মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ রাব্বি দেওয়ান। নামটি হয়তো এখনও চলচ্চিত্র অঙ্গনে খুব পরিচিত নয়। তবে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এই ২৬ বছর বয়সী তরুণ। চলচ্চিত্র নির্মাণে তিনি এখনও নবীন হলেও ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের খ্যাতিমান গুরু দাতুক রামলি ইব্রাহিম এবং তার প্রতিষ্ঠিত সূত্রা ড্যান্স থিয়েটারের কাছে রাব্বি এরই মধ্যে সম্ভাবনাময় নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।
Advertisement
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘নিউ স্ট্রেইটস টাইমস’-এর শোবিজ পাতায় রাব্বির এই সাফল্যের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
রাব্বি দেওয়ান নির্মাণ করেছেন ‘রাধা আনবাউন্ড’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র, যেখানে সূত্রা ড্যান্স থিয়েটারের ওডিসি প্রযোজনা ‘রাধে! রাধে!’-এর ভারতের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত সফরের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ভারতের নয়া দিল্লি, চণ্ডীগড় এবং ভাদোদরায় আয়োজিত ভারতীয় সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পরিষদের ১১তম আন্তর্জাতিক নৃত্য ও সঙ্গীত উৎসবে এই প্রযোজনাটি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।
রাব্বি জানান, ২০২০ সালে কোভিড-পরবর্তীতে এক বন্ধুর মাধ্যমে তার সঙ্গে রামলি ইব্রাহিমের পরিচয় হয়। এরপর তিনি সূত্রা ড্যান্স থিয়েটারে কাজ শুরু করেন এবং গত বছর পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি সরাসরি যুক্ত না থাকলেও চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজে নিয়মিত সহযোগিতা করছেন।
Advertisement
২০১৩ সালে মালয়েশিয়ায় আসার পর রাব্বি ইপোহ ও কুয়ালালামপুরে বসবাস করেন এবং জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন। এক সময় তিনি হোটেলের রিসিপশনিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। সেখানেই সহকর্মী ও অতিথিদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে মালয় ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন।
চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি তার আগ্রহ দীর্ঘদিনের। সূত্রায় কাজ করার সময় রামলি ইব্রাহিম তাকে ‘রাধে! রাধে!’ সফর নিয়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পরামর্শ দেন। রাব্বি বলেন, তিনি আমাকে আমার স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা থেকে বের হয়ে বড় কিছু করার সাহস জুগিয়েছেন।
ভারত সফরের নয় দিনের অভিজ্ঞতা রাব্বির জীবনে অনন্য হয়ে আছে। বিশেষ করে কাটক শহরের অভিজ্ঞতা তার কাছে ছিল ভিন্নধর্মী। সরু রাস্তার কারণে গাড়ি প্রবেশ করতে না পারায় দলটিকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ ভারি সরঞ্জাম নিয়ে হেঁটে যেতে হয়। স্থানীয় গ্রামবাসীরা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাদের দেখলেও ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ।
কলকাতায় একটি মজার ঘটনাও ঘটে। এক নৃত্যশিল্পীর হঠাৎ শৌচাগারের প্রয়োজন হলে, পূর্ণ সাজসজ্জায় থাকা অবস্থায় তা সামলানো বেশ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবে তিনি দ্রুত পোশাক বদলে সময়মতো মঞ্চে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
Advertisement
রাব্বির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চলচ্চিত্র শিক্ষার পটভূমি নেই। ‘রাধা আনবাউন্ড’ তার প্রথম চলচ্চিত্র। তিনি ইন্টারনেটের মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাথমিক বিষয়গুলো শিখেছেন। নিজের প্রচেষ্টায় তিনি এই কাজ সম্পন্ন করেছেন, যা তার জন্য যেমন চ্যালেঞ্জিং ছিল, তেমনি গর্বেরও।
যদিও তিনি আগে কখনও নৃত্যচর্চা করেননি, রামলি ইব্রাহিমের উৎসাহে গত তিন বছর ধরে তিনি নৃত্য শিখছেন। তার মতে, নৃত্য শেখা চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সম্পাদনার দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক। তবে তিনি নৃত্যশিল্পী হিসেবে পেশাগতভাবে যুক্ত হওয়ার কোনো পরিকল্পনা করেননি।
ভারত সফরে কাজের চাপে খুব বেশি বিশ্রামের সুযোগ পাননি রাব্বি। তিনটি ক্যামেরা ব্যবহার করে ধারণ করা এবং প্রতিটি শহরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও প্রস্তুত করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও দিল্লির একটি ঐতিহ্যবাহী বাজারে ঘোরার সুযোগ পেয়ে কিছুটা সময় উপভোগ করতে পেরেছিলেন তিনি।
সূত্রা দলের সদস্যদের সঙ্গে প্রথমে কিছুটা সংকোচ থাকলেও দ্রুতই সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বিশেষ করে ‘রাধা’ চরিত্রে অভিনয় করা গীতিকা শ্রী এবং ‘কৃষ্ণ’ চরিত্রে অভিনয় করা ভারতীয় নৃত্যশিল্পী জাগ্যানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
ভারতে অবস্থানকালে মাঝে মাঝে দেশের জন্য মন কেঁদেছে রাব্বি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সংস্কৃতিতে মিল থাকলেও অনুভূতিতে পার্থক্য রয়েছে। এছাড়া প্রিয়জনদের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার খাবার বিশেষ করে নাসি গোরেং খুব মনে পড়ত তার।
রাব্বি দেওয়ান এখনো তার স্বপ্নের পথে হাঁটছেন। সীমিত অভিজ্ঞতা নিয়েও তিনি যে আত্মবিশ্বাস ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন, তা ভবিষ্যতে তাকে চলচ্চিত্র অঙ্গনে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা।
এমআরএম