অচেনা আদালত চত্বর, কাগজপত্রের ভিড় আর আইনজীবীদের ব্যস্ততা। এসবের মাঝেই ১০ বছরের শিশু আতিকুর রহমান নূরনবীকে পাশে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে নানা আবদুল মান্নান। চোখে তার নাতির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের উৎকণ্ঠার ছায়া। সেই উদ্বেগ নিয়েই তিনি ছুটছেন এক আদালত থেকে আরেক আদালতে। তার এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা আইনি লড়াই নয়, বরং শিশুটির সুচিকিৎসা ও তাকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা। কিন্তু তাদের সীমিত সাধ্য এখানেও বাধ সাধছে।
Advertisement
সোমবার (২০ এপ্রিল) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের পাশে নাতি আতিকুর রহমান নূরনবী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবদুল মান্নান। সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে।
জানতে চাইলে আবদুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, মোহাম্মদপুরে খতনা করানোর সময় চিকিৎসকের অবহেলায় আমার নাতির আতিকুর পুরুষাঙ্গ হারায়। এ ঘটনায় করা মামলায় আসামির রিমান্ড শুনানিতে এসেছি। এসময় সঙ্গে ছিলেন তার ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তান।
পরিবারটির সঙ্গে কথা হলে তারা জানায়, মামলা, আদালত আর তদন্তের জটিলতার বাইরে সবচেয়ে বড় সংকটে এখন শিশুটির চিকিৎসা। আদালতের বারান্দা থেকে হাসপাতাল—দুই জায়গায়ই সমান উদ্বেগে দিন কাটছে তাদের। ন্যায়বিচারের পাশাপাশি সন্তানের সুস্থতার অপেক্ষায় তারা।
Advertisement
আদালত সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুরে খতনা করানোর সময় গুরুতর জখমের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত খলিলুর রহমানকে একদিনের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। পুলিশ পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করলেও আদালত আংশিকভাবে তা মঞ্জুর করে একদিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম এ আদেশ দেন।
আদালতের বারান্দা থেকে হাসপাতাল—দুই জায়গায়ই সমান উদ্বেগে দিন কাটছে তাদের। ন্যায়বিচারের পাশাপাশি সন্তানের সুস্থতার অপেক্ষায় তারা
ভুক্তভোগীর আইনজীবী জামিলা খাতুন আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে জাগো নিউজকে বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন, অথচ বাস্তবে তিনি অনিবন্ধিত ও অনুমোদনহীনভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের সুযোগ নিয়ে এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আশা করি, আইন তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে এবং ভুক্তভোগী শিশুটির চিকিৎসা ও জীবনের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে।
Advertisement
অভিযোগ বিস্তারিত: খতনার সময় গুরুতর জখমমামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী আতিকুর রহমান নূরনবী তার নানার সঙ্গে মোহাম্মদপুর থানাধীন ঢাকা উদ্যান এলাকার ‘খলিল মেডিকেল হল’ নামের একটি ফার্মেসিতে খতনা করাতে যায়। গত ২২ মার্চ সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে অবহেলাবশত শিশুটির পুরুষাঙ্গের মাথা কেটে গুরুতর জখম হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
পরে তাকে দ্রুত শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। মামলার এজাহারে ভুক্তভোগী পরিবারটির অভিযোগ, চিকিৎসা চলাকালে ঘটনা ধামাচাপা দিতে তাদের চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে।
আছে চিকিৎসা ও হুমকির চাপআদালতে শিশুটির নানা আবদুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ঘটনার সময় চিকিৎসার অবহেলায় শিশুটির অবস্থা গুরুতর হয় এবং একাধিকবার ক্ষত স্থানে আঘাত লাগে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসা খরচ ও বিষয়টি না বাড়ানোর জন্য এক লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব আসে। তবে আমরা সেই ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি।
তিনি বলেন, মামলা করার পর হয়রানির হুমকি দেওয়া হয়েছে। এখনো নাতির চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। নিজের সীমিত আয় দিয়ে চিকিৎসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিশুটি সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় রয়েছে। তার বাবা নেই এবং মা আলাদা থাকেন। তাই তারা আদালতে উপস্থিত থেকে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও শিশুটির পাশে থাকবেন
এ ঘটনায় মানবাধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশন শিশুটিকে আইনি সহায়তা দিচ্ছে। সংগঠনটির পরিচালক জাকারিয়া হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, শিশুটি সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় রয়েছে। তার বাবা নেই এবং মা আলাদা থাকেন। তাই তারা আদালতে উপস্থিত থেকে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও শিশুটির পাশে থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, শিশুটির চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বড় ধরনের সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
পুলিশের বক্তব্য: তদন্ত চলছেঘটনার পর পুলিশ অভিযুক্ত খলিলুর রহমানকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে। তবে আদালত শুনানি শেষে একদিনের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, অভিযোগটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি অভিযুক্তের চিকিৎসা সংক্রান্ত সনদ ও অন্যান্য নথিও যাচাই করা হচ্ছে।
এমডিএএ/এমকেআর