সব মানুষের মন জয় করতে আলাদা কোনো প্রতিভা লাগে না। না লাগে অতিরিক্ত কথা বলার দক্ষতা, না লাগে চটকদার ব্যক্তিত্ব। অনেক সময় আমাদের দৈনন্দিন ছোট ছোট অভ্যাসই ঠিক করে দেয় আমাদের সঙ্গে মানুষ থাকতে চায় কি না। আমরা কীভাবে কথা বলি, শুনি, রাগ সামলাই বা ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে আচরণ করি এসবই ধীরে ধীরে আমাদের পরিচয় গড়ে তোলে।
Advertisement
অথচ নিজের অজান্তেই এমন কিছু অভ্যাস আমরা লালন করি, যা মানুষকে কাছে টানার বদলে দূরে ঠেলে দেয়। সুখবর হলো এই অভ্যাসগুলো বদলানো অসম্ভব নয়। একটু সচেতন হলেই আচরণে আসতে পারে বড় পরিবর্তন, আর তাতেই আপনি হয়ে উঠতে পারেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও পছন্দের মানুষ।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বার্কলির গ্রেটার গুড সায়েন্স সেন্টারের বিজ্ঞান পরিচালক এমিলিয়ানা সাইমন-টমাসের মতে, ভদ্রতা মানে হলো আপনি যাদের সঙ্গে মিশছেন, তাদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখা। ধরে নেওয়া যে, তারাও জীবনে সুখ, শান্তি ও পূর্ণতা চায় ঠিক যেমনটা আপনি চান। কেউই কষ্ট বা বিপদের মুখোমুখি হতে আগ্রহী নয়।
তিনি আরও বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে গঠিত যে আমরা যখন অন্যের উপকার করি, তখন ভেতরে এক ধরনের উষ্ণ ভালো লাগা কাজ করে। এতে আনন্দের সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে।
Advertisement
অন্যের প্রতি কঠোর না হওয়ার সহজ কৌশল হলো ইচ্ছাকৃতভাবে মিল খোঁজা। হতে পারে পোশাকে মিল, কথা বলার ভঙ্গি, হাত নাড়ার ধরন বা কণ্ঠস্বরের সুর। নিজেকে প্রশ্ন করুন এটা কি আমিও করি? মানুষ হিসেবে কোথাও না কোথাও আমাদের সবারই মিল আছে। এই অনুভব সহানুভূতি বাড়ায় এবং একেবারে ভিন্ন জগতের মানুষের সঙ্গেও সৌজন্য বজায় রাখা সহজ করে।
আরও পড়ুন: কষ্ট কমাতে খেতে পারেন ‘ব্রেকআপ কেক’ সমবয়সী না বয়সে ব্যবধান, কোন দাম্পত্য বেশি টেকসই? মন ভালো রাখার ছোট ছোট অভ্যাস ছোট বা বড় উপকার করুনঅন্যের কাজে লাগতে পারলে ভালো লাগাটাই স্বাভাবিক। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ বা দান মানুষের মন ভালো রাখে। তবে সাহায্য মানেই বড় কিছু নয় রক্তদান, কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ মানুষের জন্য রান্না করা এসবও গভীর অর্থবহ সহায়তা।
আপনি শুনছেন এটা বোঝানমানুষের কাছে প্রিয় হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো মন দিয়ে শোনা। ইউনিভার্সিটি অব কানেটিকাটের অধ্যাপক আমান্ডা কুপার বলেন, সত্যিকারের শোনা সহজ নয়; এতে মানসিক উপস্থিতি প্রয়োজন। চোখে চোখ রেখে কথা বলা, শরীর সামান্য সামনে ঝুঁকিয়ে রাখা এসবই মনোযোগের ইঙ্গিত। কথা বলার সময় ফোনে ডুবে থাকা এড়িয়ে চলুন। আপনি ভাবতে পারেন, শুনছেনই তো; কিন্তু সামনে থাকা মানুষটি তা নাও ভাবতে পারেন।
জানতে আগ্রহী হয়ে প্রশ্ন করুনএমন প্রশ্ন করুন, যার উত্তর আপনি আগে জানতেন না। এতে অপরজন বুঝতে পারেন আপনি তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার কথা শেষ না হতেই নিজের অভিজ্ঞতা শুরু করবেন না। বরং তাকে আরও বলার সুযোগ দিন। এতে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে।
Advertisement
একটি আন্তরিক হাসি অনেক সময় ভদ্রতার সবচেয়ে সহজ প্রকাশ। তবে সেটি হতে হবে মন থেকে। মানুষ অবচেতনে একে অপরের অনুভূতি অনুকরণ করে একজন হাসলে অন্যজনও হাসতে চায়। অচেনা মানুষের সঙ্গে এমন হাসি বিনিময় বিশ্বাস আর স্বস্তির আবহ তৈরি করে।
অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে হালকা থাকুনলম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে সবাই যখন বিরক্ত, তখন হালকা আলাপ বা ছোট্ট রসিকতা পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। অল্প সময়ের এমন সংযোগও মন ভালো করে এবং চারপাশের পরিবেশকে সহনীয় করে তোলে।
নাম ধরে ডাকুনকারও নাম মনে রাখা ও ব্যবহার করা সৌজন্যের শক্তিশালী প্রকাশ। মানুষ নিজের নাম শুনতে ভালোবাসে। নাম ধরে ডাকলে বোঝানো হয় ‘আমি আপনাকে চিনি, আপনাকে গুরুত্ব দিই।’ প্রতিবেশী, সহকর্মী বা তাদের সন্তানের নাম জানা সম্পর্ককে আরও উষ্ণ করে।
ভিন্ন মানুষের জন্য জায়গা রাখুনমত বা বিশ্বাসে অমিল মানেই সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। বরং এখানেই ভদ্রতার সবচেয়ে পরিণত রূপটি প্রকাশ পায়। যার সঙ্গে আপনার মত মিলছে না, তার সঙ্গেও আপনি কেমন আচরণ করছেন এটাই আসলে আপনার মানবিকতার পরিচয়। শুরুর দিকে মিল আছে এমন বিষয় নিয়ে কথা বলুন। এতে মতভেদ অস্বীকার হয় না, বরং ভবিষ্যতের গঠনমূলক আলোচনার পথ তৈরি হয়। একই বিশ্বাস না থাকলেও একসঙ্গে সময় উপভোগ করা সম্ভব, যদি সেখানে সহানুভূতি ও উদারতা থাকে।
তথ্যসূত্র: টাইমডটকম
জেএস/