গত বছরের পহেলা বৈশাখ উদযাপন ছিল অনেকটা ক্লিশে। ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতিও ছিল কম। এবার পোশাক ব্র্যান্ড ও কারুশিল্পীরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বেচাকেনার। তবে জ্বালানি সংকটে বিপণিবিতান ও দোকানপাট সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশা ভঙ্গ হয়েছে ব্যবসায়ীদের।
Advertisement
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দেশে সৃষ্ট হওয়া জ্বালানি সংকটের কারণে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বেচাকেনায়। অবিক্রীত রয়ে গেছে ১৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য। এমনটা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
পোশাক ব্র্যান্ডের মালিক ও দোকানিরা বলছেন, গত বছরের চেয়ে বিক্রি বাড়লেও প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি হয়নি। ব্র্যান্ডভেদে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পোশাক ও কারুপণ্য অবিক্রীত রয়ে গেছে। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন দেশের কারুশিল্পী, ডিজাইনার, ফ্যাশন ব্র্যান্ডের মালিক ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা।
বৈশাখে বিক্রি আশানুরূপ হয়নি
Advertisement
পোশাক ব্র্যান্ডের মালিকরা বলছেন, এবার ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখের ব্যবধান ছিল প্রায় ২০ দিন। ফলে পোশাক ব্র্যান্ড ও কারুশিল্পীরা সময় পেয়েছেন ১৫ দিনের বেশি। ভয়হীনভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নিয়েছিলেন ব্যাপক প্রস্তুতি। গত বছর দেশে সেই অর্থে পহেলা বৈশাখ উদযাপন হয়নি। আর ঈদ ও বৈশাখের মধ্যে ব্যবধান এত বেশিও ছিল না।
বৈশাখে এবার সামগ্রিকভাবে বেচাকেনা খুব ভালো হয়নি। শেষ দিকে কিছুটা চাপ ছিল, কিন্তু সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধের কারণে বিক্রি ভালো হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। আমাদের ধারণা, বৈশাখ উপলক্ষে তৈরি করা প্রায় ৪০ শতাংশ পণ্য থেকে গেছে। আমরা দোকান খোলা রাখার সময় বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।-সাদাকালোর অন্যতম উদ্যোক্তা ও এফইএবি সভাপতি আজহারুল হক আজাদ
এ কারণে এবার সবার প্রস্তুতি অনেক বেশি ছিল। কিন্তু বিক্রি নিয়ে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে দোকানপাট ও বিপণিবিতান সন্ধ্যায় বন্ধের কারণে ক্রেতারা মার্কেটে যেতে পারেননি। এতে বিক্রি অন্তত ৫০ শতাংশ কম হয়েছে।
বৈশাখে এবার কেমন বিক্রি হয়েছে জানতে চাইলে ফ্যাশন হাউজ সাদাকালোর অন্যতম উদ্যোক্তা ও ফ্যাশন এন্টারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) সভাপতি আজহারুল হক আজাদ জাগো নিউজকে বলেন ‘বৈশাখে এবার সামগ্রিকভাবে বেচাকেনা খুব ভালো হয়নি। শেষের দিকে কিছুটা চাপ ছিল, কিন্তু সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধের কারণে বিক্রি ভালো হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি।’
Advertisement
বৈশাখে বিক্রি কম হয়েছে সন্ধ্যায় মার্কেট বন্ধ হওয়ায়
তিনি বলেন, ‘এই সীমাবদ্ধতা না থাকলে বিক্রি আরও ভালো হতে পারতো। আমাদের ধারণা, বৈশাখ উপলক্ষে তৈরি করা প্রায় ৪০ শতাংশ পণ্য থেকে গেছে। আমরা দোকান খোলা রাখার সময় বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।’
এ বিষয়ে পোশাক ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার বৈশাখে বিক্রি মোটামুটি হয়েছে। গত বছরের তুলনায় আমরা আরও ভালো প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টায় মার্কেট বন্ধ হওয়ায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সাধারণত সন্ধ্যার পরই মূল বিক্রি হয়, কিন্তু তখনই শোরুম বন্ধ করার কারণে ক্রেতারা আসার সুযোগ পাননি, এতে বিক্রিতে প্রভাব পড়েছে।’
আরও পড়ুনদোকানপাট, শপিংমল খোলা থাকবে ৭টা পর্যন্তমার্কেট-দোকান খোলার বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তই বহাল‘রাতেই বিক্রি বেশি হয়, লস হলেও কিছু করার নেই’
তাদের প্রস্তুত করা পণ্যের প্রায় ৫০ শতাংশ বিক্রি হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সময়মতো পর্যাপ্ত পণ্য আনতেও কিছুটা সমস্যা হয়েছে। সব মিলিয়ে কয়েকটি কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি হয়নি।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো দোকান খোলা রাখার সময় বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি। দুপুরে দেরিতে খুললেও সমস্যা নেই, তবে অন্তত রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ থাকলে বিক্রি আরও ভালো হতো। পাশের দেশ ভারতেও দীর্ঘ সময় ধরে দুপুরের পর দোকান খোলা হয়। আমাদের দেশেও এমনটি করা যেতে পারে।’
এবার পহেলা বৈশাখে আমাদের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্য বিক্রির লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য অবিক্রীত থেকে গেছে, যা এখন ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।-বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুর রহমান টিপু
জানতে চাইলে ফ্যাশন ব্র্যান্ড লা রিভ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মন্নুজান নার্গিস জাগো নিউজকে বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে দোকানপাট বন্ধের সময় ৭টা করায় এবার লোকজন মার্কেটে কম আসতে পেরেছেন। তারপরও আমরা দেখেছি, মানুষের মধ্যে এবার আগ্রহ ভালো ছিল। বিক্রিও ভালো হয়েছে। গত বছর যেহেতু ঈদের পরপর বৈশাখ ছিল, সে তুলনায় এ বছর বিক্রি বেড়েছে। তবে সবারই একটা অনুভূতি ছিল—যদি রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে পারতাম, তাহলে আরও ভালো বিক্রি হতো।’
সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে মানুষের বাইরে আসার প্রবণতা কমেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এছাড়া সময় তিন ঘণ্টা কম পাওয়ায় আমরা মূল বিক্রির সময়টা মিস করেছি। কিছু পণ্য বিক্রি হয়নি ঠিকই, তবে সবার ক্ষেত্রে সেটি ৫০ শতাংশ নয়। আমাদের প্রায় ২০ শতাংশের মতো পণ্য থেকে গেছে। আমরা মনে করি, ওই অতিরিক্ত তিন ঘণ্টা সময় পেলে আরও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি বিক্রি হতো। তাই কিছু কাপড় দোকানে রয়ে গেছে।’
এবার বিক্রির চিত্রবৈশাখে এবার ৭ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়েছে ও ১৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য অবিক্রীত রয়ে গেছে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। সংগঠনটির মতে, অন্তত ৪০ শতাংশ পণ্য অবিক্রীত রয়ে গেছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুর রহমান টিপু জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত বছর আমরা তিন-চার হাজার কোটি টাকা ব্যবসা করেছিলাম। এবার পহেলা বৈশাখে আমাদের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্য বিক্রির লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য অবিক্রীত থেকে গেছে, যা এখন ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এই বিপুল পরিমাণ পণ্য আগামী বছর বিক্রি করা সম্ভব নয়, ফলে বড় ধরনের মূলধন আটকে গেছে। বর্তমানে বিক্রি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে, এতে ব্যবসায়ীরা কর্মচারীদের বেতন, দোকান ভাড়া ও অন্য খরচ মেটানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে কর্মচারী ছাঁটাইয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে আরিফুর রহমান টিপু বলেন, ‘আমাদের ধারণা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পণ্যই রয়ে গেছে। ফ্যাক্টরিতে কিছু মাল রয়ে গেছে, আবার আমাদের দোকানেও মাল রয়ে গেছে। ফ্যাক্টরিতে রয়ে গেছে, কিছু মাল আমরা নিইনি, না নেওয়ার কারণে ডেলিভারি দিতে পারেনি। কিন্তু ওনারা তো তৈরি করেছেন। গুদামে মাল জমে আছে, দোকানে কিছু মাল বিক্রি করতে পারেনি। সব মিলিয়ে অন্তত ৪০ শতাংশ পণ্য অবিক্রীত রয়ে গেছে।’
দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির এই নেতা আরও বলেন, ‘বৈশাখ ঘিরে দেশে যারা ডিজাইনার আছেন, সারাবছর তারা বৈশাখের জন্য অপেক্ষা করেন, রং-বেরঙের ডিজাইনের পোশাক ও কারুপণ্য তারা মার্কেটে ছাড়েন। তাদের ফ্যাক্টরিতে প্রোডাকশন হওয়ার পর এগুলো আমাদের দোকানে আসে। আর এই পণ্যগুলো সারাবছর বিক্রি হয় না, মৌসুমকেন্দ্রিক। ফলে এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই এবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’
ইএইচটি/এএসএ/এমএফএ