আন্তর্জাতিক

যুক্তরাজ্যের এলিট বাহিনীতে হঠাৎ পদত্যাগের হিড়িক, কারণ কী?

যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনীতে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দেশটির সবচেয়ে এলিট বাহিনী হিসেবে পরিচিত ‘স্পেশাল এয়ার সার্ভিস’ বা এসএএস সদস্যরা গণহারে পদত্যাগ শুরু করেছেন। মানবাধিকার কর্মীদের দায়ের করা মামলার মাধ্যমে ‘উইচ হান্ট’ বা অহেতুক আইনি হয়রানির শিকার হওয়ার ভয়ে এসব সেনা স্বেচ্ছায় অবসর নিচ্ছেন বলে দাবি করেছে প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘দ্য টেলিগ্রাফ’।

Advertisement

খবরে বলা হয়েছে, এসএএসের অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্কোয়াড্রন (ডি এবং জি) থেকে বিপুল সংখ্যক সদস্য প্রি-ম্যাচিউর ভলান্টারি রিলিজ বা আগাম অবসরের আবেদন করেছেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে বাহিনীর মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ ওয়ারেন্ট অফিসারও রয়েছেন। এই গণপদত্যাগকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তারা।

পদত্যাগের কারণ কী

এসএএস সদস্যদের এই সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে আফগানিস্তান, সিরিয়া এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডে পরিচালিত পুরোনো সব গোপন অভিযানের বিরুদ্ধে নতুন করে শুরু হওয়া আইনি তদন্ত। বর্তমানে প্রায় ২৪২ জন স্পেশাল ফোর্সের সদস্য আইনজীবীদের তদন্তের মুখে রয়েছেন।

আরও পড়ুন>>যুক্তরাজ্যে ফিলিস্তিনপন্থিদের ওপর নজরদারিতে গোয়েন্দা ভাড়া ১২ বিশ্ববিদ্যালয়েরভুয়া ‘সমকামী’ সেজে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়, আবেদনের শীর্ষে পাকিস্তানিরাইরান যুদ্ধে যুক্ত হবে না যুক্তরাজ্য, ট্রাম্পের চাপেও অনড় স্টারমার

Advertisement

সাবেক এসএএস সার্জেন্ট মেজর জর্জ সিম বলেন, ‘বর্তমানে বাহিনীর মনোবল একদম তলানিতে। একজন সৈনিক তার অস্ত্র ব্যবহার করলে তাকে ভবিষ্যতে আইনি ঝামেলার মুখে পড়তে হচ্ছে। এটি এক প্রকার বিশ্বাসঘাতকতা।’

অভিযোগ উঠেছে, মানবাধিকার আইনের নামে এখন সেনাদের জীবনের চেয়ে সন্ত্রাসীদের জীবনের মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে সামনের সারির সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন।

সরকারের ওপর চাপ

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বর্তমানে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছেন। একদিকে ট্রাম্পের ইরান হামলার প্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের সামরিক অস্বস্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে রক্ষণশীলদের আনা ‘লিগ্যাসি অ্যাক্ট’ (যা ভেটেরানদের আইনি সুরক্ষা দিতো) পরিবর্তনে লেবার পার্টির পরিকল্পনা সামরিক মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। নয়জন সাবেক সেনাপ্রধান প্রধানমন্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের আইনি সংস্কার যুক্তরাজ্যের শত্রুদের সুবিধা করে দেবে।

বেসামাল ব্রিটিশ বাহিনী

বর্তমানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর আকার নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের পর সবচেয়ে ছোট হয়ে দাঁড়িয়েছে (মাত্র ৭০ হাজার প্রশিক্ষিত সেনা)। নৌবাহিনীর অবস্থাও শোচনীয়। ছয়টি পারমাণবিক সাবমেরিনের মধ্যে মাত্র একটি সমুদ্রে টহল দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষ স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের এভাবে চলে যাওয়া দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে খাদের কিনারে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Advertisement

সাবেক এসএএস কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিচার্ড উইলিয়ামস বলেন, ‘পেশাদার এবং অনুগত সৈনিকরা যদি চলে যায়, তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। রাজনীতি আর বাজেটের মারপ্যাঁচে সেনাবাহিনী এখন কোণঠাসা।’

যদিও দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা সবসময় আন্তর্জাতিক আইন মেনেই চলে এবং সৈনিকদের আইনি সুরক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা ও সৈনিকদের গণপদত্যাগ ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফকেএএ/