জাতীয়

‘জোর করে ভাড়া লই না মামা, ৫-১০ টাকা চাইয়া লই’

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল সকাল ৯টা। রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে গন্তব্য উত্তরা। বাহন তুরাগ পরিবহনের একটি বাস। চলা শুরু করে গোলাপবাগে এসেই সিগন্যালে আটকা। সেটাই শুরু। এরপর অন্তত ২৫টি স্টপেজ ছাড়া বাসের যে গতি ছিল তা ব্যাটারিচালিত রিকশার চেয়ে কম বললে ভুল হবে না!

Advertisement

যাত্রাবাড়ী থেকে উত্তরা রুটে চলাচল করে রাইদা ও অনাবিল পরিবহনও। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রীরা যাত্রাবাড়ী নেমে গন্তব্যে যান। বাসগুলো সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে শুরু করে বেশি যাত্রী তোলা ও আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। তুরাগের সঙ্গে মালিবাগ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা চললো রাইদার। এরপর প্রতিযোগিতায় যুক্ত হলো সদরঘাট থেকে আসা ভিক্টর ও আকাশ পরিবহন। একজন আগে যায় তো আরেকজন বাসের শরীর ঘেঁষে লুকিং গ্লাস ভেঙে চলে যায়। আরেকজন সামনে গিয়ে কোমর বাঁকিয়ে রাখে, যাতে পেছনের বাস আগে না যেতে পারে। এর সঙ্গে বেশি যাত্রী নেওয়ার বিষয়টি যুক্ত। গ্লাস ভাঙলেও কিন্তু কিছু যায় আসে না। কারণ আরেকদিন সে এটা পুষিয়ে নেবে তারটা ভেঙে। সে ইঙ্গিত চালক দিয়ে রাখলেন।

অনাবিলের সঙ্গে চলেছে রেষারেষি

বাসগুলো যখন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত তখন যাত্রীরা বারবার চিল্লাচিল্লি করছিলেন। কেউ অকথ্য ভাষায় গালিও দিচ্ছিলেন চালককে। দেবেনই বা না কেন, একটি আরেকটিকে যখন ওভারটেক করছিল জানালার পাশে বসা যাত্রীর জীবন যায় যায়। গ্লাস ভেঙে রক্তারক্তি হওয়ার ভয় কে না পায়! এর মধ্যে উচ্চশব্দে কান ফাটানো হর্ন তো চলছিলই। মনে হচ্ছিল রিমোর্ট কন্ট্রোল থাকলে বোতাম টিপে যদি রেহাই পাওয়া যেত!

Advertisement

ভাড়া নিয়ে তর্কাতর্কি

এসব অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্যেই চলতে থাকলো ভাড়া নিয়ে চিরাচরিত বিতর্ক। সরকার যতই ভাড়া নির্ধারণ করে দিক, কোম্পানিগুলো যতই লিস্ট সাঁটাক, কন্ডাক্টর ভাড়া নিয়ে নয়-ছয় করবেই। এটাই যেন নিয়ম। এ যাত্রায়ও সেটা থেকে রেহাই মিললো না।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে গত কয়েকদিন থেকে বেশি ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করছে প্রায় সব রুটের বাস। তুরাগে কমলাপুর থেকে কুড়িল বিশ্বরোড যাচ্ছেন জসিম উদ্দীন। তার কাছে নির্ধারিত ৪০ টাকার ভাড়া চাওয়া হলো ৫০ টাকা। তর্কবিতর্ক শেষ হলো যাত্রীর পকেট কেটেই। আরেক যাত্রী সলিমুল্লাহ বলেন, ‘আগে রেলগেট থেকে বাড্ডা লিংক রোড গেলে ভাড়া ছিল ১০ টাকা, এখন ১৫ টাকা চায়। একটু সামনে খিলগাঁও গেলে সেই ভাড়া ২০ টাকা হয়ে যায়। রাইদা পরিবহনও দুদিন ধরে এমন ভাড়া নেয়। কেউ দেয় কেউ দেয় না।’

আরও পড়ুন

কোমর না বাঁকিয়ে চলতে পারে না ঢাকার বাসসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজনপ্রতি কিলোমিটারে বাসের ভাড়া বাড়লো ১১ পয়সা

একপর্যায়ে তুরাগ পরিবহনের চালকের সহকারী মোসলেম বলেন, ‘আমরা জোর করে ভাড়া লই না মামা, ৫ টাকা ১০ টাকা চাইয়া লই। জ্বালানির দাম বাড়ছে, তাই ভাড়া বেশি চাইতে হচ্ছে।’

Advertisement

ভাড়া নিয়ে চলছি তর্কাতর্কি

প্রতিদিন প্রায় ৫০ লিটার তেল লাগে জানিয়ে বলেন, ‘এই তেল দিয়ে তিনটি ট্রিপ দেওয়া যায়। তেল এখন প্রতি লিটারে দাম ১৫ টাকা বেড়েছে। আগে ছিল ১০০ টাকা। এই বাড়তি খরচে আমরা বিপদে। কিছু কিছু কোম্পানির অনেক বাস রাস্তায় নামছে না।’

একই বাসের যাত্রী ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘তর্ক করেই ভাড়া নেওয়া হয়, অনেক সময় উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। কেউ দেয়, কেউ দেয় না।’

ফিটনেসও নেই, যাত্রাও থেমে নেই

বাসটির শরীরের পোস্টমর্টেম না করলেই নয়! জানালা থেকেই শুরু করা যাক। অধিকাংশ গ্লাসই ভাঙা। গ্লাসের পাশের সিটগুলোও বেঁকেচুরে রীতিমতো চোখ রাঙাচ্ছে। একটু অসাবধান হলেই কিংবা পাশের প্রতিযোগী ধাক্কা দিলেই হতে পারে বিপদ। আসনগুলোতে ধুলা-ময়লার আস্তর। বলতে খারাপ লাগলেও পাপোশ টাইপ। কাপড়গুলোও ছেঁড়া। সিটের কংকাল বা ভেতরে থাকা রডগুলো বেরিয়ে এসেছে। কিছু আসনের আবার হেলান দেওয়ার জায়গায় গাড়গোড় ভাঙা, মানে ভেতরে কিছু নেই। পেছনের যাত্রী পা রাখলেই সামনে থেকে যাত্রী বলে ওঠেন, ভাই গুঁতা দিয়েন না!

জানালার অবস্থা

আসনের পেছনে টিনের যে পট্টি থাকে সেগুলোও ভাঙা, বাঁকা। টিনে হাত কাটা কিংবা জামা-কাপড় ছিঁড়ে গেলে তাতে গাড়ির কী আসে যায়। যাবে তো আপনার-আমার। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখা গেলো ছিদ্র। মানে সেখান দিয়ে রাস্তা দেখা যায়! এত কিছুর পরও যাত্রীদের কপাল ভালো যে মালিক গরমের কথা ভেবে ফ্যান রেখেছে।

প্রচণ্ড গরমে বাসের ভেতরের পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। তুরাগের এই বাসে চারটি ফ্যান থাকলেও সচল ছিল তিনটি। এর মধ্যে দুটি ফ্যান চারদিকে ঘুরছে না। যাত্রীরা বলছেন, তুরাগ, অনাবিল ও রাইদার অনেক বাসে ফ্যানে সমস্যা। কোথাও আবার সব ফ্যান চালু থাকলেও সেগুলো ঠিকভাবে ঘোরে না। ফলে গরমে অবস্থা কাহিল হয়ে যায়। মানে এটাও নতুন নয়!

যানজটও নয় নতুন

যাত্রাবাড়ী থেকে রওয়ানা দিয়ে মালিবাগ রেলগেট থেকে শুরু হলো মূল যানজট। এর আগে থেমে থেমে হলেও চলছিল। এক্সপ্রেসওয়ের কাজের কারণেই মূলত এ অবস্থা। এরপর মালিবাগ আবুল হোটেল থেকে ধীরে ধীরে বাস রামপুরা ব্রিজ হয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত কাঠফাটা গরমে হাঁসফাঁস উঠলো। মেরুল বাড্ডা থেকে বাড্ডা ইউলুপ পর্যন্ত কিছুটা স্বস্তি মিললেও ইউলুপ পার হওয়ার পর লিংক রোড পর্যন্ত লম্বা যানজট। এরপর হোসেন মার্কেট থেকে উত্তর বাড্ডা পর্যন্ত আবারও একই চিত্র। এখানে ওভারব্রিজ না থাকা, যত্রতত্র পার্কিং, রাস্তা পারাপারের কারণে তীব্র যানজট নিত্যসঙ্গী। পরে যমুনা ফিউচার পার্ক পর্যন্ত বেশি যানজট থাকলেও পরের অংশে অতটা বেশি ছিল না।

আসনের অবস্থা

যাত্রীদের অভিযোগ, বাসে গাদাগাদি অবস্থায় যাত্রী থাকলেও চালক ও সহকারীরা রাস্তার পাশে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলেন, প্রতিটি ওভারব্রিজের নিচে জটলা তৈরি করে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে। ফলে সড়কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়ে যানজট আরও বাড়ছে।

সংরক্ষিত আসন তুমি কার!

ঢাকা শহরে বাসে ভিড় বাড়লেই সবার আগে নারীদের উঠতে নিরুৎসাহিত করা হয়। এখানেও ঘটলো তাই। নারীরা দাঁড়িয়ে গেলে গাদিয়ে যাত্রী তুলতে পারে না। পুরুষ যাত্রী যত পারেন ওঠেন সমস্যা নেই। একজন আরেকজনের ওপর ঘাম ফেললে, পায়ে পা তুলে দিলে তাতে তাদের কী! বাসে ‘মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন’ উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা গেলো না। সংরক্ষিত আসনে পুরুষরাই বসে থাকলেন। আর অনেক নারীকে উঠতে দিলেন না। অনেকে আবার দাঁড়িয়েই থাকলেন মুখ বুজে। কারণ, নারীরা আসন ছাড়তে বললেও অনেক সময় অপমানের শিকার হন। হয়তো সে ভয়েই কিছু বললেন না।

এ বিষয়ে বাসচালকের সহকারী বলেন, লোকাল বাসে কাউকে বসতে নিষেধ করা কঠিন। সিট খালি হইলে যেই আগে আসে সেই বসে যায়। তবে ট্রিপের শুরুতে কিছু আসন নারীদের জন্য রাখার চেষ্টা করি। সামনে সিট খালি থাকলে নারী-পুরুষ একসঙ্গে উঠলে নারীদের আগে বসতে দেই।

যাত্রাবাড়ী থেকে উত্তরা ৪০-৪৫ মিনিটের রাস্তা। তুরাগ পরিবহন পৌঁছালো প্রায় দুই ঘণ্টা পর। ততক্ষণে কর্মঘণ্টা এক ঘণ্টার বেশি কমে গেলো। প্রাপ্তি হিসেবে বাসের ভেতরের গরম, তর্কাতর্কি, রেস খেলা দেখা হলো। বাড়তি প্রাপ্তি হিসেবে যানজট আর অনাবরত হর্ন তো আছেই। এসবের মধ্যে যে অবসর পাওয়া গেলো তাতে কাচে লাগানো সাধন কবিরাজের সর্বরোগের মহৌষধ পড়তে পড়তে সময় গেলো। আর কিছু সময় পাশের আসনে বসা যাত্রীর মোবাইলে উচ্চ শব্দে বাংলা সিনেমার গান, কৌতুক তো ছিলই! এই হলো আমাদের রাজধানী শহরের গণপরিবহনে যাত্রার ফিরিস্তি।

রাজধানীর এই গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বাস মালিকপক্ষের আন্তরিকতা ও সরকার কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আমরা প্রতিদিন এসব কথা বলি। সমাধানটা হচ্ছে না। সরকারের এ সংক্রান্ত যে কমিটিগুলো, সবগুলো মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের দখলে। এখানে এই প্রস্তাবগুলো যে তুলবে এরকম কোনো প্রতিনিধি নেই। মালিকরা যাত্রীদের এসব ভোগান্তি কোনোদিন তুলবে না। তারা মনে করে, তাদের বাস শতভাগ ভালো, সব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই ফোরামগুলোতে মালিক আছে এবং শ্রমিক ফেডারেশন আছে। সরকারের যারা আছে তারা কিন্তু এসব বাসে চড়ে না। সরকারি গাড়িতে চড়ে কিংবা প্রাইভেট গাড়িতে যারা চড়ে তাদের কানে এটা পৌঁছায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা নীতিনির্ধারলী জায়গায় না যাবে, ততদিন সমাধান হবে না।’

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব আরও বলেন, ‘সমস্যার সমাধান তারা করে না। কারণ এগুলো করতে গেলে মালিকদের একটা বড় ধরনের বিনিয়োগ করা লাগবে। মালিকরা বিনিয়োগ না করার জন্য এই কমিটিগুলো দখল করে রাখে। এখানে কমিটিতে তারা দেখায় যে, তার গাড়ি চকচকা চলছে। গাড়িতে কোনো রকম সমস্যা নেই। তাদের বক্তব্য, গাড়ির কোনো সংকট নেই। শুধু লস আর লস যাচ্ছে। শুধু ভাড়াটা বাড়িয়ে দেন।’

আরএএস/এএসএ