লাইফস্টাইল

‘আঙ্কেল’ নয়, কেন ‘ভাইয়া’ ডাকলে খুশি হয় পুরুষেরা

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের করা একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তোলে। এক ভক্তের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাকে ‘ভাইয়া’ বা ‘আঙ্কেল’ দুটোই ডাকা যেতে পারে, তবে ‘আঙ্কেল’ ডাকলে তিনি খুব একটা খুশি হবেন না। আপাতদৃষ্টিতে হালকা এই মন্তব্য ঘিরেই শুরু হয় বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা। প্রশ্ন উঠতে থাকে পুরুষরা কেন ‘আঙ্কেল’ সম্বোধনে অস্বস্তি বোধ করেন? ‘ভাইয়া’ ডাকেই বা কেন তুলনামূলক স্বস্তি?

Advertisement

এই বিতর্ক আসলে কোনো ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বয়স, আত্মপরিচয় আর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পুরুষদের নীরব মানসিক টানাপোড়েন। একটি শব্দ কীভাবে একজন মানুষকে তরুণ, প্রাসঙ্গিক বা পিছিয়ে পড়া হিসেবে চিহ্নিত করে সেই বাস্তবতাই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে এই আলোচনা।

‘ভাইয়া’ মানে তরুণ, ‘আঙ্কেল’ মানে শেষ অধ্যায়?

আমাদের সমাজে সম্বোধন কখনোই শুধু ডাকনাম নয়, এটা এক ধরনের লেবেল। ‘ভাইয়া’ শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সক্রিয়, কর্মক্ষম, এখনও দৌড়ে চলা একজন মানুষ। অন্যদিকে ‘আঙ্কেল’ শব্দটা অনেক সময়ই বয়সের ভার, ক্লান্তি আর অবসরের ইঙ্গিত বহন করে।

অনেক পুরুষের কাছেই ‘আঙ্কেল’ ডাক মানে যেন সামাজিকভাবে এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়া। এটা শুধু বয়সের কথা নয়, বরং প্রাসঙ্গিকতা হারানোর ভয়। তাই ‘ভাইয়া’ ডাকের ভেতর তারা খুঁজে পান নিজেদের এখনও প্রাসঙ্গিক, এখনও গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখার নিশ্চয়তা।

Advertisement

এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী নুজহাত রহমান বলেন, ‘আঙ্কেল’ এবং ‘ভাইয়া’ ডাকের মধ্যে মূলত কিছু সামাজিক এবং মানসিক ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে। আমাদের সংস্কৃতিতে ‘আঙ্কেল’ ডাক সরাসরি বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, ‘ভাইয়া’ ডাকটা একটু ভিন্ন অর্থ বহন করে। আমরা দেখেছি, নির্বাচনী প্রার্থীরাও সাধারণভাবে সবাইকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করা হয়। যেমন-‘আমার ভাই, তোমার ভাই’ যা মূলত সমতার ইঙ্গিত দেয়।

ছবি: মনোবিজ্ঞানী নুজহাত রহমান

তিনি আরও বলেন, ভাই ডাকার মধ্যে একটি সামাজিক সমতা প্রকাশ পায়, যা সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করে। আরও একটি বিষয় হলো, এই সম্বোধন কেবল বয়স প্রকাশের জন্য নয়। মানুষের মধ্যে একটি চিরন্তন মানসিক প্রবণতা থাকে তরুণত্ব ধরে রাখার, বয়স যতই বাড়ুক না কেন। মানসিকভাবে মানুষ সবসময় তার যুবাবস্থা বা তরুণ থাকার অনুভূতি বজায় রাখতে চায়।

Advertisement

বয়স লুকানো নয়, বয়সের বোঝা এড়ানোর চেষ্টা

এটা ভুল হবে যদি বলা হয়, পুরুষরা ‘ভাইয়া’ ডাক পছন্দ করেন শুধু বয়স লুকানোর জন্য। আসলে বিষয়টা বয়সের চেয়ে গভীর। বয়স মানেই সমাজে কিছু প্রত্যাশা কমে যাওয়া এই ধারণাটাই অনেককে অস্বস্তিতে ফেলে।

‘আঙ্কেল’ ডাকের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় দায়িত্ব কমে যাওয়া, সিদ্ধান্তের কেন্দ্র থেকে সরে যাওয়া কিংবা তরুণদের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার এক নীরব বার্তা। বিপরীতে ‘ভাইয়া’ সম্বোধন এখনও সমান মর্যাদা, সমান অংশগ্রহণের অনুভূতি দেয়।

পুরুষত্ববোধ আর সম্বোধনের সম্পর্ক

পুরুষদের বড় করে শেখানো হয় তাদের শক্ত থাকতে হবে, সক্রিয় থাকতে হবে, নেতৃত্বে থাকতে হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণাগুলোর সঙ্গে একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তখন ‘ভাইয়া’ সম্বোধন যেন সেই পুরুষত্ববোধকে একটু হলেও টিকিয়ে রাখে। এটা অহংকার নয়, বরং আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। মানুষ যেমন আয়নায় নিজেকে তরুণ দেখতে চায়, তেমনি শব্দের ভেতরেও সে নিজের পরিচয়ের প্রতিফলন খোঁজে।

রাজনীতি, জনপ্রিয়তা আর ‘ভাইয়া’ ইমেজ

রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই সম্বোধনের গুরুত্ব কম নয়। ‘ভাইয়া’ ডাকের মধ্যে একধরনের ঘনিষ্ঠতা, আপনত্ব আছে। এতে নেতা ও অনুসারীর মধ্যে দূরত্ব কমে। তরুণদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয় সহজে। ফলে জনপ্রিয়তার রাজনীতিতে ‘ভাইয়া’ শব্দটা অনেক বেশি কার্যকর। এই জায়গা থেকেই তারেক রহমানের মন্তব্য অনেকের কাছে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেও ধরা পড়ে।

‘ভাইয়া’ না ‘আঙ্কেল’ এই বিতর্ক আসলে বয়স নিয়ে নয়, আত্মপরিচয় নিয়ে। মানুষ চায় তাকে তার শক্তি, সক্ষমতা আর উপস্থিতির জায়গা থেকে দেখা হোক, বয়সের সংখ্যা দিয়ে নয়। তাই পুরুষরা আঙ্কেলের চেয়ে ভাইয়া ডাক পছন্দ করেন; এটা হাসির বিষয় নয়, বরং আমাদের সমাজের বয়সবোধ, গ্রহণযোগ্যতা আর প্রাসঙ্গিকতার মনস্তত্ত্ব বোঝার একটা জানালা। সম্ভবত তাই, একটা ছোট্ট সম্বোধনই এত বড় আলোচনা তৈরি করতে পারে।

জেএস/