অর্থনীতি

‘আইএমএফ ঋণ অনিশ্চয়তা নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে’

‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বাজারে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এটি অনেকাংশেই ‘স্ব-সৃষ্ট চাপ’, যা বর্তমান সময়ে দেশের জন্য বহন করা কঠিন।’

Advertisement

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) কনফারেন্স রুমে ‘ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস: বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক আলোচনায় এ কথা বলেন বক্তারা। এ আলোচনা সভার আয়োজন করে পিআরআই ও অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি)।

অনুষ্ঠানে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপনকালে পিআরআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত গত ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৪ সালের শেষ দিকে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৮.৯ শতাংশে নেমে এসেছে এবং গত পাঁচ মাসে ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি দ্বি-অঙ্কে পৌঁছেছে— যা আর্থিক খাতে আস্থার কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়।’

তিনি বলেন, ‘এই পুনরুদ্ধার কিছু মৌলিক দুর্বলতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশে— যা কোভিড সময়ের পর সর্বনিম্ন। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশে পৌঁছানোয় আর্থিক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে নেমেছে। পাশাপাশি রাজস্ব খাতে পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় সরকার উচ্চ সুদের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নও নিতে হচ্ছে।’

Advertisement

ফলে এই ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন তিনটি সমসাময়িক বহিরাগত চাপের মুখে— মধ্যপ্রাচ্য সংকট, আসন্ন এলডিসি উত্তরণ, এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তা। এসব চাপ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রবাহের দুর্বলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের মাধ্যমে অর্থনীতির সর্বস্তরে প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে রপ্তানি কমে যাওয়া এবং জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে, আর সীমিত নীতিগত সক্ষমতা সামগ্রিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এই প্রেক্ষাপটে রাজস্ব ও আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার থেকে সরে আসা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আইএমএফ কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তাও আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বাজারের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এটি অনেকাংশেই ‘স্ব-সৃষ্ট চাপ’, যা বর্তমান সময়ে দেশের পক্ষে বহন করা কঠিন।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন সতর্ক, শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, যেখানে রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে বিচক্ষণতা অপরিহার্য। স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত করতে পারে। একই সঙ্গে কাঠামোগত সংস্কারকে কেবল আইএমএফের শর্ত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।'

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং বিদ্যমান শক্তভিত্তিকে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি।’

Advertisement

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন পিআরআইয়ে চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি মৌলিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেসব দেশ এই ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাই এখন সেই নিয়ম লঙ্ঘন করছে। ফলে এই ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা সম্ভবত একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, যা আরও বহুমুখী, এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হলে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছে। এটি বিশ্ব বাণিজ্য ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং বাণিজ্য প্রবৃদ্ধিও ২–৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আরও কমার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ এর প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না।’

জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত বর্তমানে প্রায় তিন মাসের চাহিদা মেটানোর মতো, যা একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা। জ্বালানির পাশাপাশি সার ও খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে।’

ইএইচটি/এমএএইচ/