বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে সৌরশক্তি এখন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালেই বিশ্বে নতুন করে ৫১১ গিগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, যা খাতটির অভূতপূর্ব সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
Advertisement
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌর প্যানেলের দাম দ্রুত কমে যাওয়ায় এটি জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে উঠেছে। ফলে শুধু ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকাই নয়, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও সৌরশক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে মূলত দুটি দিক কাজ করছে- বর্ধিত চাহিদা এবং দ্রুত সম্প্রসারিত সরবরাহ ব্যবস্থা। একদিকে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ায় সৌরশক্তি আরও সাশ্রয়ী হচ্ছে।
চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর প্যানেল উৎপাদক দেশ হলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনাম এরই মধ্যে সৌর শিল্পে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, আর ইন্দোনেশিয়াও এই খাতে দ্রুত প্রবেশ করছে।
Advertisement
অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া ২০২৪ সালে বিশ্বের সৌর প্যানেল রপ্তানির প্রায় ৪ শতাংশ সরবরাহ করেছে, আর থাইল্যান্ডের অংশ ছিল ৫ শতাংশ। তবে ভিয়েতনাম এই খাতে সবচেয়ে দ্রুত অগ্রগতির দেশ, যেখানে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে সৌর প্যানেল রপ্তানি প্রায় চারগুণ বেড়ে ১৩ শতাংশ বৈশ্বিক অংশীদারিত্বে পৌঁছেছে।
একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়াও নতুন করে এই শিল্পে প্রবেশ করছে। দেশটিতে এরই মধ্যে কয়েক বিলিয়ন বা কয়েক শত কোটি ডলারের বিনিয়োগে ১০ গিগাওয়াট সৌর উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে উঠছে বা নির্মাণাধীন রয়েছে। ফলে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এখন সৌর প্যানেলের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক বাজার। তবে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের পর অনেক উৎপাদন প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়েছে, যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিনিয়োগ স্থানান্তর কৌশলগত হলেও তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করছে। পাশাপাশি বিশ্বের জন্য এটি কম দামে সৌরশক্তি ব্যবহারের পথ উন্মুক্ত করছে।
Advertisement
এদিকে এশিয়াজুড়ে আরও কয়েকটি দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। ভারত এরই মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট সৌরশক্তি উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে এবং বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বড় সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। পাকিস্তানও সৌরশক্তি বিপ্লবের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমিয়ে বিপুল সাশ্রয় করছে। একইভাবে ফিলিপাইন কয়লা ও গ্যাস নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নতুন নবায়নযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
সৌরশক্তি নিয়ে বাংলাদেশের লক্ষ্য
বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের বাইরে নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাটারি স্টোরেজ ও আধুনিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এরই মধ্যে বাংলাদেশে ৬ গিগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ হয়েছে ও আরও ৫ গিগাওয়াট রুফটপ সৌরশক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমান সরকারও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ হবে। এর জন্য নতুন নীতিমালা, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব মডেল চালু করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে এবং কয়লা ও এলএনজি নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে পারবে। একই সঙ্গে এটি অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও ভবিষ্যৎ-উপযোগী করবে।
সব মিলিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন ঘটছে, যেখানে সৌরশক্তি ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প নয় বরং প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পর্যন্ত এই পরিবর্তনের ঢেউ এখন বাস্তব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত রূপ নিচ্ছে।
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট, দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন, মরডর ইনটেলিজেন্স
এসএএইচ