মতামত

বজ্রের আঘাতে মৃত্যু: সতর্কতার অভাব নাকি নিয়তির নির্মমতা?

শনিবার (১৮ এপ্রিল) দেশের ছয় জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে পাঁচজন, কিশোরগঞ্জে একজন, রংপুরে দুজন, নেত্রকোনার একজন, ময়মনসিংহে দুজন ও হবিগঞ্জে একজন মারা গেছেন—যাদের সবাই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ।

Advertisement

সাম্প্রতিক ইতিহাসে বাংলাদেশে বজ্রপাতের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ২০১২ সালের ১১ আগস্ট রাতে। সুনামগঞ্জের ধর্শপাশা উপজেলার একটি মসজিদে বজ্রপাত হলে একসঙ্গে ১৩ জন, যারা ওই সময়ে তারাবির নামাজ পড়ছিলেন।

বস্তুত বজ্রপাতে প্রতি বছর যত মানুষের মৃত্যু হয়, তাদের বিরাট অংশই কৃষক, কৃষি শ্রমিক ও মৎসীজীবী। যাদেরকে বলা হয় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির প্রাণ। অথচ সেই মানুষগুলোর প্রাণই চলে যাচ্ছে বেঘোরে।

হাওরের মতো উন্মুক্ত স্থানে বজ্রপাতে নিহতের ঘটনা বেশি হয় বলে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলা এই দুর্যোগে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

Advertisement

২০১৫ সাল পর্যন্ত বজ্রপাত সরকারের দুর্যোগ তালিকায় ছিল না। অর্থাৎ সরকার প্রতি বছর প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষয়-ক্ষতির যে তালিকা করে, সেখানে বজ্রপাত অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে প্রাণহানি ও অন্যান্য ক্ষয়-ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তার মানে বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণার পরে ১০ বছর পার হয়েছে। কিন্তু এই দুর্যোগ থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে সরকারের উদ্যোগগুলো কী এবং সেসব উদ্যোগের ফলে বজ্রপাতে প্রাণহানির পরিমাণ আদৌ কমেছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলার সময় হয়েছে।

গণমাধ্যমের খবর বলছে, শনিবার যারা বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন, তাদের একজন কৃষক আলতু মিয়া। ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে তিনি বাড়ির পাশের একটি ক্ষেতে গরুর জন্য ঘাস কাটতে যান। সাড়ে ১০টার দিকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে হঠাৎ বৃষ্টিসহ বজ্রপাত শুরু হয়। কিন্তু বজ্রপাত শুরু হলেও নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি। বেলা ১১টার দিকে তার ভাই নজরুল ইসলাম মাঠে গিয়ে আলতু মিয়াকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। দ্রুত তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনাগুলে মোটামুটি এরকমই।

তবে বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে এখনও কোনো উপসংহারে পৌঁছানো না গেলেও বিজ্ঞানীদের অনেকে বিশ্বাস করেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়তে থাকায় বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে। যদি তাই হয়, তখন আমাদের এই প্রশ্নও উত্থাপন করতে হবে যে, বজ্রপাতের এমন প্রাণহানি কি তাহলে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ? কেননা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধির ফলে জলবায়ু পরিবর্তনকে এখন মানুষের তৈরি দুর্যোগ বলে অভিহিত করা হয়। অতি শিল্পায়ন, নগরায়ণ আর ভোগবাদিতা বেড়ে যাওয়া তথা বাতাসে অধিকমাত্রায় কার্বনডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গমনের ফলেই যেহেতু বিশ্বের সামগ্রিক তাপমাত্রা বাড়ছে এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে অধিকহারে মেরুর বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, সে কারণে জলবায়ু পরিবর্তন যে মানুষের সৃষ্ট, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে। সুতরাং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধির সঙ্গে যদি বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক প্রমাণিত হয়, তাহলে বলতে হবে, প্রতি বছর এই দুর্যোগে মানুষের প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ার দায় মানুষকেই নিতে হবে। বিশেষ করে যেসব শিল্পোন্নত দেশ জলবায়ু পরিণতির জন্য প্রধানত দায়ী।

২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত বজ্রপাতে মৃত্যুর তালিকা সরকারের তরফে করা হত না। ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পরে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে কত লোকের প্রাণহানি হয়েছে, তার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করায় এখন এর একটি বাৎসরিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। অবশ্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বজ্রপাতে নিহতের পরিসংখ্যান তৈরি করে মূলত গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের আলোকে। ফলে যেসব ঘটনার সংবাদ হয় না, সেসব মৃত্যুর পরিসংখ্যানবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। বজ্রপাতে আহত অনেকে পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান, অনেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরার পরেও মানসিক ট্রমায় ভুগে একসময় মৃত্যুবরণ করেন। এসব মৃত্যুও পরিসংখ্যানে আসে না। তার মানে কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে পরিসংখ্যানে কেবল বজ্রপাতে তাৎক্ষণিক মৃত্যুগুলোই অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে প্রতি বছর দেশে বজ্রপাতে আসলেই কত লোকের মৃত্যু হচ্ছে ব গত এক দশকে কত লোক এরকম দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন, তার সঠিক সংখ্যা জানা কঠিন।

Advertisement

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে ১৩ ঘণ্টায় ৩৬ হাজার ৭৪৯ বার বজ্রপাতের রেকর্ড করে সে দেশের আবহাওয়া দপ্তর। বজ্রপাতের এমন অস্বাভাবিক আচরণকে আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতা বলে উল্লেখ করে দেশটির দুর্যোগব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।

বজ্রপাতে মৃত্যু অধিকাংশই যেহেতু হয় ঘরের বাইরে, বিশেষ করে ফসলের মাঠে, হাওরের খোলা প্রান্তরে, বিলে ও নদীতে—ফলে এপ্রিল-মে মাসে মাঠ ঘাটে কাজ করা কৃষক, মৎসীজীবী ও দিনমজুরদের একটু বেশি সতর্ক থাকা। আকাশের অবস্থা খারাপ দেখলেই দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসতে হবে—সরকারের তরফে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো দরকার। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিতে পারে বা যেসব কর্মসূচি আছে, সেগুলো জোরদার করা উচিত।

বিজ্ঞানীদের একটি অংশ বলছেন, যেসব এলাকায় গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, সেসব এলাকায় যে মেঘের সৃষ্টি হয়, সেখান থেকেই বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি থাকে। কোনো কোনো গবেষক বলেন, তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের আশঙ্কা অন্তত ১০ শতাংশ বেড়ে যায়।

২০০৯ সাল থেকে বজ্রপাতের ওপর গবেষণা চালিয়েছিল বিলুপ্ত প্রতিষ্ঠান সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রে (এসএমআরসি)। এই কেন্দ্রের গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বজ্রপাতের সংখ্যা ও প্রাণহানির দিক দিয়ে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। সার্কভুক্ত অন্য দেশের তুলনায় বজ্রপাতে এখানে মৃত্যুর হারও বেশি। ‘যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইটনিং সেফটি ইনস্টিটিউটের’২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর সারা বিশ্বে বজ্রপাতে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার এক-চতুর্থাংশ ঘটে বাংলাদেশে।

প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যু কি ঠেকানোর কোনো উপায় নেই? নিশ্চয়ই আছে। বজ্রপাতের সময় বাইরে না থাকলেই মৃত্যু এড়ানো সম্ভব। কিন্তু বজ্রপাত বলে কয়ে আসে না। ঘূর্ণিঝড়ের মতো বজ্রপাত কখনো আগাম সংকেত দেয় না। তবে এই মৌসুমে, বিশেষ করে এপ্রিল-মে মাসে যখনই আকাশ কালো হয়ে হয়ে আসে এবং আকাশের চেহারা ও বাতাসের গতিবেগ দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন সাথে সাথে খোলা জায়গা মাঠের ভেতরে থেকে দৌড়ে নিরাপদ কোনো আশ্রয়ে চলে গেলে বজ্রাঘাতে মৃত্যুর প্রতিরোধ করা সম্ভব। যদিও ঘরের ভেতরেও বজ্রপাত হতে পারে। কিন্তু সেই সংখ্যা অতি সামান্য। সে কারণে বলা হয়, টিনের ঘর হোক আর দালানের, আর্থিং ব্যবস্থা থাকলে সেই ঘরে বজ্রপাত আঘাত হানবে না। যখন বজ্রের ঝনঝনানি শুরু হয়, তখন বাইরে থাকলেও উঁচু গাছের নিচে না দাঁড়ানো এবং পানিতে থাকলে দ্রুত ডাঙায় উঠে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়। আবার ঘরের ভেতরে থাকলেও বজ্রপাতের সময় ধাতুর তৈরি কোনো কিছু স্পর্শ না করারও পরামর্শ দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।

বলা হয়, গ্রাম ও শহরে উঁচু গাছের পরিমাণ কমে গেছে বলে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। কেননা উঁচু গাছ বজ্রকে মাটিতে নামতে দেয় না। সে কারণে এখন অনেকেই সারা দেশে বেশি করে তাল গাছ রোপণের কথা বলছেন। সরকারও তালগাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করছে। কিন্তু এখানে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। কেননা একটি তালগাছ বড় হতে যে ১৫/২০ বছর সময় লাগে। সেই সময়কালে মৃত্যু আমরা কী করে ঠেকাব? আবার উপকূলীয় অঞ্চলে তালগাছ লাগানোর নামে যেসব হরিলুট হয়েছে, সেই খবরও দেশবাসীর অজানা নয়। কিন্তু ২০ বছর আগেও যদি সারা দেশে লাখ বিশেক তালগাছ লাগানো যেতো এবং পুরোনো তালগাছ কেটে ফেলা না হতো, তাহলে তার কিছু সুফল এখন মানুষ পেতো। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশের যে-কোনো উন্নয়নের প্রথম করাতটাই পড়ে গাছের ওপর।

বজ্রপাত থেকে মৃত্যু ঠেকাতে আরেকটি সমাধানের কথা বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন। সেটি হলো, গ্রামাঞ্চলে উঁচু টাওয়ার বানানো, যাতে বজ্র মাটি পর্যন্ত আসতে না পারে। সব বাড়িঘরে আর্থিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া এবং গরিব মানুষকে প্রয়োজনে সরকারের স্যানিটারি ল্যাট্রিন করে দেওয়ার মতো আর্থিং ব্যবস্থা করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

তবে বজ্রপাতে মৃত্যু অধিকাংশই যেহেতু হয় ঘরের বাইরে, বিশেষ করে ফসলের মাঠে, হাওরের খোলা প্রান্তরে, বিলে ও নদীতে—ফলে এপ্রিল-মে মাসে মাঠ ঘাটে কাজ করা কৃষক, মৎসীজীবী ও দিনমজুরদের একটু বেশি সতর্ক থাকা। আকাশের অবস্থা খারাপ দেখলেই দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসতে হবে—সরকারের তরফে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো দরকার। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিতে পারে বা যেসব কর্মসূচি আছে, সেগুলো জোরদার করা উচিত।

বিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪০-৫০টি বিভিন্ন ধরনের বজ্রপাতের উৎপত্তি ঘটে, যার মধ্যে ২৫ শতাংশই মেঘ থেকে ভূপৃষ্ঠে এসে আঘাত হানে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেঘ থেকে মেঘে বজ্রপাত ঘটে, যা আমাদের গোচরীভূত হয় না। মেঘ থেকে ভূপৃষ্ঠে আঘাত হানা বজ্রপাত সংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে, যা অনেক সময়ই জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে থাকে।

বজ্রপাত থেকে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ তড়িৎ শক্তিকে ধারণ করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের বিষয়ে বিজ্ঞানীরা উৎসাহী হয়ে উঠেছেন এবং তা বাস্তবায়িত করে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে হতো বজ্রপাতের এই বিদ্যুৎ মানবকল্যাণে কাজে আসবে। কিন্তু তার আগে এই দুর্যোগে আমাদের কৃষি ও অর্থনীতির প্রাণ কৃষক ও মৎস্যজীবীসহ প্রান্তিক যে মানুষেরা প্রতি বছর বজ্রপাতের কবলে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছেন, এই বেদনাদায়ক মৃত্যুগুলো প্রতিহত ও প্রতিরোধ করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।

এইচআর/এমএস