দেশজুড়ে

বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব, ৬ মাসে ভ্যাকসিন নিলেন সাড়ে ৬ হাজার মানুষ

সিলেটে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন গ্রহীতার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিনই বেওয়ারিশ কুকুর এমনকি পোষা বিড়াল ও অন্যান্য প্রাণির কামড় বা আঁচড়ে আহত হচ্ছেন অনেকে। এতে করে বাড়ছে জলাতঙ্কের ঝুঁকি। গত ছয় মাসে নগরীর শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে কুকুর, বিড়াল, বানর ও শেয়ালের আছড় বা কামড়ের ঘটনায় জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিয়েছেন সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি রোগী। ফলে জনমনে তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আতঙ্ক।

Advertisement

এছাড়া, জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন গ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাতও বেড়েছে। রাস্তাঘাট, অলি-গলি ও বাজার এলাকায়ও দলবদ্ধ কুকুরের উপদ্রবে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের নিয়ে শঙ্কিত অভিভাবকরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ছয়মাসে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিয়েছেন ৬ হাজার ৫৪৮জন। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবর মাসে ১ হাজার ৩১, নভেম্বরে ১ হাজার ৩৩০, ডিসেম্বরে ১ হাজার ১৭৪, ফেব্রুয়ারিতে ৮ হাজার ৫২ এবং মার্চ মাসে ৯৮৮ জন মানুষ ভ্যাকসিন নিয়েছেন। তাদের মধ্যে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৮০৭জন। বাকি ৪ হাজার ৭৪১ জনের মধ্যে বেশিরভাগ পোষা বিড়ালের কামড় বা আঁচড় আক্রান্ত হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাস এই হাসপাতালে কোনো ভ্যাকসিন ছিল না। পুরোনো মজুত থেকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। যে কারণে এই দুই মাসে ভ্যাকসিন গ্রহীতার সংখ্যা কম। অবশ্য গত মাসে ৭০০ ভায়াল সরবরাহ করা হয়েছে। সেটিও সেবাগ্রহীতার তুলনায় পর্যাপ্ত না।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুকুর নিধন নিষিদ্ধ থাকায় সিলেটের এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বেড়েই চলছে। বিশেষ করে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকা ও বাজারগুলোতে দলবদ্ধ কুকুরের উপদ্রবে শিশু শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক ভ্যাকসিনের সংকটের কারণে জনমনে তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আতঙ্ক।

জানা গেছে, সিলেটে প্রতিদিনই বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন মানুষ। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিক্ষার্থীরা। ভোরে মসজিদগামী মুসল্লি কিংবা সকাল-বিকেলে চলাচলকারী পথচারীরাও কুকুরের আক্রমণের মুখে পড়ছেন।

নগরবাসীর অভিযোগ, বিভিন্ন মোড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ, দোকানের বারান্দা ও পরিত্যক্ত স্থাপনায় কুকুরগুলো আশ্রয় নিচ্ছে।

অভিভাবকরা বলছেন, কুকুরের ভয়ে অনেক শিশু নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে কুকুরের অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

Advertisement

সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের পর থেকে নিষেধাজ্ঞার কারণে বেওয়ারিশ কুকুর নিধন বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া বংশবিস্তার রোধ করতে টিকা দেওয়া কিংবা চেতনানাশক দেওয়ার প্রতিও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ২০১৯ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় আনুমানিক ২ হাজার ৯০০ বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এরপর আর এ ধরণের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, দুই তিন-মাস ধরে সিলেটে সরকারিভাবে কোনো ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হচ্ছে না। শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে বর্তমানে কোনো ভ্যাকসিন নেই।

সিলেট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মিজানুর রহমান মিয়া বলেন, জেলায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ পোষা প্রাণীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে ১৫০টি বেওয়ারিশ কুকুরকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের কাছে কোনো সরকারি ভ্যাকসিন নেই। একসময় মহাখালীর লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউটে এই ভ্যাকসিন উৎপাদন এখন বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ‘ওয়ান হেলথ’ প্রজেক্টের আওতায় বিদেশ থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া ভ্যাকসিনগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, জলাতঙ্ক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি রোগ। মানুষের পাশাপাশি গরু-ছাগলও কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হচ্ছে। এই রোগের লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে মৃত্যু শতভাগ নিশ্চিত। কামড়ের স্থান যদি মস্তিষ্কের কাছাকাছি হয়, তবে এক সপ্তাহের মধ্যেই লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আবার পায়ের দিকে কামড়ালে লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক মাস বা বছরও লেগে যেতে পারে। তাই সতর্কতা ও ভ্যাকসিনেশনই এই রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায়।

আহমেদ জামিল/কেএইচকে/জেআইএম