লাইফস্টাইল

আন্দোলনের ময়দানের প্রেমই এখন নতুন ট্রেন্ড

একসময় প্রেমের শুরু মানেই ছিল ক্যাফের এক কাপ কফি, পার্কের বেঞ্চে দীর্ঘ আড্ডা কিংবা সিনেমা দেখা। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে সম্পর্ক গড়ে ওঠার ধরনও। এখন অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে ডেটিংয়ের সংজ্ঞা শুধু রোমান্টিক সময় কাটানো নয়; বরং একে অপরের মূল্যবোধ, সামাজিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক অবস্থান বোঝাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে ‘প্রোটেস্ট ডেট’-যেখানে আন্দোলনের ময়দানই হয়ে উঠছে পরিচয়, বন্ধুত্ব এবং প্রেমের নতুন ঠিকানা।

Advertisement

সম্প্রতি দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের দাবিতে রাজপথে নামা বহু তরুণ-তরুণী একই সঙ্গে সমমনা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও খুঁজে পেয়েছেন। আন্দোলনের রেশ এখনো পুরোপুরি না কাটতেই ‘প্রোটেস্ট ডেট’ শব্দবন্ধটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

‘প্রোটেস্ট ডেট’ মানে কী

‘প্রোটেস্ট ডেট’ বলতে বোঝানো হয় এমন এক ধরনের ডেটিং, যেখানে দুই ব্যক্তি কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে পরিচিত হন বা সচেতনভাবেই প্রতিবাদ কর্মসূচিকে সাক্ষাতের স্থান হিসেবে বেছে নেন। এখানে মূল আকর্ষণ শুধু একসঙ্গে সময় কাটানো নয়, বরং একই মূল্যবোধ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ভাগ করে নেওয়া।

নতুন প্রজন্মের অনেকেই মনে করেন, একটি সম্পর্কের ভিত্তি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার কিংবা মানবাধিকার নিয়ে দুজনের চিন্তাভাবনার মিলও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement

ডেটিংয়ের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম

রাজপথ কেন হয়ে উঠছে নতুন ডেটিং স্পট?

অনেক তরুণের মতে, কোনো আন্দোলনের ভেতর একজন মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। সেখানে তার ধৈর্য, রাগ, সহমর্মিতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহস-সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়। যেখানে একটি প্রচলিত ডেটে মানুষ অনেক সময় নিজের সেরা দিকটাই তুলে ধরার চেষ্টা করে, সেখানে আন্দোলনের বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যক্তিত্বের প্রকৃত রূপ অনেক দ্রুত ধরা পড়ে। ফলে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয় বলে মনে করছেন অনেকে।

ইনস্টাগ্রাম রিলস থেকে বাস্তব পরিচয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই নতুন ট্রেন্ডকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। ইনস্টাগ্রাম, এক্স (সাবেক টুইটার) কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে অনেকেই মজা করে লিখছেন‘আমার সঙ্গে প্রোটেস্ট ডেটে যাবে?’-আর সেই পোস্ট থেকেই শুরু হচ্ছে নতুন পরিচয়।

অনেকে জানিয়েছেন, এমন পোস্টের পর ইনবক্সে সমমনা মানুষের বার্তা এসেছে। এরপর দলবেঁধে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে বাস্তব পরিচয়, বন্ধুত্ব এবং পরে সম্পর্কও তৈরি হয়েছে।

Advertisement

এই অভিজ্ঞতা তরুণদের কাছে প্রমাণ করেছে যে, ভার্চুয়াল পরিচয়ের চেয়ে বাস্তব কোনো সামাজিক কর্মকাণ্ডে একসঙ্গে অংশ নেওয়া অনেক বেশি অর্থবহ হতে পারে।

আন্দোলন শেষ হলেও শুরু হতে পারে জীবনের নতুন পথচলা

‘পলিটিক্যাল কম্প্যাটিবিলিটি’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমান প্রজন্মের কাছে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন শব্দ বেশ জনপ্রিয়-পলিটিক্যাল কম্প্যাটিবিলিটি। অর্থাৎ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে দুইজনের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা মিলছে।

অনেকেই মনে করেন, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে যদি মতপার্থক্য খুব বেশি হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষা, নারী অধিকার, পরিবেশ, মানবাধিকার কিংবা গণতন্ত্রের মতো বিষয়ে অবস্থান অনেক সময় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণেও ভূমিকা রাখে।

তাই শুধু রোমান্টিক অনুভূতি নয়, একই মূল্যবোধ ভাগ করে নেওয়াকেও অনেক তরুণ-তরুণী সম্পর্কের অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখছেন।

আন্দোলন নাকি ম্যাচমেকিং?

অবশ্য এই প্রবণতা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য থেকে মনোযোগ সরিয়ে প্রেম বা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়।

আবার অন্যদের যুক্তি, সামাজিক আন্দোলন বরাবরই মানুষের মধ্যে নতুন সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও সংযোগ তৈরি করেছে। ইতিহাসের বহু আন্দোলনেই সহযোদ্ধাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাই আন্দোলনের ভেতর থেকে সম্পর্ক তৈরি হওয়াকে অস্বাভাবিক বলা যায় না।

আরও পড়ুন একঘেঁয়ে সম্পর্কে ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে পারে ‘রিলেশনশিপ ডিটক্স’ প্রেম ও প্রতিবাদের নতুন সমীকরণ

প্রোটেস্ট ডেট হয়তো সবার জন্য নয়। কিন্তু এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, নতুন প্রজন্ম সম্পর্ককে শুধু ব্যক্তিগত আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। তারা এমন একজন সঙ্গী খুঁজছে, যিনি একই সঙ্গে সচেতন নাগরিক, দায়িত্বশীল মানুষ এবং একই মূল্যবোধে বিশ্বাসী।

আরও পড়ুন নতুন প্রজন্মের ক্রাশ কম উচ্চতার পুরুষ

তাই আজকের তরুণদের কাছে রাজপথ শুধু প্রতিবাদের জায়গা নয়, বরং আদর্শ, পরিচয় এবং কখনো কখনো ভালোবাসা খুঁজে পাওয়ারও একটি নতুন ঠিকানা। আন্দোলন হয়তো একদিন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সেই পথে হাঁটতে হাঁটতেই শুরু হয়ে যেতে পারে জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ পথচলা।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান

এসএকেওয়াই