চট্টগ্রামে গাড়িশূন্য প্রায় সব পেট্রোল পাম্প। বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৯টা থেকে সোয়া ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ত ছয়টি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
Advertisement
ফিলিং স্টেশনগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারী গাড়িচালক ও বাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে। এতে গাড়ি চাপ কমে গেছে। দাম বাড়ানোর আগের কৃত্রিম মজুত করা জ্বালানিও ব্যবহার হওয়ায় এমন দৃশ্য তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য তাদের।
ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাপ কমার বিষয়টি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর বিশেষজ্ঞ পরামর্শে অকটেন সরবরাহ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় এমন সুফল মিলেছে।
জ্বালানি সংকট নিয়ে গত ১৯ এপ্রিল রাতে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মনজারে খোরশেদ আলমের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজ।
Advertisement
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, বিপিসির কাছে স্টোরেজের বেশি অকটেন হাতে রয়েছে, তাতে সারাদেশে পেট্রোল পাম্পগুলোতে অকটেন ব্যবহার করা যানবাহনগুলোর চাপ কমাতে সরবরাহ অবারিত করে দেওয়া উচিত। একদিকে যেহেতু দাম বাড়ানো হয়েছে, তাতে মানুষ আর স্টক করার সুযোগ নেবে না। যেগুলো স্টকে আছে সেগুলোও বাজারে চলে আসবে। এখন বিপিসির উচিত সরবরাহ সীমিত না করে কয়েকদিন অবারিতভাবে অকটেন সরবরাহ দেওয়া। পেট্রোল পাম্পগুলোতে গাড়ির চাপ কমলে সারাদেশে তৈরি হওয়া প্যানিকও কমে যাবে।
আরও পড়ুনজ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে মূল্যস্ফীতি ১৩.৫ শতাংশ হতে পারেসরকারের কোনো উদ্যোগেই কাটছে না জ্বালানি খাতের অস্থিরতাসরকার জ্বালানির দাম বাড়িয়ে অনাস্থার শিকার হলো
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞের দেওয়া সবগুলো মন্তব্য পরামর্শ হুবহু মিলে গেছে। অকটেন সরবরাহ অবারিত করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আগের তৈরি হওয়া ‘প্যানিক’ দূর হয়েছে। ফলে পাম্পগুলোতে এখন কেউ অহেতুক ভিড় করছে না।
বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে নগরীর ছয়টি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোনো চাপ নেই। বিশেষ করে দুইদিন আগেও যেখানে বড় বড় ফিলিং স্টেশনগুলোতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তেলের জন্য লম্ব লাইন ছিল, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এসব লাইন শূন্য হয়ে গেছে।
Advertisement
সকাল সোয়া ৯টার দিকে নগরীর লালদীঘি মোড়ের মেসার্স সিরাজুল হক অ্যান্ড সন্স পেট্রোল পাম্পে কথা হয় বাইকার জিয়াউর রহমান রানার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আজকে তেল নিতে লাইন ধরতে হয়নি। তিনশ টাকার অকটেন নিয়েছি।’
পাম্পের কর্মচারী মো. আলমগীর বলেন, ‘গতকাল একটু চাপ থাকলেও আজকে কোনো চাপ নেই। দুইদিন আগেও সবাই ট্যাংকি ভরে অকটেন নিতে চাইতো। এখন নিয়েছি তিনশ টাকার। অনেকে আগে মজুত করেছিল, দাম বাড়ানোর পর এখন সেগুলো ব্যবহার করছে। এজন্য পাম্পে চাপ কমে গেছে।’
এ সময় রহমান নামের এক চালক বলেন, ‘এখন বসে বসে মাছি মারছে। তেলের কাস্টমার নাই।’
চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি অকটেন বিক্রি হয় নগরীর গণি বেকারি এলাকার মেসার্স কিউ সি ট্রেডিংয়ে। কিউসি গ্রুপের মালিকানায় পাম্পটিতে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে স্বাভাবিক সময়ের মতোই গাড়ি দেখা গেছে। দুইদিন আগেও পাম্পটিতে প্রাইভেট কারের লাইন দুই কিলোমিটার ছাড়িয়েছিল।
পাম্পের কর্মচারী মো. ফারুক বলেন, ‘এখন প্রতিদিন চার-পাঁচ গাড়ি তেল দিচ্ছে। আমরাও চাহিদা মোতাবেক বিক্রি করছি। এতে গাড়ি চাপ একেবারে কমে গেছে।’
সাড়ে ৯টার দিকে পাঁচলাইশের কাতালগঞ্জ মেসার্স খান ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র মিলেছে। ওই সময়ে পাম্পটিতে অকটেন নেওয়ার কোনো গাড়িই ছিল না।
পাম্পের কর্মচারী বাবন বিশ্বাস বলেন, ‘অকটেনের সাপ্লাই স্বাভাবিক। আমাদের মজুতও আছে। সংকট কমে গেছে। বিক্রিও কমে গেছে। তবে ডিজেলের সংকট এখনো আছে।’
পাশেই কাতালগঞ্জ মেসার্স আলহাজ মো. ইউনূস অ্যান্ড কোং ফিলিং স্টেশনে দুটি প্রাইভেট গাড়ি লাইনে দেখা গেলেও কিছু সময় পরপর একেকটি মোটরসাইকেল আসছে পাম্পটিতে। চাহিদামাফিক অকটেন পাচ্ছে সবগুলো গাড়ি।
কথা হলে পাম্পের কর্মচারী মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘আগে বাইক শেয়ার করা চালকরা দিনে একশ টাকার অকটেন নিতো। সংকটের সময়ে ওনারাই ফুল ট্যাংকি তেল চেয়েছিলেন। হয়তো তখন তারা নিয়ে গিয়ে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করে দিতো। এখন সরকারিভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা বিক্রি করতে পারছে না। তাছাড়া আগে অনেকে মজুত করে রেখেছিল।’
কথা বলে পাম্পটির স্বত্বাধিকারী সামশুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিপো থেকে বাড়তি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী অকটেন দেওয়া হচ্ছে চালক বাইকারদের। যে কারণে পাম্পে আগের মতো প্রাইভেট গাড়ির অস্বাভাবিক চাপ নেই। তবে বিক্রি স্বাভাবিক। খুব সম্ভব, আগে অনেকে কিনে স্টোরেজ করেছিল, এখন সেগুলো ব্যবহার করছে।’ তবে ডিজেল সরবরাহে এখনো ঘাটতি রয়েছে বলে জানান তিনি।
একমাস ধরে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত প্রাইভেট গাড়ির পাশাপাশি বাইকের লম্বা লাইন থাকতো নগরীর নাছিরাবাদ এলাকার মেসার্স সেনা ফিলিং স্টেশনে। বৃহস্পতিবার সেই লাইন একেবারের নেই। তবে আগের মতো স্বাভাবিক বিক্রি হচ্ছে জানালেন পাম্পটির প্রকল্প প্রধান কাজী মোবারক।
আরও পড়ুনডিজেলে কৃষকের খরচ বাড়বে দেড় হাজার কোটি টাকা১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারে ১৮ দিনে বাড়লো ৬০০ টাকাতেলের দামের ধাক্কায় দিশাহারা রাইড শেয়ারিং চালকরা
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর ডিপোগুলো থেকে রেশনিং করে তেল দেওয়া হতো। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি আতঙ্ক ছিল। দেশের তেলের সংকট হবে, দাম বাড়বে। এতে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে বেশি তেল মানুষ কিনেছিল। এখন সহনীয় পর্যায়ে দাম বাড়ানোর সঙ্গে অকটেনের সরবরাহ অবারিত করার পর মানুষের মধ্যে সেই সন্দেহ কেটে গেছে। যে কারণে পাম্পে গাড়ি চাপ কমেছে।’
তবে গাড়ির অস্বাভাবিক চাপ কমে গেলেও বিক্রি আগের স্বাভাবিক সময়ের মতো আছে বলে জানান তিনি।
নগরীতে গাড়ির বেশি চাপ থাকা পাম্পের একটি নগরীর দামপাড়া এলাকার মেসার্স সিএমপি ফিলিং স্টেশন। দেড় মাস ধরে রাতদিন লাইন থাকতো পাম্পটিতে। মাত্র দুইদিনের ব্যবধানে উল্টো চিত্র মিলেছে। বৃহস্পতিবার সকালে পাম্পটিতে গাড়ির কোনো লাইন ছিল না। স্বাভাবিক সময়ের মতো জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে জানালেন পাম্পের কর্মচারীরা।
পাম্পটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এয়াকুব গ্রুপ। এয়াকুব গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার হাসান উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘কয়েকদিন থেকে পদ্মা অয়েল থেকে আমরা বাড়তি সরবরাহ পাচ্ছি। পাশাপাশি প্রায় পাম্পে এখন তেল পাওয়া যাওয়ায় মানুষের মধ্যে প্যানিক কমে গেছে।’
কথা হলে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘দেড় মাস ধরে মানুষের মধ্যে প্যানিক ছিল। সবার মধ্যে কৃত্রিম মজুতের একটি মানসিকতা ছিল। এর মধ্যে সরকার দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে দাম বাড়ানোর পাশাপাশি অকটেনের সরবরাহ বাড়িয়ে দেওয়ার সুফল মিলছে। সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ম্যাজিকের মতোই কাজ করেছে। এতে গ্রাহকদের মতো আমাদের কাছেও বিষয়টি স্বস্তির।’
এমডিআইএইচ/এমআরএম/এমএমএআর