তিব্বতের ঐতিহ্যবাহী ‘বাথিং ফেস্টিভ্যাল’ বা ‘গোসল উৎসব’-এ সব বয়সী নারী-পুরুষ নদীতে একসঙ্গে গোসল করেন। আনন্দঘন এই উৎসবে তরুণ-তরুণীরা সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী খোঁজার সুযোগ পান।
Advertisement
প্রতি বছর তিব্বতি পঞ্জিকার জুলাইয়ের শুরুর দিকে এই উৎসব বা ‘গোসল সপ্তাহ’ উদযাপিত হয়। শহর থেকে গ্রাম- তিব্বতের সর্বত্রই এটি পালিত হয়। লাসা নদীর তীরে আয়োজিত এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের ইতিহাস প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ বছরের পুরোনো।
উৎসবটি সাধারণত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলে। তিব্বতি ক্যালেন্ডারের সপ্তম মাসের ৬ষ্ঠ দিন থেকে ১২তম দিন পর্যন্ত এটি পালিত হয়।
এই সময় প্রতিদিন মানুষ নদীর তীরে যান। প্রথম দিন তারা ভালোভাবে গোসল করেন, পরবর্তী দিনগুলোতে শুধু চুল ও পা ধুয়ে নেন। সপ্তম দিনে আবার পূর্ণাঙ্গ ও যত্নসহকারে গোসল করা হয়। তিব্বতিরা বিশ্বাস করেন, জুলাই মাসই গোসলের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
Advertisement
উৎসব চলাকালে সব বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশু নদী ও ঝরনার ধারে জড়ো হয় এবং আনন্দের সঙ্গে গোসল, সাঁতার ও পানিতে খেলাধুলা করে। ক্লান্ত হয়ে গেলে তারা নদীর ধারের পাথরের সিঁড়িতে বসে। সেসময় তারা বিশ্বাস করে, শুধু শরীরের ময়লাই নয়, দুর্ভাগ্য, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা ও কষ্টও ধুয়ে ফেলছে।
নদীর তীরে মানুষ একে অপরের ওপর পানি ছিটায় ও পিঠ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
এদিকে কেউ কাপড় ধোয়, কেউ বিছানার চাদর পরিষ্কার করে, আবার কেউ বাড়ি থেকে আনা পোশাক ধুয়ে নেয়। ফলে পুরো নদীতীর একটি প্রাণবন্ত সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। একই সময় তরুণ-তরুণীরা গান গেয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ সঙ্গী খোঁজার চেষ্টা করে।
তারা সঙ্গে করে যবের মদ, বাটার টি এবং অন্যান্য উৎসবের খাবার নিয়ে আসে। গোসলের পর সবাই মিলে খাবার ভাগাভাগি করে খায়। কেউ নদীতে মজা করে পানি ছিটায়, আবার কেউ উচ্চস্বরে গান গেয়ে নাচে, সব মিলিয়ে উৎসবটি আনন্দে ভরপুর হয়ে ওঠে।
Advertisement
তিব্বতে দীর্ঘ শীত ও স্বল্প গ্রীষ্মের কারণে বসন্তকালে বরফ গলতে শুরু করলে নদীর পানি খুব ঠান্ডা থাকে। তবে জুলাইয়ে আবহাওয়া হয়ে ওঠে মৃদু ও রৌদ্রোজ্জ্বল, নদীর পানি তখন আরও পরিষ্কার ও উষ্ণ হয়, যা গোসলের জন্য আদর্শ।
এছাড়া মানুষের বিশ্বাস, এই উৎসবের সময় নদীর পানিতে আটটি বিশেষ গুণ থাকে। এসময় পানি মিষ্টি, ঠান্ডা, কোমল, হালকা, স্বচ্ছ, গন্ধহীন, গলায় কোনো জ্বালা সৃষ্টি করে না ও পেটের জন্যও উপকারী। এমন পানি শরীর পরিষ্কার ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
একই সঙ্গে পাহাড় থেকে গলে আসা বরফের পানি তুষার পদ্মের মতো বিরল ভেষজ উদ্ভিদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে এই স্বচ্ছ পানি প্রাকৃতিক ওষুধি গুণে সমৃদ্ধ বলে মনে করা হয়, যা জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করে।
ধারণা করা হয়, এই উৎসবের উৎপত্তি তিব্বতি জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে। জনশ্রুতি রয়েছে, যখন আকাশে ‘কিশান স্টার’ দেখা যায়, তখন তার আলোয় আলোকিত নদীর পানি ওষুধি গুণসম্পন্ন হয়ে ওঠে, যা রোগ ও অমঙ্গল দূর করতে পারে।
আরেকটি কিংবদন্তিতে বলা হয়, এক বিখ্যাত স্থানীয় চিকিৎসক মৃত্যুর পরও মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ রেখেছিলেন। তিনি এক রাখাল নারীর স্বপ্নে এসে নির্দেশ দেন, আকাশে উজ্জ্বল তারা দেখা দিলে নদীতে গোসল করত। এতে তার অসুখ সেরে যাবে। নির্দেশ অনুযায়ী ওই নারী নদীতে গোসল করার পর পরই তার অসুস্থতা সেরে যায়।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
এসএএইচ