সাহিত্য

আবৃত্তি মানসিক বিকাশের শক্তিশালী মাধ্যম

মির্জা ফারিহা ইয়াসমিন স্নেহা

Advertisement

সাহিত্যের বৈচিত্র্যময় শাখা হলো আবৃত্তি। আবৃত্তি একটি প্রাচীন শব্দ। পৌরাণিক যুগে ‘আবৃত্তি’ কথাটি ব্যবহৃত হতো এবং প্রায় তিন হাজার বছর আগে থেকে শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বুৎপত্তিগতভাবে আবৃত্তি অর্থ বারবার পাঠ করা। বাংলায় ২০টি উপসর্গ পাওয়া যায়; ‘আ’ তার একটি। ‘আ’ মানে সম্যকভাবে বা সর্বতোভাবে।

আবৃত্তি সাধারণ ধারণায় শ্রোতার সম্মুখে কোনো কবিতা বা বক্তব্য আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে উপস্থাপন করার একটি শিল্প। বৈদিক ভাষা যখন রচিত হয়; তখন লেখার কোনো পদ্ধতি আমাদের জানা ছিল না। বৈদিক কবিরা রচনা করতেন মুখে মুখে এবং সে রচনা কাগজে লিখে রাখার মতোই ধরে রাখতেন মুখে মুখে, আবৃত্তির সাহায্যে।

বৈদিক সাহিত্য আবৃত্তির মাধ্যমে যুগে যুগে বাহিত হওয়ার এটিও একটি কারণ ছিল। এ প্রসঙ্গে সুকুমার সেন বলেন, ‘লেখাপড়ার চেয়ে আবৃত্তির উৎকর্ষ অধিক। লেখাতে ভাষার সবটুকু ধরা পড়ে না—না কণ্ঠস্বর, না সুরের টান, না ঝোঁক। কিন্তু আবৃত্তিতে এসবই যথাযথ বজায় থাকে।’

Advertisement

মূলত বাংলাদেশ, কলকাতা ও জাপানে আবৃত্তির চর্চা হয়ে থাকে। বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও অন্তর্নিহিত প্রতিভা বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ পাওয়া যায় না; সেখানে আবৃত্তিচর্চা নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করতে পারে। কবিতা ও প্রবন্ধ আবৃত্তি করার মাধ্যমে নতুন নতুন শব্দ, বাক্যগঠন ও সাহিত্যের বিচিত্র দিক সম্পর্কে জানা যায়। কবিতা অথবা গল্পের ভাব, ছন্দ ও অলংকার অনুধাবনের মাধ্যমে সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায়।

আরও পড়ুনসাহিত্যের গভীর পরিসর ও পাঠকের চেতনায় সৃষ্টির পুনর্জন্ম 

কোনো কোনো কবিতা বা প্রবন্ধ মুখস্থ করে তা যথাযথ আবেগ ও অনুভূতিসহ উপস্থাপন করা স্মৃতিশক্তির জন্য একটি কার্যকর অনুশীলন। আবৃত্তিচর্চার জন্য কোনো কবিতা বা গল্পের বিষয়বস্তু মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হয়, যা মানুষের একাগ্রতা বাড়াতে সাহায্য করে। নিয়মিত এই অনুশীলন মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে এবং শেখার ক্ষমতা জোরদার করে।

চিকিৎসকরাও আবৃত্তিকে একধরনের থেরাপি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, আবৃত্তি মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় জানা যায়, নিয়মিত মুখস্থ করার অনুশীলন—যেমন কবিতা বা ধর্মীয় স্তোত্র আবৃত্তি—মস্তিষ্কের সক্ষমতা বাড়ায় এবং বার্ধক্যের স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

আবৃত্তির সময় সুর, ছন্দ ও শ্বাসপ্রশ্বাসের একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার হয়, যা ধ্যান বা মেডিটেশনের মতো প্রভাব ফেলে। এতে প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয় এবং স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমতে সাহায্য করে। সাহিত্য মানুষের গভীর অনুভূতি ও আবেগকে প্রকাশ করে। আবৃত্তির মাধ্যমে সেই আবেগ প্রকাশ বা অনুভব করার সুযোগ তৈরি হয়, যা মানসিক চাপ কমিয়ে স্থিতিশীলতা বাড়ায়।

Advertisement

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে ‘পোয়েট্রি থেরাপি’ বা ‘গ্রন্থ চিকিৎসা’ একটি সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আবৃত্তির সময় মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন ও সেরোটোনিনের মতো ‘সুখের হরমোন’ নিঃসৃত হতে পারে, যা মন ভালো রাখতে সহায়তা করে।

আরও পড়ুনআধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা 

ছোটবেলা থেকে আবৃত্তিচর্চা করলে শিশুরা ধীরে ধীরে আঞ্চলিকতার প্রভাব কাটিয়ে প্রমিত বাচনভঙ্গির অধিকারী হয়। এটি কেবল বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও সহায়ক। যাতে শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে। তাই বলা যায়, আবৃত্তি কেবল একটি শিল্পমাধ্যম নয় বরং এটি মানসিক বিকাশ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গঠনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

লেখক: মার্কেটিং দ্বিতীয় বর্ষ, রাজশাহী কলেজ।

এসইউ