বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বকেই বড় সংকটে ফেলে দিয়েছে। এবার তার পুনর্নির্বাচনের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ), যা ইনফান্তিনোর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
Advertisement
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, ফিফাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়ে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে এফএ। এর আগে ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন প্রথম সদস্য সংস্থা হিসেবে প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের বিরোধিতা করে। এবার ইংল্যান্ডও একই পথে হাঁটতে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ফুটবল সংস্থা ইংল্যান্ডের এফএর এমন সিদ্ধান্ত ফিফার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এতে অন্য সদস্য দেশগুলোকেও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করতে পারে।
বিতর্কের সূত্রপাত
Advertisement
সম্প্রতি ফিফা ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বকাপসহ ফিফার বাণিজ্যিক সম্পদের ২০ শতাংশ সংখ্যালঘু মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাব ছিল।
প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের এই প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ইটারনাল-কে প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে রয়েছেন জোশুয়া কুশনার, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।
এই পারিবারিক সম্পর্ক নিয়েও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প পরে দাবি করেন, পরিকল্পনাটি বাতিল হওয়ার আগে এ বিষয়ে ইনফান্তিনোর সঙ্গে তার কোনো আলোচনা হয়নি।
উয়েফার কঠোর অবস্থান
Advertisement
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার সবচেয়ে জোরালো বিরোধিতা করে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা।
এক পর্যায়ে তারা নারী বিশ্বকাপ, ২০৩০ পুরুষ বিশ্বকাপসহ সব ধরনের ফিফা প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকি দেয়। এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ফিফার সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টগুলোর গুরুত্ব ও আর্থিক ভিত্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
তীব্র বিরোধিতার মুখে ইনফান্তিনো শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা স্থগিত করেন। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। উয়েফা জানিয়েছে, তারা ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছে এবং পুরো বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
উয়েফার ভাষায়, এটি ছিল ফুটবলের ইতিহাসে একটি ‘অস্বচ্ছ ও পর্দার আড়ালের চুক্তি’, যা আন্তর্জাতিক ফুটবলের শাসনব্যবস্থার ওপর আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ফিফার ভেতরেও বিদ্রোহ
বিতর্ক শুধু বাইরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফিফার অভ্যন্তরেও শুরু হয়েছে অসন্তোষ। ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো এই পরিকল্পনার প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) কেভিন লামোরও অভিযোগ করেন, পুরো প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ইনফান্তিনো ফিফার কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করেছেন।
এছাড়া উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, বিশ্বকাপের ভবিষ্যতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো অর্থবহ আলোচনা করা হয়নি।
রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে
শুধু ফুটবল প্রশাসকরাই নন, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রকাশ্যে বলেছেন, ফিফার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ইনফান্তিনো ‘সঠিক ব্যক্তি নন’। তার এই মন্তব্য ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবুও সমর্থন রয়েছে
সব দিক থেকে অবশ্য ইনফান্তিনো একঘরে হয়ে পড়েননি। মরক্কো, মিশর, কাতারসহ আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশের ফুটবল সংস্থা এখনও প্রকাশ্যে তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
তবে ২০২৭ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা সভাপতির নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের এফএ আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন প্রত্যাহার করলে আরও অনেক সদস্য সংস্থা একই পথে হাঁটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিছুদিন আগেই সমর্থন প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছিল জার্মানি।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, পর্যাপ্তসংখ্যক সদস্য দেশ ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে ফিফার বিশেষ কংগ্রেস আহ্বানের দাবিও জোরালো হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আইএইচএস/