মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ব রাজনীতির এক অগ্নিগর্ভ অঞ্চল। ধর্মীয় বিভাজন, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সর্বোপরি জ্বালানি সম্পদের ওপর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর লোভ ও দ্বন্দ্ব এই অঞ্চলকে বারবার সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে টানা উত্তেজনা বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে নতুন করে শঙ্কার মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যদি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যে গভীর অভিঘাত হানবে।
Advertisement
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো তেলের বাজার। ‘অয়েল শক’—অর্থাৎ তেলের দামের আকস্মিক উল্লম্ফন—ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ তীব্র হলে এই শক আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
বিশ্বের প্রমাণিত তেল মজুদের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা হঠাৎ করেই বিপর্যস্ত হতে পারে।
সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়বে—এটাই বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম। আর এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিই তৈরি করে অয়েল শক। ইতিহাসে এর নজির রয়েছে। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তেল অবরোধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। আবার ১৯৯০ সালে কুয়েত আক্রমণের পরও তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।
Advertisement
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এমনিতেই নানামুখী সংকটে জর্জরিত। কোভিড-১৯-এর অভিঘাত পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তার ওপর ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ‘ডাবল শক’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অয়েল শকের প্রথম ধাক্কা পড়ে জ্বালানি খাতে, কিন্তু এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচ বৃদ্ধি পায়, ফলে পণ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়। কৃষি খাতও এর বাইরে নয়—সার উৎপাদন, সেচ ও যন্ত্রচালনায় জ্বালানির ওপর নির্ভরতা থাকায় খাদ্য উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
বাংলাদেশের জন্য এখনই সময় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে।অয়েল শক এখন আর কেবল অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তার অভিঘাত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। বাংলাদেশও এর বাইরে থাকবে না। তাই এখনই প্রয়োজন কূটনীতি, সহযোগিতা এবং দূরদর্শী নীতিনির্ধারণ। অন্যথায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুন থেকে সৃষ্ট অয়েল শক বিশ্ব অর্থনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মুদ্রাস্ফীতিও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। শিল্প উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেলে উৎপাদকরা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে।
Advertisement
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও জটিল। তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে, রিজার্ভ কমে যায় এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি বাড়ে। ইতোমধ্যেই দেশে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং নিত্যপণ্যের বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অয়েল শক কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রভাবও বিস্তার করে। জ্বালানি নিরাপত্তা তখন রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয় এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রায়ই প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নেয়। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও রাশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে একটি সীমিত সংঘাতও দ্রুত বিস্তৃত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে—বিকল্প কী?প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ ও সবুজ হাইড্রোজেনের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, কৌশলগত তেল মজুদ গড়ে তোলা প্রয়োজন। সংকটকালে এই মজুদ ব্যবহার করে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা যায়।
তৃতীয়ত, কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
চতুর্থত, জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে হবে। শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং অপচয় রোধের মাধ্যমে জ্বালানি চাহিদা কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য এখনই সময় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে।
অয়েল শক এখন আর কেবল অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তার অভিঘাত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। বাংলাদেশও এর বাইরে থাকবে না।
তাই এখনই প্রয়োজন কূটনীতি, সহযোগিতা এবং দূরদর্শী নীতিনির্ধারণ। অন্যথায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুন থেকে সৃষ্ট অয়েল শক বিশ্ব অর্থনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।fakrul@ru.ac.bd
এইচআর/জেআইএম