ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাটির কাউন্সিল সদস্যদের একটি অংশ তার নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবিও উঠতে পারে।
Advertisement
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাব ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে বর্তমান সংকটের সূচনা হয়েছিল আরও আগে, ২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা রহস্যজনকভাবে প্রত্যাহারের ঘটনায়।
গার্ডিয়ানের দাবি, ফিফার ভেতরে অসন্তুষ্ট সদস্যরা তখন থেকেই একটি বিশেষ বৈঠক ডাকার চেষ্টা করছিলেন। তাদের অভিযোগ, বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি। বরং এতে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একাধিক ফোনকলের পরই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বালোগুনের লাল কার্ড বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র সুবিধা পেয়েছিল বলে মনে করেন সমালোচকরা। এ ঘটনায় নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, ফিফা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করেছে এবং রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে।
Advertisement
যদিও ফিফা শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, সব ধরনের নিয়ম মেনেই স্বাধীনভাবে তাদের নৈতিকতা কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য নথি এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে।
এর মধ্যেই ইনফান্তিনো নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েন ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক অধিকার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি এর ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব দেন তিনি।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছিল থ্রাইভ ক্যাপিটাল, যা প্রতিষ্ঠা করেছেন জশুয়া কুশনার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ছোট ভাই। এই সম্পর্কও পুরো প্রস্তাবকে ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।
ইতোমধ্যে ইউরোপিয়ান ফুটবল সংস্থা (উয়েফা), এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং কনকাকাফ প্রকাশ্যে এই পরিকল্পার বিরোধিতা করেছে। তীব্র সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনোকে সেই পরিকল্পা থেকে সরে আসতে হয়েছে। তবে এতেও ক্ষোভ কমেনি।
Advertisement
গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ফিফা কাউন্সিলের অসন্তুষ্ট সদস্যদের সংখ্যা বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির প্রস্তাবের আগেই দুই অঙ্কে পৌঁছে গিয়েছিল। পরে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ায় সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ফিফা কাউন্সিলে রয়েছেন ছয় মহাদেশীয় কনফেডারেশনের ২৮ প্রতিনিধি, আটজন সহ-সভাপতি এবং সভাপতি ইনফান্তিনো-মোট ৩৭ সদস্য। ফিফার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জরুরি বৈঠক ডাকতে অন্তত ৫০ শতাংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। অর্থাৎ ৩৭ সদস্যের মধ্যে কমপক্ষে ১৯ জনকে একমত হতে হবে। গার্ডিয়ানের দাবি, সেই সংখ্যা অর্জন করা এখন আর খুব দূরের বিষয় নয়।
প্রতিবেদন বলছে, বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে অসন্তুষ্ট সদস্যরা প্রথমেই বালোগুন ইস্যুতে একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলবেন। ইনফান্তিনো যদি সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হতে পারে।
একের পর এক বিতর্ক, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির ব্যর্থ উদ্যোগ, বিভিন্ন কনফেডারেশনের প্রকাশ্য বিরোধিতা এবং ফিফার অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ—সব মিলিয়ে গত এক দশকে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। এখন দেখার বিষয়, কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তার বিরুদ্ধে একজোট হতে পারেন কি না, নাকি শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হন ফিফার বর্তমান সভাপতি।
আইএইচএস/