খেলাধুলা

ইনফান্তিনোর বিদায় ঘণ্টা! ফিফা সভাপতির দৌড়ে ৬ নতুন নাম

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলেও তাতে সংকট কাটেনি। বরং ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার ফুটবল প্রশাসকদের একাংশ এখন প্রকাশ্যেই ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

Advertisement

আগামী ২০২৭ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা সভাপতির নির্বাচনকে সামনে রেখে ইনফান্তিনোর অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসসহ কয়েকটি ফুটবল সংস্থা তার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের কথা বিবেচনা করছে বলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।

বিতর্কের সূত্রপাত ফিফার প্রস্তাবিত ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) প্রকল্প নিয়ে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে উয়েফার অধীনে ইউরোপের ৫৫টি সদস্য দেশ কঠোর আপত্তি জানায়। তারা হুঁশিয়ারি দেয়, পরিকল্পনা প্রত্যাহার না হলে ভবিষ্যতে ফিফার টুর্নামেন্ট বয়কট করতেও পিছপা হবে না।

শুধু উয়েফাই নয়, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনও ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের সমালোচনা করেছে। এএফসি তো ফিফার শাসনব্যবস্থার জরুরি পর্যালোচনারও দাবি তুলেছে।

Advertisement

এই পরিস্থিতিতে ইনফান্তিনোর সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কয়েকটি প্রভাবশালী নাম আলোচনায় উঠে এসেছে। আসুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক নামগুলো-

১. আলেকসান্দার চেফেরিনসবচেয়ে আলোচিত নাম উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিন। দীর্ঘদিন ধরেই ইনফান্তিনোর নীতির সমালোচক হিসেবে পরিচিত চেফেরিন। যদিও তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ফিফা সভাপতি পদে লড়ার আগ্রহ দেখাননি, তবুও ইউরোপের অনেক সদস্য দেশ তাকে সবচেয়ে যোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে।

ইনফান্তিনোর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত চেফেরিন সম্প্রতি ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালেও উপস্থিত ছিলেন না। বিতর্কে জর্জরিত সেই টুর্নামেন্টে বিশেষ করে ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের 'রিভিউ' অনুরোধের পর স্থগিত করা হলে উয়েফা সেটিকে 'শেষ সীমা অতিক্রম' বলে আখ্যা দেয়।

স্লোভেনিয়ার এই আইনজীবী ২০১৬ সাল থেকে উয়েফার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন এবং আপাতত একই পদে থাকতে আগ্রহী বলেই জানা গেছে। শুরুতে তিনি আগামী বসন্তে তৃতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচন করবেন না বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এখন অন্য কোনো শক্তিশালী প্রার্থী না এলে পুনর্নির্বাচনে দাঁড়ানোর বিষয়ে তিনি আগ্রহী বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Advertisement

বর্তমান পরিস্থিতিতে চেফেরিন নিজে ফিফা সভাপতির নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে খুব একটা আগ্রহী নন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। আর সে কারণেই উয়েফার সদস্য দেশগুলো এখন বিকল্প প্রার্থী খুঁজতে শুরু করেছে।

২. নাসের আল-খেলাইফিআরেকটি বড় নাম নাসের আল-খেলাইফি। প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনের সভাপতি এবং কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্টের চেয়ারম্যান হিসেবে বিশ্ব ফুটবলে তার প্রভাব ব্যাপক। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডসহ কয়েকটি উয়েফা সদস্য দেশ তাকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম টকসস্পোর্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডসহ উয়েফার একাধিক সদস্য ফেডারেশন মনে করে, আগামী বছরের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে হারানোর সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা আল-খেলাইফিরই রয়েছে। তাই তারা তার প্রার্থিতাকে সমর্থন জানাতে প্রস্তুত।

তবে বাস্তবে আল-খেলাইফিকে নির্বাচনে দাঁড় করানো সহজ হবে না। কারণ, এই মুহূর্তে ফিফা সভাপতির পদে লড়ার কোনো আগ্রহই তার নেই।

পলিটিকো-কে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় আল-খেলাইফির একজন মুখপাত্র বলেন, নাসেরের ফিফার দায়িত্ব নেওয়ার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কোনো ইচ্ছা বা কোনো আগ্রহ নেই। তিনি বিশ্ব ও ইউরোপীয় ফুটবলের সব প্রতিষ্ঠানকে নীরবে সমর্থন দিয়ে যাবেন।

৩. দারিউশ মিওদুস্কিদারিউশ মিওদুস্কিকেও সম্ভাব্য ফিফা সভাপতি প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছে উয়েফার কয়েকটি সদস্য দেশ। বর্তমানে পোল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব লেজিয়া ওয়ারশ-এর মালিক এই পোলিশ আইনজীবীর প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন ইউরোপের কয়েকজন প্রভাবশালী ফুটবল প্রশাসক।

টকস্পোর্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানি এবং স্পেনের ফুটবল ফেডারেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মিওদুস্কির নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনা করছেন।

তবে নিজ দেশ পোল্যান্ডেই এখনো তিনি প্রথম পছন্দ নন। কারণ, পোল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিজেডপিএন) ফিফা সভাপতি নির্বাচনে নাসের আল-খেলাইফিকে সমর্থন দিতেই বেশি আগ্রহী বলে জানা গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে তার নাম আলোচনায় থাকলেও নিজ দেশের পূর্ণ সমর্থন এখনো নিশ্চিত হয়নি।

৪. ভিক্টর মন্টাগলিয়ানিউয়েফার বাইরে থেকে ইনফান্তিনোর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ভিক্টর মন্টাগলিয়ানি। উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফের এই কানাডিয়ান সভাপতি একদিন ফিফার সভাপতি হওয়ার ইচ্ছা দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ্যে পরিচিত।

২০২৩ সালে সর্বসম্মতিক্রমে তিনি আবারও কনকাকাফের সভাপতি নির্বাচিত হন। তার বর্তমান মেয়াদ ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। এতদিন তার প্রধান লক্ষ্য ছিল আগামী বছর কনকাকাফের সভাপতি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হওয়া।

তবে দ্য আই-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মন্টাগলিয়ানি এখন সেই পরিকল্পনা এগিয়ে এনে ২০২৭ সালের মার্চে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা সভাপতি নির্বাচনে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তার প্রতি সমর্থনও ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বিক্রির ফিফার প্রস্তাবের বিরোধিতায় কনকাকাফও উয়েফার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ওই পরিকল্পা প্রত্যাখ্যান করলেও, উয়েফার মতো ফিফার টুর্নামেন্ট বয়কটের হুমকি দেয়নি।

৫. শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফাএশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও প্রকাশ্যে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিতর্কিত পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে, যা বর্তমান ফিফা সভাপতির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইনফান্তিনোর অন্যতম শক্তিশালী সমর্থনঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল।

এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা, যিনি একই সঙ্গে ফিফা কাউন্সিলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টও, আঞ্চলিক সংস্থাটির ৪৭টি সদস্য ফেডারেশনের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সদস্যদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ না করাকে 'সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য' বলে আখ্যা দেন।

এর একদিন পর এএফসি আনুষ্ঠানিকভাবে ইনফান্তিনোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং এক বিবৃতিতে ফিফার শাসনব্যবস্থার জরুরি পর্যালোচনার দাবি জানায়। এতে ইনফান্তিনোর ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, শেখ সালমান নিজেই কি ফিফা সভাপতির নির্বাচনে ইনফান্তিনোর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন? যদিও এ বিষয়ে তিনি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি, তবুও তার নাম সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় আলোচিত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, এএফসি সভাপতির বর্তমান মেয়াদও ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার কথা।

৬. আর্সেন ওয়েঙ্গারযদিও সম্ভাবনাটা এখনো বেশ ক্ষীণ, তবুও আলোচনায় উঠে এসেছে কিংবদন্তি কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের নাম।

আর্সেনালের সাবেক এই সফল কোচ বর্তমানে ফিফার চিফ অব গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই ভূমিকায় তিনি ধীরে ধীরে ফুটবলের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করছেন।

ওয়েঙ্গার অতীতেও সাহসী ও মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাব দিতে পিছপা হননি। চলতি বছরের শুরুতে কানাডায় তার প্রস্তাবিত 'ডেলাইট অফসাইড রুল' পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা ফুটবলের আইন পরিবর্তনের সম্ভাব্য উদ্যোগগুলোর একটি।

তবে ইনফান্তিনোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বিশ্বকাপের বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনায় ফিফার অবস্থানের কারণে সমর্থকদের একাংশ ওয়েঙ্গারের ভূমিকাও সমালোচনা করছেন। তাই প্রশ্ন উঠছে, নিজের দীর্ঘদিনের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে তিনি কি শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ফিফা সভাপতির নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন?

এ মুহূর্তে এমন সম্ভাবনা অনেকটাই জল্পনার পর্যায়ে থাকলেও, বিশ্ব ফুটবলের রাজনীতিতে ওয়েঙ্গারের নাম নজরে রাখার মতো বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নিয়ে সৃষ্ট সংকট ইনফান্তিনোর জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে দেখা দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ২০২৭ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে তিনি আবারও সমর্থন ফিরে পান, নাকি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পদে দেখা যায় নতুন কোনো মুখ।

এমএমআর