ইলিয়াস মশহুদ
Advertisement
ইসলামি ইতিহাসের আকাশে যে কজন মহামানব ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে আছেন, আইয়ুবী সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীর সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী তাঁদের অন্যতম। তিনি একদিকে যেমন দিগ্বিজয়ী একজন বীর, তেমনি ছিলেন ইনসাফ, উদারতা এবং ধর্মীয় সহনশীলতার মূর্তপ্রতীক। যখন পুরো মুসলিম উম্মাহ অনৈক্য আর ক্রুসেডারদের চতুর্মুখী অত্যাচারে জর্জরিত ছিল, তখন তিনি আবির্ভূত হন ত্রাণকর্তা হিসেবে। দক্ষ হাতে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং দীর্ঘ ৯১ বছর পর পবিত্র মসজিদুল আকসা মুক্ত করেন।
জন্ম, বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবন৫৩২ হিজরি মোতাবেক ১১৩৭ খৃষ্টাব্দে বর্তমান ইরাকের তিকরিত দুর্গে জন্মগ্রহণ করেন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। প্রথমে তার নাম রাখা হয় ইউসুফ। কুর্দি বংশোদ্ভূত পিতা নাজমুদ্দিন ছিলেন তিকরিত দুর্গের দায়িত্বশীল। এটি বাগদাদ ও মসুলের নিকটবর্তী একটি প্রাচীন শহর। খলিফা ওমরের (রা.) শাসনামলে ষোড়শ হিজরিতে মুসলমানরা এই শহর বিজয় করেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যে দিন সালাহউদ্দিনের জন্ম হয়, সেদিনই বাগদাদের গভর্নর মুজাহিদুদ্দীন বাহরুজ নাজমুদ্দিন আইয়ুব এবং তার ভাই শিরকুহকে তিকরিত শহর ত্যাগের নির্দেশ দেন। ফলে রাতের আঁধারে তারা পরিবার নিয়ে মসুলের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। নাজমুদ্দিনের এ কাফেলায় তার সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুপুত্র সালাহউদ্দিনও ছিলেন। (মুজামুল বুলদান; কিতাবুর রাওজাতাইন)
এরপর তারা বাগদাদ থেকে মসুলে হিজরত করে সুলতান ইমাদুদ্দিন জিনকির আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। সুলতান তাদেরকে একটি বিশাল জায়গির প্রদান করেন। ইমাদুদ্দিনের মৃত্যুর পর নাজমুদ্দিন দামেশককেও তার জায়গিরের অন্তর্ভুক্ত করেন। দামেশকেই মূলত সালাহউদ্দিনের শৈশব কাটে এবং তিনি সেখানে ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি সমরবিদ্যা, শিকার ও তির-ধনুক চালনায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। (সালাহউদ্দিন, আবদুল্লাহ উলওয়ান)
Advertisement
৫৩৪ হিজরিতে নাজমুদ্দিন বা’লাবাক শহরের প্রশাসক নিযুক্ত হলে সালাহউদ্দিন শৈশবের কিছু কাল সেখানেও অতিবাহিত করেন। এরপর তিনি তার চাচা আসাদুদ্দিন শিরকুহের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে চলে আসেন। (আন-নুজুমুজ জাহিরাহ; মুফাররিজুল কুরুব; কিতাবুর রাওজাতাইন)
সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও বিনয়ী স্বভাবের। তিনি সমসাময়িক আলেমদের কাছে কোরআন, হাদিস ও ফিকহশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। বিশেষ করে ইসলামি শরিয়তের প্রতি তার অনুরাগ ছিল প্রবল। তিনি ঘোড়সওয়ারি ও সামরবিদ্যা শিখলেও তার মূল আকর্ষণ ছিল জ্ঞানচর্চায়। এই আধ্যাত্মিক ভিত্তিই তাকে পরবর্তী জীবনে একজন মহান শাসকে পরিণত করেছিল। (মাওসুয়াতুত তারিখিল ইসলামি, আহমাদ শিলবি)
রাজনৈতিক জীবন ও মিসর অভিযানআসাদুদ্দিন ছিলেন সুলতান নুরুদ্দিনের ঘনিষ্ঠ সহচর। নুরুদ্দিন আগে থেকেই সালাহউদ্দিনের প্রশাসনিক ও সামরিক প্রতিভা আঁচ করতে পেরেছিলেন। নুরুদ্দিন তাকে বিশেষ নৈকট্য দান করেন এবং যতবারই সালাহউদ্দিনের মধ্যে যোগ্যতার ছাপ দেখা যেত, ততবারই তিনি তার মর্যাদা বৃদ্ধি করতেন। নুরুদ্দিন তাকে রাষ্ট্রীয় খাজনা ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের জন্য চাচার কাছে পাঠাতেন। এই গুরুদায়িত্ব পালনের ফলে সালাহউদ্দিন নুরুদ্দিনের গোপন রহস্যের আমানতদার হিসেবে পরিচিতি পান। নুরুদ্দিনের শাসনামলে তিনি দামেশকের পুলিশ প্রধানের দায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুরূপে পালন করে শহরে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। (আন-নাওয়াদিরুস সুলতানিয়্যাহ; আল-ফিকরুস সালজুকি আল-আইয়ুবি)
তবে সালাহউদ্দিনের রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি তার চাচা আসাদুদ্দিন শিরকুহের সাথে মিসর অভিযানে যান। তখন মিসরের ফাতেমি খেলাফত অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং ক্রুসেডাররা সেখানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল। নুরুদ্দিন জিনকির আদেশে শিরকুহ মিসরে ক্রুসেডারদের হটিয়ে দেন এবং ১১৬৯ সালে মিসরের উজির হন। কিন্তু মাত্র দুই মাস পরই শিরকুহ ইন্তেকাল করলে মিসরের প্রশাসনিক দায়িত্ব তরুণ সালাহউদ্দিনের কাঁধে অর্পিত হয়। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া; সালাহউদ্দিন, আবদুল্লাহ উলওয়ান)
Advertisement
১১৭১ সালে ফাতেমি খেলাফতের শেষ খলিফা আল-আদিদ ইন্তেকাল করলে সালাহউদ্দিন মিসরে শিয়া ফাতেমি খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে আব্বাসীয় খেলাফতের নামে খুতবা পাঠ শুরু করেন। এভাবে তিনি মিসরে সুন্নি মতাদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং আইয়ুবী সালতানাতের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১১৭৫ সালে আব্বাসি খলিফা আল মুসতাজি বিল্লাহ এ সালতানাতের স্বীকৃতি দেন। (আস-সালাতিনু ফিল মাশরিকিল আরাবি)
মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠাসালাহউদ্দিন আইয়ুবী জানতেন যে, মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য না থাকলে ক্রুসেডারদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। নুরুদ্দিন জিনকির মৃত্যুর পর সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন মুসলিম আমিররা পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়েন। তখন সালাহউদ্দিন দামেশক, আলেপ্পো এবং মসুলকে তার পতাকাতলে নিয়ে আসেন। তিনি একটি শক্তিশালী কনফেডারেশন গড়ে তোলেন, যা মিসর থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। (আন নাওয়াদিরুস সুলতানিয়্যা)
হিত্তিনের যুদ্ধ: ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী বিজয়৫৮৩ হিজরির ২৫ রবিউস সানিতে হিত্তিনের ময়দানে ক্রুসেডারদের সাথে সালাহউদ্দিনের বড় একটি যুদ্ধ হয়। ক্রুসেডার সেনাপতি রেনল্ড অব চাটিলন মুসলিম হাজিদের কাফেলায় আক্রমণ এবং নবীজি (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করলে সালাহউদ্দিন শপথ করেছিলেন, তিনি নিজ হাতে তাকে হত্যা করবেন। ফলশ্রুতিতে হিত্তিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে ক্রুসেডাররা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং জেরুসাজালেমের রাজা গাই অব লুসিগনান বন্দি হন। (সালাহউদ্দিন আল-আইয়ুবি, আব্দুল্লাহ উলওয়ান)
জেরুসালেম বিজয়হিত্তিনের যুদ্ধের কয়েক মাস পর ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর সালাহউদ্দিন আইয়ুবী জেরুসালেম শহরে প্রবেশ করেন। ১০৯৯ সালে যখন ক্রুসেডাররা প্রথমবার জেরুসালেম দখল করেছিল, তখন তারা সেখানে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সালাহউদ্দিন যখন শহরটি জয় করেন, তখন তিনি কোনো প্রতিশোধ নেননি। তিনি বেসামরিক খ্রিষ্টানদের জানমালের নিরাপত্তা দেন এবং যারা শহর ত্যাগ করতে চেয়েছিল, তাদের নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। তার এই মহানুভবতা আজও বিশ্বের ইতিহাসে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। (কিতাবুর রাওজাতাইন)
ইন্তেকালসালাহউদ্দিন আইয়ুবী ছিলেন দুনিয়াবি লোভ-লালসার উর্ধ্বে থাকা একজন মানুষ। বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণ তাঁবুতে বাস করতেন। ২৭ সফর ৫৮৯ হিজরি মোতাবেক ১১৯৩ সালের ৪ মার্চ বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজের সময় দামেশকে এই মহান মুজাহিদ ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ছিল একেবারেই নগণ্য। এমনকি তার দাফনের কাফন কেনার টাকাও তার ভাণ্ডারে ছিল না। তিনি তার সব সম্পদ জনকল্যাণে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। (সালাহউদ্দিন, আব্দুল্লাহ উলওয়ান; আল-ফিকরুস সালজুকি আল-আইয়ুবি)
ওএফএফ