শামিম রেজামানুষের স্বাস্থ্য কেবল আলাদাভাবে বিবেচনা করা যায় না। এটি সরাসরি সম্পর্কিত পরিবেশ এবং প্রাণীজগতের সঙ্গে, যেখানে আমরা বাস করি এবং যা আমাদের জীবন ও পরিবেশকে প্রভাবিত করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণা তৈরি হয়েছে। এটি মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণী স্বাস্থ্য এবং বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যকে একত্রিত করে সংরক্ষণ এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। ওয়ান হেলথের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের জন্য সর্বোত্তম স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা।
Advertisement
ওয়ান হেলথ একটি সমন্বিত পদ্ধতি যা মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক স্বীকার করে। এটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে। এর মূল লক্ষ্য হলো সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণ, আন্তঃবিভাগীয় চিকিৎসা সমন্বয়, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা উন্নয়ন।
ওয়ান হেলথের প্রয়োজনীয়তাআজকের বিশ্বে ওয়ান হেলথের প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংক্রামক রোগের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষকে প্রাণী থেকে সংক্রমিত করে, যেমন কোভিড-১৯, ইবোলা, নিপা ভাইরাস। একই সময়ে, মানুষের এবং প্রাণীর চিকিৎসায় ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করেছে, যা সাধারণ রোগকেও ভয়ংকর করে তুলেছে। বন উজাড়, নগরায়ণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মানুষের এবং বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শ বেড়েছে, যা নতুন রোগের জন্ম দিতে পারে। বিশ্বায়নের ফলে রোগ দ্রুত একটি দেশে থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশে বাস্তবায়নের সম্ভাবনাবাংলাদেশে ২০০৭ সাল থেকে ওয়ান হেলথ নেটওয়ার্ক আছে, তবে মাঠ পর্যায়ে এর সঠিক ফলাফল এখনো সীমিত। কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্য, পশুসম্পদ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। সংক্রমণ রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রতিকারের জন্য মানব ও প্রাণী ল্যাবগুলোর মধ্যে তথ্যের সুশৃঙ্খল আদান-প্রদান নিশ্চিত করা উচিত। এছাড়া পশু চিকিৎসক, চিকিৎসক এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের যৌথ প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করা দরকার। মাঠ পর্যায়ের জনতাকেও স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন করা গেলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
Advertisement
ওয়ান হেলথ মহামারি এবং সংক্রমণ রোগের দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধে সাহায্য করে। এটি মানুষের এবং প্রাণীর মধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং অকার্যকারিতা রোধ করে। সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখার মাধ্যমে পানিবাহিত এবং অন্যান্য রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এটি স্বাস্থ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি একটি নিরাপদ এবং সুষম পরিবেশ নিশ্চিত করে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বকোভিড-১৯ মহামারির সময় ওয়ান হেলথ বাস্তবায়নের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকির মোকাবেলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও সক্রিয় হয়েছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি, জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক এবং বাস্তুসংস্থানের স্থায়িত্বের জন্যও ওয়ান হেলথকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)-এর সমন্বিত প্রচেষ্টায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
লেখক: শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
আরও পড়ুনহাম-করোনা মহামারি, যেসব ভাইরাস পৃথিবীকে বিপর্যস্ত করে তুলেছেনারীর সঙ্গে পরিবেশ, পরিবেশের সঙ্গে উন্নয়নকেএসকে
Advertisement