মতামত

নকলের চাইতেও বড় সমস্যা ঘিরে আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে

একথা শতভাগ সত্য যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা। অথচ সেখানেই শিক্ষার মান, ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকদের মূল্যায়ন, বরাদ্দসহ বিভিন্ন জায়গায় নানা অবহেলা চলে আসছে। শিক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলে এসেছেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য হলো মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতি সরকারের অবহেলা। সব সরকারই এক্ষেত্রে খুবই কম বাজেট বরাদ্দ করে এবং দায়সারাভাবে শিক্ষার প্রসার ঘটানোর চেষ্টা করে।

Advertisement

আমাদের শিক্ষার মান যেহেতু নিম্নমুখী, সেহেতু শিক্ষাখাতের বড় ধরনের সংস্কার দরকার। অতীতের সরকারগুলো যেমন এ খাত নিয়ে খুব একটা চিন্তা করেনি, তেমনি ভবিষ্যতের সরকার চিন্তা করবে, সে আশাও করতে পারছি না। তবে আশা ছেড়ে দিলে হবে না, বর্তমান সরকার যদি সত্যিই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কিছু করতে চায়, তাহলে কিছু উদ্যোগ তাদের নিতেই হবে, কিছু দুর্বলতা কাটাতেই হবে।

বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমানে যে দুর্বলতাগুলো দেখা যাচ্ছে, তা একক কোনো কারণে নয় বরং শিক্ষা কাঠামো, শিক্ষকতা পদ্ধতি, সামাজিক বাস্তবতা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রধান সমস্যাগুলো হলো দক্ষ শিক্ষকের তীব্র অভাব, মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা পদ্ধতি, ভুলসহ বা অর্ধসত্য তথ্য দিয়ে পাঠ্যপুস্তক, এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত অবকাঠামোর ঘাটতি।

যারা শিশুদের জন্য বই লিখছেন, তাদের অবশ্যই শিশুর বুদ্ধি বিকাশের বিভিন্ন স্তর, তাদের শব্দ গ্রহণ করার ক্ষমতা, শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় শব্দ, প্রয়োজনীয় তথ্য ইত্যাদি বিষয় ভেবেই বই প্রকাশনার কাজে হাত দেওয়া উচিত। নিছক উদাসীনতা থেকে শিশুকে ভুল শেখানোটা রীতিমতো অপরাধ। এর শাস্তি হওয়া উচিত। আমি জানি না বিশ্বের আর কোনো দেশে শিশুদের পাঠ্যবইতে ভুল থাকে কিনা? এমনকি আমাদের দেশের ইংরেজি মাধ্যমের যে বইগুলো বিদেশ থেকে আসে, সেগুলোও ভুলহীন থাকে।

Advertisement

এছাড়া, রয়েছে গ্রাম ও শহরের বিদ্যালয়ের মধ্যে গুণগত মানের বৈষম্য, অতিরিক্ত চাপের কারণে শিক্ষকদের পাঠদানে মনোযোগের অভাব এবং শিক্ষকদের অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদান। সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে বেতন ও সুবিধার বৈষম্য পাঠদানে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে শিক্ষা যেমন সবার জন্য সমান নয়, তেমনি এখানে নানাধরনের শিক্ষা পদ্ধতি চালু আছে। যেমন: বাংলা মাধ্যম, বাংলা মাধ্যমের ইংরেজি ভার্সন, ইংরেজি মিডিয়াম, সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষা, কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা শিক্ষা, ইংরেজি মিডিয়াম মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা। সব পদ্ধতিতে একভাবে বা একধরনের মানের বিষয় পড়ানো হয় না। কোথায়, কে, কী শিখছে বা তাদের ঠিক কী পড়ানো হচ্ছে, এই বিষয়টাও সঠিকভাবে মনিটরিং করা হয় না।

শহরের স্কুলগুলো উপজেলা ও গ্রামের স্কুলগুলোর চাইতে সবদিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এখানে ভালো শিক্ষক, কোচিং, প্রযুক্তি সুবিধা, ল্যাব সুবিধা, হাতে-কলমে শেখার সুযোগ, স্কুল অবকাঠামো ও যাতায়াত ব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত। গ্রামে এসব সুযোগ সীমিত। ফলে শহর ও গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা একই ক্লাসে পড়লেও শিক্ষার মানে বড় পার্থক্য তৈরি হয়।

অন্যদিকে ধনী ও সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা ভালো শিক্ষা পায়, নিম্নবিত্তের সন্তানরা তা পায় না। কারণ অনেক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে ভালোভাবে পড়ানো হয় না। যাদের হাতে অর্থ আছে তারা সেটা কিনে নিতে পারে, বাকিরা পারে না বলে পিছিয়ে পড়ে। সমস্যাটি নতুন নয়, অনেক আগে থেকেই এমন হয়ে আসছে।

Advertisement

সরকারের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, প্রাথমিক চিকিৎসা, স্যানিটেশন ব্যবস্থাসহ নানা ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে দেশের মাধ্যমিক স্তরের (সরকারি-বেসরকারি) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার মান উন্নয়নের নানা দিকেও ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার্থীদের তুলনায় পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করার পরিবর্তে আত্মস্থ করার প্রবণতা বাড়লেও এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ খুব একটা কাজে আসছে না। (প্রথম আলো)

আমাদের নতুন শিক্ষামন্ত্রী দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনার জন্য শুরু থেকেই অর্থাৎ গত দুই মাস যাবত নানাধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করার কথা বলছেন। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় “নকল” ঠেকানোর জন্য তাঁর উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

তবে মন্ত্রী মহোদয় হয়তো জানেন না, এখনকার ছাত্রছাত্রীদের নকল করার প্রবণতা কমেছে। পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তিত হওয়ায় ১৯/২০ বছর আগের নকল পদ্ধতি এখন আর সেরকম কার্যকরও নয়। নকল করার চাইতেও বড় সমস্যা ঘিরে আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে।

সৃজনশীল পদ্ধতি হচ্ছে একটি বিষয় মুখস্থ না করে পুরোপুরি আত্মস্থ করা, নিজের মতো করে বিষয়টাকে ধারণ করে প্রয়োগ করা। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষকেরা মনে করেন, সৃজনশীল পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মান, পরীক্ষায় পাসের হার ও নকলের প্রবণতা কমেছে। নিজেদের প্রকাশ করার প্রবণতাও বেড়েছে।

অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের সৃজনশীল প্রশ্নসহ বিভিন্ন ধরনের বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন প্রণয়নে দুর্বলতা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পাঠদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে মাউশির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৪৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এখনো ঠিকভাবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন করতে পারেন না। কাজেই এই ক্ষেত্রে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কয়েকটি ধাপে এবং মোটামুটি দীর্ঘমেয়াদি আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। অভিযোগ আছে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আন্তরিকতারও অভাব রয়েছে। কাজেই এই প্রশিক্ষণ কার্যকর হচ্ছে কি না, তা যাচাই করে দেখার ব্যবস্থা থাকা দরকার।

পড়াশোনার সার্বিক মান উন্নয়ন ও শিক্ষা গ্রহণ করার পদ্ধতি কীভাবে সহজ করা যায়, সেইটা এখন ভাবার বিষয়। ছাত্রছাত্রীদের প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি কমিয়ে বই পড়ার দিকে কীভাবে আগ্রহ বাড়ানো যায়, তা দেখতে হবে। বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বোঝার বদলে মুখস্থ করা। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য বিষয় মুখস্থ করে। বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা কম হয় ফলে সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে ওঠে না।

পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীলতা অনেকটাই দুর্বল করে তোলে। তারা অধিকাংশই পরীক্ষায় পাসের জন্য বা ভালো নম্বরের জন্য পড়াশোনা করে। বলা যায়, পুরো পড়াশোনাটাই ঘুরে ফলাফলের উপর। ভালো নম্বর পেলেই, ভালো ছাত্র বলে মনে করা হয়। ফলে শিশুর শেখার আনন্দ বা কৌতূহল হারিয়ে যায়। শিক্ষাটাকে আমরা প্রতিযোগিতার মতো দাঁড় করিয়েছি, শেখা নয়।

এবার আসি অন্য একটি জরুরি প্রসঙ্গে, যা যা পড়ানো হচ্ছে, এর কতটা শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করতে পারছে? প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করছি বিশ্বব্যাংকের একটি রিপোর্টের কথা। সেখানে বলা হয়েছে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের লার্নিং পোভার্টি ব্রিফ অনুযায়ী, দেশে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৫১ শতাংশই তাদের বয়স উপযোগী একটি সাধারণ লেখা পড়ে তা বুঝতে পারে না।

হয়তো শিশুরা ক্লাসে বই খুলে উচ্চারণ করতে বা পড়তে জানে, কিন্তু তাদের অনেকেই আসলে যা পড়ে, তা বোঝে না। দেশে সাক্ষরতার হার বাড়লেও শিক্ষার্থীদের বোঝার ক্ষমতার ক্ষেত্রে গভীর সংকট রয়ে গেছে, যা পড়ে এর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারে না অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান ও শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা নিয়ে এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে ইউনেস্কো ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে।

এরই ধারাবাহিকতা আমরা দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাঙ্গনে দেখতে পাচ্ছি বললেও খুব একটা ভুল বলা হবে না। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের শিক্ষার দুর্বলতা আমরা বয়ে নিয়ে চলেছি। গাছের গোড়া শক্ত না হলে, ভালো ফল ফলবে কেমন করে? এতে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে দুটি বিষয়, স্কুলে গিয়ে শেখার ঘাটতি এবং একেবারেই স্কুলে না যাওয়া শিশুদের হার।

বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কোর রিপোর্টের কথা অনুযায়ী বলা যায়, দেশের শিক্ষার মূল সংকট প্রাথমিক স্তর থেকেই শুরু হয়। সেই ঘাটতি বছরের পর বছর ধরে জমা হয়। আমরা এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি যেখানে সংখ্যাই সত্য হয়ে উঠেছে। পাসের হার সেখানে সাফল্যের প্রতীক, আর জিপিএ-৫ এর সংখ্যা তৃপ্তির মানদণ্ড। ভালো ফলাফল দেখাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শেখার প্রকৃত সংকট আড়াল করেছি। সেই সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এমন শিক্ষা ব্যবস্থা চাই যা বাস্তব অবস্থাকে প্রতিফলিত করবে।

মাধ্যমিক পর্যায়ে রেজাল্ট খারাপ হওয়ার আরও কারণ হচ্ছে বারবার শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি। পাস করানোর জন্য গ্রেস মার্ক বা সহানুভূতি মার্ক দেওয়াও যেমন শিক্ষার্থীদের জন্য মন্দ ফল বয়ে আনে, তেমনি এটা বন্ধ করে দেওয়া ও বাড়তি কড়াকড়ি আরোপের ফলেও শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো নিজেদের সক্ষমতাকে বিচার করতে পারে।

যখন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী বা এর বেশি পাস করতে পারে না, তখন বুঝতে হবে গোড়ায় গলদ আছে—অবশ্যই গলদ আছে। সেই গলদের জায়গাগুলো ঠিক করতে হবে। এজন্য গবেষণা করা দরকার। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষকের দায়দায়িত্ব, অভিভাবকদের সচেতনতা, শিক্ষার নীতিগত পরিবর্তন, ছাত্রছাত্রীদের সহায়তা প্রদান—সব বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার।

শিক্ষার দুর্বলতার জন্য শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় একাই দায়ী নয়, সংশ্লিষ্ট সবারই দায় আছে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক, স্কুল-কলেজ, অভিভাবক—সবারই দায় আছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলেন, বোঝাপড়ার দক্ষতা অর্জনে কেবল পাঠ্যবই নয়, প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক ও কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতি। নানাধরনের অব্যবস্থার দায় এখন শুধু শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার বহন করে চলেছে।

আমাদের পাঠ্যপুস্তকের মান নিয়েও বারবার প্রশ্ন উঠেছে কিন্তু এর পরিমার্জন কতটা করা হয়েছে? ভবিষ্যতেও কি এদিকে দৃষ্টি দেওয়া হবে? জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রতিটি বইয়ের জন্য লেখক-সম্পাদক থাকেন, থাকেন বিষয় বিশেষজ্ঞ। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও দেখেন। তাহলে এত দুর্দশা কেন? ভুলসহ বইগুলো কেন শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়? স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাই আমাদের মূল শক্তি, তাদেরকে ভুল বা আংশিক বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া অপরাধ।

যারা পাঠ্যবই লিখছেন, যারা তথ্য সম্পাদনা করছেন, যারা ভাষার ব্যবহার দেখছেন, যারা প্রুফরিডিং করছেন, তারা যদি একসাথে বসে অর্থাৎ সমন্বিতভাবে পাঠ্যবই প্রণয়নের কাজটি করেন, তাহলে অনেক ভুলই সংশোধন করে নেওয়া সম্ভব। তথ্য ব্যবহার করার সময় রেফারেন্স উল্লেখ করলে, অসুবিধা কোথায়? আধুনিক সিস্টেম অনুযায়ী সব লেখায়, বইতে রেফারেন্স ব্যবহার করা উচিত। আসলে পাঠ্যপুস্তক রচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ এই কাজটি খুব অবহেলার মধ্যে দিয়ে হয়, আর সেকারণেই বছরের পর বছর ভুল থেকেই যায়।

যারা শিশুদের জন্য বই লিখছেন, তাদের অবশ্যই শিশুর বুদ্ধি বিকাশের বিভিন্ন স্তর, তাদের শব্দ গ্রহণ করার ক্ষমতা, শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় শব্দ, প্রয়োজনীয় তথ্য ইত্যাদি বিষয় ভেবেই বই প্রকাশনার কাজে হাত দেওয়া উচিত। নিছক উদাসীনতা থেকে শিশুকে ভুল শেখানোটা রীতিমতো অপরাধ। এর শাস্তি হওয়া উচিত। আমি জানি না বিশ্বের আর কোনো দেশে শিশুদের পাঠ্যবইতে ভুল থাকে কিনা? এমনকি আমাদের দেশের ইংরেজি মাধ্যমের যে বইগুলো বিদেশ থেকে আসে, সেগুলোও ভুলহীন থাকে।

সত্তর ও আশির দশকে স্কুলে পড়ার সময় আমরা যে পাঠ্যপুস্তক বা টেক্সট বই পড়েছি, সেই বই হয়তো খুব আধুনিক ছিল না, কিন্তু ভুলে ভরাও ছিল না। সহজ, সরল ও সাদামাটা ধরনের এই বইগুলোর ছাপা ছিল ম্লান, বইয়ের পাতা ছিল অনুজ্জ্বল ও সস্তা নিউজপ্রিন্টের। সে সময় ইন্টারনেট, গুগল ও বিভিন্ন তথ্য সাইট ছিল না। তাই ছাত্রছাত্রীদের যা শিখতে হতো তা এই বই থেকেই শিখতে হতো। এই অনাকর্ষণীয় বইগুলোই ছিল আমাদের সম্বল। ওই বই পড়েই আমরা বড় হয়েছি।

মাঝখানে অনেক যুগ পার হয়ে গেছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে নানা সরকার নানাভাবে সাজিয়েছে। যে যেভাবে পেরেছে ইতিহাসের ওপর কাঁচি চালিয়েছে। পাঠ্যবই কলেবরে বেড়েছে, ছবি রঙিন করা হয়েছে, পাতাগুলোও একটু ভালো হয়েছে এবং নতুন নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু গুণগত মান কতটা বেড়েছে তা গবেষণার দাবি রাখে।

অনেকগুলো বিষয় মাথায় নিয়ে সরকারকে শিক্ষা শুদ্ধি অভিযানে নামতে হবে, শুধু নকল প্রতিরোধ নয়। মাধ্যমিক শিক্ষার সার্বিক পরিস্থিতিকে ঠিকঠাকভাবে চালাতে চাইলে এখন সরকারের উচিত হবে সঠিক কর্মপরিকল্পনা করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। এ জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ দরকার, আর দরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সঠিকভাবে এর ব্যবহার।

২১ এপ্রিল, ২০২৬

লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

এইচআর/এএসএম