ বলে মন্তব্য করেন।

এছাড়া ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) কেভিন লামোরও অভিযোগ করেন, এই পরিকল্পনা তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য গোপন করা হয়েছে এবং তারা প্রতারিত বোধ করেছেন। এসব ঘটনা ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর আস্থার সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিতর্ক যেন পিছুই ছাড়ছে না

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক সিদ্ধান্তের কারণে সমালোচিত হয়েছেন ইনফান্তিনো। পূর্ণাঙ্গ বিডিং প্রক্রিয়া ছাড়াই সৌদি আরবকে ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

এরপর লিওনেল মেসিকে খেলানোর উদ্দেশ্যে ইন্টার মিয়ামিকে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালেও নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফা পিস প্রাইজ দেওয়া, ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার প্রকাশ্য অবস্থান অনেকের চোখে ফিফার নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।

এমনকি ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ড প্রত্যাহারে তিনি ইনফান্তিনোর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এসব ঘটনাও সমালোচনার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলে দেয়।

সামনে আরও বড় লড়াই

বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হওয়ার পরও ইনফান্তিনোর সামনে সংকট শেষ হচ্ছে না। ৪৮ দলের বিশ্বকাপকে আরও বাড়িয়ে ৬৪ দলে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েও ইতোমধ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি উয়েফার সঙ্গে সম্পর্কও এখন তলানিতে।

রাজনৈতিকভাবে এখনও ইনফান্তিনোর পাশে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, কাতারের রাজপরিবার এবং সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো প্রভাবশালী নেতারা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার রাজনীতিতে সমর্থন তখনই থাকে, যখন নেতৃত্ব কার্যকর থাকে। যদি ইনফান্তিনো তার প্রভাব হারাতে থাকেন, তাহলে সেই সমর্থনও দ্রুত সরে যেতে পারে।

এক সময় যাকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হতো, সেই ইনফান্তিনো এখন একসঙ্গে কয়েকটি ফ্রন্টে লড়ছেন—বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ, ফিফার শাসনব্যবস্থা, উয়েফার বিরোধিতা এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের সভাপতির চেয়ার রক্ষার জন্য।

বিশ্বকাপকে ঘিরে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার ফুটবল প্রশাসনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

আইএইচএস/