লাইফস্টাইল

বাবা-মাকে ভালোবাসতে দেখলে সন্তান কী শেখে

আমাদের দেশে অল্প কিছুদিন আগেও স্বামী-স্ত্রী নিজেদের ঘরের বাইরে পরিবারের সন্তান বা অন্য সদস্যদের সামনে একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করাকে ভালো চোখে দেখা হতো না।

Advertisement

কথা বলার সময় হাত স্পর্শ করা, দুর্বল মুহূর্তে একটু জড়িয়ে ধরা, বিদায় নেওয়ার সময় কপালে একটা চুমু এঁকে দেওয়া - এগুলো অনেকটা গ্রহণযোগ্য হয়ে আসলেও অনেকে এখনও মেনে নিতে পারেন না। ভাবেন – সন্তান এসব দেখে অকালপক্ব হয়ে যাবে।

তবে আপনি কি জানেন আসলে সন্তানের ওপর এর প্রভাব কী? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের সামনে বাবা-মায়ের স্বাস্থ্যকর স্নেহ ও ভালোবাসার প্রকাশ তাদের মানসিক নিরাপত্তা, সম্পর্কবোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ধারণা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১. মানসিক নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি হয়

শিশুরা যখন দেখে তাদের বাবা–মা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, কথা বলছে, হাসছে বা আদর করছে, তখন তারা বুঝতে শেখে, পরিবার একটি নিরাপদ জায়গা। গবেষণায় দেখা গেছে, এমন পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা তুলনামূলকভাবে কম উদ্বিগ্ন হয় এবং তাদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বেশি থাকে। কারণ তারা জানে, পরিবারের মূল সম্পর্কটি স্থিতিশীল।

Advertisement

২. সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত - সেটা শেখে চোখে দেখে

শিশুদের জন্য বাবা-মা প্রথম রোল মডেল। তারা ভালোবাসা, সম্মান, যত্ন - এই বিষয়গুলো বই পড়ে নয়, বরং প্রতিদিন দেখে শেখে। বাবা-মা যদি একে অপরের কথা মন দিয়ে শোনে, সম্মান করে এবং স্নেহ প্রকাশ করে, তাহলে শিশুদের মনে স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের একটি বাস্তব ছবি তৈরি হয়। ভবিষ্যতে তারা বন্ধুত্ব বা প্রেমের সম্পর্কে গেলে সেই অভিজ্ঞতার ছাপ পড়ে।

৩. আবেগ প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হয়

যেসব ঘরে অনুভূতি প্রকাশ স্বাভাবিক, সেসব ঘরের শিশুরা নিজের আবেগ প্রকাশেও বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বাবা-মায়ের স্নেহ দেখলে শিশুরা বুঝতে পারে - ভালোবাসা প্রকাশ করা লজ্জার নয়, বরং স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। এতে তাদের আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বাড়ে।

৪. আত্মসম্মান ও সামাজিক দক্ষতা বাড়ে

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাবা–মায়ের সম্পর্ক সন্তোষজনক হলে শিশুদের আত্মসম্মান তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। তারা স্কুলে বা বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তেও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়। কারণ ঘরের ভেতরে তারা ইতিবাচক যোগাযোগের চর্চা দেখে বড় হয়।

কোন সীমার মধ্যে স্নেহ প্রকাশ জরুরি

বিশেষজ্ঞরা একমত যে, শিশুর সামনে স্নেহ প্রকাশ ভালো, তবে বয়স উপযোগী সীমা মানা জরুরি। হাত ধরা, আলিঙ্গন, একে অপরের প্রশংসা করা বা হাসিখুশি কথাবার্তা শিশুর জন্য ইতিবাচক। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যক্তিগত বা অস্বস্তিকর আচরণ শিশুদের বিভ্রান্ত করতে পারে। তাই ভারসাম্যই এখানে মূল কথা।

Advertisement

ঝগড়া নয়, সমাধান দেখান

গবেষণা বলছে, শুধু স্নেহ নয় - বিরোধ মেটানোর ধরনও শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বাবা-মা যদি সন্তানের সামনে শান্তভাবে মতবিরোধ মেটান, তাহলে শিশুরা শেখে সমস্যার সমাধান কীভাবে করতে হয়। এতে তাদের মানসিক পরিপক্বতা বাড়ে।

অর্থাৎ, সন্তানদের সামনে বাবা-মায়ের ভালোবাসা ও স্নেহ শুধু সম্পর্কের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিতও মজবুত করে।

সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড, ইউনিসেফ

এএমপি/জেআইএম