অর্থনীতি

বাড়তি দাম দেবো, তেল পাওয়ার নিশ্চয়তা চাই

দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় আরও ক্ষতির মুখে পড়ছেন বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা। জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন-পরিবহন ব্যয় বাড়বে। আবার বৈশ্বিক ক্রেতারা পূর্বনির্ধারিত দামের বেশি দেবেন না। ফলে বাড়তি খরচ সমন্বয় করতে পকেট থেকে খরচ করতে হবে রপ্তানিকারকদের। এতে সংকুচিত হবে মুনাফা।

Advertisement

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতিও আরেক ধাপ বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেবে। এছাড়া জীবনযাত্রার খরচও বাড়াবে বলে মন্তব্য করেন অর্থনীতিবিদরা।

ভর্তুকির চাপ কমানো ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, যা ১৮ এপ্রিল ২০২৬ মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি লিটারে ১৫–২০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা হয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগেই নির্ধারিত দামের চুক্তি সংশোধনে রাজি নন। ফলে বাড়তি খরচ বহন করে রপ্তানিকারকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এ মুহূর্তে আমাদের প্রধান দাবি হলো দাম বাড়তি হলেও সময়মতো নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা।-বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম

Advertisement

মুনাফা কমবে

‘বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল চলমান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের তেমন কোনো বিকল্প নেই। তবে প্রশ্ন হলো, জ্বালানির সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে কি না এবং ভোক্তা ও উৎপাদকরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পাবেন কি না’—এমন মন্তব্য করেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

তিনি বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগেই নির্ধারিত দামের চুক্তি সংশোধনে রাজি নন। ফলে বাড়তি খরচ বহন করে রপ্তানিকারকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এ মুহূর্তে আমাদের প্রধান দাবি হলো দাম বাড়তি হলেও সময়মতো নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা।’

পোশাক রপ্তানিকারক স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শোভন ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের গার্মেন্টস শিল্প মূলত জ্বালানিনির্ভর। উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশই জ্বালানি খাতে খরচ হয়, যা গ্যাস ও তেলের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে। এমনিতেই আমরা গ্যাসের সংকটে ছিলাম, এখন তা আরও তীব্র হয়েছে। গ্যাসের স্বল্পতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে বয়লার ও উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত খরচ যোগ হচ্ছে।’

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার চেয়ে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা জ্বালানির সংকট। আমরা প্রয়োজনীয় তেলই পাচ্ছি না। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও তেলের অভাবে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ট্যানারি শিল্পে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।-বিটিএর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ

Advertisement

তিনি বলেন, ‘সব মিলিয়ে শিল্পটি বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে আবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খরচ আরও বেড়ে গেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা বায়ারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম আদায় করতে পারবো না। ফলে বাড়তি খরচ আমাদেরই বহন করতে হচ্ছে।’

‘এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি কারখানাই বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়বে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। কম দামে অর্ডার নিলে ব্যবসায় লোকসান হবে, আর বেশি দাম চাইলে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি থাকবে’ বলেন এই ব্যবসায়ী।

সরবরাহ সংকট থাকলে উৎপাদনও ব্যাহত হবে

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির স্বত্বাধিকারী মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার চেয়ে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা জ্বালানির সংকট। আমরা প্রয়োজনীয় তেলই পাচ্ছি না। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও তেলের অভাবে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ট্যানারি শিল্পে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আমাদের শিল্পটি পুরোপুরি হেভি ইন্ডাস্ট্রি। একটি ব্যাচ উৎপাদনে গেলে ৭২ ঘণ্টা একটানা চালাতে হয়। মাঝপথে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি ঘাটতি হলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়।’

আরও পড়ুন

ডিজেলে কৃষকের খরচ বাড়বে দেড় হাজার কোটি টাকা১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারে ১৮ দিনে বাড়লো ৬০০ টাকাতেলের দামের ধাক্কায় দিশাহারা রাইড শেয়ারিং চালকরাজ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস

তিনি আরও বলেন, ‘পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে কেমিক্যাল আমদানি-রপ্তানি— সবখানেই বাড়তি খরচ পড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সামনে কোরবানির ঈদ। এই সময় চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে টানা তিন মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। যদি লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকে, তাহলে মানুষ চামড়া কিনতেও আগ্রহ হারাবে, যা পুরো খাতের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।’

আরেক দফা বাড়বে মূল্যস্ফীতি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।

মূলত খাদ্যপণ্যের দামের পতনের কারণেই এই হ্রাস ঘটেছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা মার্চে কমে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব তো ভোক্তার ওপর পড়বেই। পাশাপাশি অর্থনীতিতে এর একটি গুণক (মাল্টিপ্লায়ার) প্রভাব রয়েছে। পরিবহন ভাড়া, উৎপাদন ব্যয়, স্থানীয় শিল্প, আমদানি বিকল্প উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী খাত—সব জায়গায়ই খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ ভোক্তার ওপরই গিয়ে পড়বে।-সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান

তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কৃষিপণ্যের ওপর পড়বে। ফলে এটি মূল্যস্ফীতিতে আবারও ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার দীর্ঘদিন জ্বালানির দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বর্তমান রাজস্ব অবস্থা ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত এড়ানোর সুযোগও ছিল না।’

তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব তো ভোক্তার ওপর পড়বেই। পাশাপাশি অর্থনীতিতে এর একটি গুণক (মাল্টিপ্লায়ার) প্রভাব রয়েছে। পরিবহন ভাড়া, উৎপাদন ব্যয়, স্থানীয় শিল্প, আমদানি বিকল্প উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী খাত—সব জায়গায়ই খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ ভোক্তার ওপরই গিয়ে পড়বে।’

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘এমনিতেই দেশে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষ চাপের মধ্যে আছে। এর মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে আরও চাপ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এটি আরও নাজুক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।’

তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি এবং রাজস্ব সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিকল্প খুব বেশি ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর ফলে উৎপাদন, ভোক্তা কল্যাণ, মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্প—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যাতে অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সেজন্য বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। বিশেষ করে পরিবহন ভাড়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে যেন অস্বাভাবিকভাবে মূল্যবৃদ্ধি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

আইএইচও/ইএইচটি/এএসএ/এমএফএ