একুশে বইমেলা

অবাক পৃথিবীর যত নির্বাক রহস্য: একজন নাবিকের চোখ

সময়ের প্রবাহে মানুষ যত বেশি তথ্যের কাছে পৌঁছেছে; ততই যেন হারিয়ে ফেলেছে ভাবনার গভীরতা। জানা আর বোঝার ভিড়ে প্রশ্ন করার অভ্যাসটি ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এক ভিন্নধর্মী চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে বাজারে এসেছে নতুন বই ‘অবাক পৃথিবীর যত নির্বাক রহস্য’। যেখানে উত্তর নয় বরং প্রশ্নই হয়ে উঠেছে মূল আলোচ্য।

Advertisement

বইটি প্রকাশ করেছে পরিবার পাবলিকেশনস। প্রচ্ছদ করেছেন মৌমিতা রহমান। এবারের অমর একুশে বইমেলায় বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বর্তমানে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে বইটি। বইটির লেখক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন একজন অভিজ্ঞ নৌ কর্মকর্তা, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। সমুদ্রপথে দীর্ঘ যাত্রা, প্রকৃতির বিশালতা ও মহাবিশ্বের নীরব বিস্ময় তাকে বারবার দাঁড় করিয়েছে কিছু মৌলিক প্রশ্নের সামনে। সেই অভিজ্ঞতা, সেই উপলব্ধি এবং সেই প্রশ্নগুলোকেই তিনি শব্দে রূপ দিয়েছেন এ গ্রন্থে।

লেখকের ভাষায়, এই বই কোনো তর্ক জেতার জন্য নয়, কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্যও নয় বরং এটি এক ধরনের মানসিক যাত্রা। যেখানে পাঠককে আহ্বান জানানো হয় ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং চারপাশের দৃশ্যমান জগতের আড়ালে থাকা অদৃশ্য রহস্যগুলোকে অনুভব করতে।

বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এখানে সহজভাবে এমন কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা মানুষের ভাবনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কেন প্রকৃতির নিয়ম আছে? কেন মহাবিশ্ব এত শৃঙ্খলাবদ্ধ? সবকিছু কি কেবলই ঘটে গেছে, নাকি কোনো এক অদৃশ্য প্রজ্ঞা তা ঘটিয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর বইটি দেয় না। বরং লেখক সচেতনভাবেই উত্তরহীনতার জায়গাটিকে উন্মুক্ত রাখেন। কারণ তার বিশ্বাস, প্রশ্নই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়, প্রশ্নই মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

Advertisement

আরও পড়ুনমায়া এবং মজার ঘাসফড়িং: প্রকৃতি ও প্রাণের বন্ধুতা 

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের জীবনের অভিজ্ঞতাও কম বিস্ময়কর নয়। ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জন্ম নেওয়া এই নৌ কর্মকর্তা ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মিসাইল ফ্রিগেট বানৌজা ওসমানসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজের অধিনায়ক হিসেবে তার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা যেমন সমৃদ্ধ; তেমনই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুদান ও লেবাননে দায়িত্ব পালন তাকে দিয়েছে বৈশ্বিক বাস্তবতার কাছাকাছি থাকার সুযোগ।

একজন নাবিক হিসেবে তিনি যেমন বিশাল সমুদ্র দেখেছেন; তেমনই একজন গবেষক হিসেবে খুঁজেছেন তার অন্তর্নিহিত অর্থ। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে এমবিএ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে এমফিল ও পিএইচডি অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি জ্ঞানচর্চার পথেও নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা ও প্রকল্প পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

‘অবাক পৃথিবীর যত নির্বাক রহস্য’ তাই শুধু একটি বই নয়, এটি এক ধরনের চিন্তার অনুশীলন। এটি পাঠককে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয় না বরং তাকে এমন এক মানসিক অবস্থানে নিয়ে যায়। যেখানে প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি নিয়ম, প্রতিটি ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন জাগায়।

এই বই যেন এক নীরব দরজা, যা খুললে হয়তো সব উত্তর মিলবে না কিন্তু নিশ্চিতভাবে বদলে যাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। আর সেই পরিবর্তিত দৃষ্টিই হয়তো আমাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই হারিয়ে যাওয়া অভ্যাসে, ভাবনায়, প্রশ্নে কিংবা বিস্ময়ে।

Advertisement

এসইউ