নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতেছে বাংলাদেশ। তবে সিরিজের প্রথম ম্যাচটা জিতেছিল কিউইরাই। যেখানে ৪ উইকেট নিয়ে অবদান রাখেন পেসার ব্লেয়ার টিকনার। ম্যাচসেরা না হলেও ক্রিকইনফোর বিচারে নিউজিল্যান্ডের জয়ে সবচেয়ে বেশি ইমপ্যাক্ট ছিল তার।
Advertisement
টিকনারের জীবনের গল্পটা অনেকটাই রূপকথার মতো। অভিষেক টেস্টের আগে রাতে সাইক্লোন ধ্বংস করে দেয় তার বাড়ি। এরপর স্ত্রী আক্রান্ত হয় ব্লাড ক্যানসারে, এর সঙ্গে একের পর এক চোট তো আছেই। তবে এগুলো সামলেছেন দক্ষ হাতে, গত নভেম্বরে ২ বছরের বেশি সময় পর ফিরেছেন নিউজিল্যান্ড দলে।
জীবনে এতকিছু দেখার পর এখন টিকনারের কাছে ক্রিকেট স্রেফ একটি খেলা, জীবন এর চেয়ে অনেক বড়। জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে নিজের ক্যারিয়ার ব্যক্তিগত গল্পসহ সবকিছু নিয়েই খোলামেলা কথা বলেছেন এই পেসার। তারই চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য।
জাগো নিউজ: এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ কেমন লাগছে?ব্লেয়ার টিকনার: হ্যাঁ, ভালোই লাগছে। এটা সত্যিই একটা দারুণ সফর। গরম অবশ্যই একটু বেশি, কিন্তু আমরা প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করেছি। সবাই আমাদের সঙ্গে দারুণ ব্যবহার করেছে, তাই এখন পর্যন্ত সবকিছু ভালোই লাগছে।
Advertisement
জাগো নিউজ: দুই বছর দলের বাইরে ছিলেন। বাংলাদেশে আসার আগে ৩ ওয়ানডে খেলেছিলেন। আর এখানে এসে প্রথম ম্যাচেই চার উইকেট পেয়েছেন। আপনার জন্য এটা কতটা সন্তোষজনক?ব্লেয়ার টিকনার: হ্যাঁ, নিউজিল্যান্ডের হয়ে আবার খেলতে পারাটা সত্যিই গর্বের। চারটা উইকেট পেয়েছি, আর টেস্ট ম্যাচেও মোটামুটি ভালোই ছিলাম। তাই আবার দলের অংশ হতে পারাটা বেশ ভালো লাগছে।
জাগো নিউজ: এই সফরে আপনার দলে কিছু খেলোয়াড় নেই। তারা থাকলে কি ফল ভিন্ন হতে পারতো বলে মনে করেন?ব্লেয়ার টিকনার: দেখুন, এটা আসলে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটে গভীরতা তৈরি করছে। সারা বিশ্বে এখন অনেক ক্রিকেট হচ্ছে। তাই এটা দেখায় যে এই মুহূর্তে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট কতটা শক্তিশালী। নতুন ভালো খেলোয়াড় উঠে আসছে। অবশ্যই ২-১ এ হারাটা একটু কঠিন ছিল, কিন্তু প্রথম ম্যাচের পর বাংলাদেশ খুব ভালো খেলেছে। তাই নতুনরা শিখছে, অভিজ্ঞরাও ভিন্ন পরিবেশে শিখছে-এটা দারুণ অভিজ্ঞতা।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশকে সবসময় সফরকারী দলের জন্য কঠিন জায়গা বলা হয়। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ছিল স্পিনের স্বর্গ। এখন মনে হচ্ছে ভিন্ন… ব্লেয়ার টিকনার: হ্যাঁ, আমার মনে হয় এখানকার উইকেটগুলো পেস বোলিংয়ের জন্যও ভালো করা যায়। এখন বাংলাদেশে ভালো পেস বোলারের একটি দল আছে, তাই এমন উইকেট তৈরি করা ভালো। এই সিরিজেও আমরা সেটা দেখেছি। এখনও কিছুটা টার্ন আছে, যেমন গতকাল ছিল, কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে উইকেটগুলো পেস বোলিংয়ের জন্যও ভালো।
জাগো নিউজ: নিউজিল্যান্ড ভারতে সিরিজ জিতেছে, কিন্তু বাংলাদেশে পারেনি। বাংলাদেশ কি ভারতের চেয়ে বেশি কঠিন প্রতিপক্ষ?ব্লেয়ার টিকনার: দুটো জায়গাই খুব কঠিন। কয়েক বছর আগে টি-টোয়েন্টি খেলতে বাংলাদেশে এসেছিলাম, তখন এটা ছিল আমার খেলা সবচেয়ে কঠিন কন্ডিশনগুলোর একটি। উপমহাদেশে যেখানেই যান, কঠিন। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ড থেকে এলে পরিবেশ একদম আলাদা, যেমন বলেছিলাম—গরমও বেশি। ঐতিহ্যগতভাবে উইকেট স্পিন করে, তাই আমাদের জন্য ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তবে শেখার জন্য দারুণ।
Advertisement
জাগো নিউজ: এখন তিন দিন খেলা নেই, বাংলাদেশেও কয়েক দিন কাটিয়েছেন। ক্রিকেটের বাইরে সময়টা উপভোগ করছেন?ব্লেয়ার টিকনার: হ্যাঁ, আমরা খুব উপভোগ করছি। কয়েকবার বাইরে গেছি। আজও একটু হাঁটতে বের হওয়ার পরিকল্পনা আছে, আশপাশটা দেখার জন্য। পরিবর্তনটা আমাদের ভালো লাগছে। এটা আমার চট্টগ্রামে প্রথম আসা, তাই জায়গাটা ভালো লাগছে। আমাদের দলের ছেলেরা একসাথে সময় কাটাচ্ছি—ভালো লাগছে।
জাগো নিউজ: আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে মানসিকভাবে নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করেন?ব্লেয়ার টিকনার: মানসিকভাবে আমি যা করি তা হলো সবকিছু ঠিকঠাক রাখা। ম্যাচের আগের দিন অনুশীলনে সব কাজ ঠিকভাবে করি, যেন মনে হয় আমি পারফর্ম করতে প্রস্তুত। এখন আমার একটু বয়স বেড়েছে, তাই আগের মতো চাপ অনুভব করি না। বরং ক্রিকেটটা আরও বেশি উপভোগ করি। ব্ল্যাক ক্যাপসে ফিরে আসার পর থেকে শুধু খেলাটা উপভোগ করার চেষ্টা করছি, আর এখন পর্যন্ত সব ভালোই যাচ্ছে।
জাগো নিউজ: আপনার জীবনের গল্প সম্পর্কে শুনেছি। গার্ডিয়ানসহ অনেক জায়গায় পড়েছি। টেস্ট অভিষেকের আগে আপনার বাড়ি সাইক্লোনে ধ্বংস হয়েছিল। দুঃখজনক। তখন আপনি কীভাবে মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন?ব্লেয়ার টিকনার: সত্যি বলতে ক্রিকেট তো শুধু একটা খেলা। তাই মাঠে নামার সময়, বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের হয়ে খেলতে নামলে, আমি শুধু খেলাটা উপভোগ করার চেষ্টা করি এবং অন্য সবকিছু পাশে সরিয়ে রাখি। কঠিন সময় আসে, কিন্তু যদি সবকিছু সহজভাবে ভাবেন, এটা শুধু একটা খেলা—শৈশবের মতো উপভোগ করার বিষয়।
জাগো নিউজ: পরে আপনার স্ত্রীও গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, তবুও আপনি খেলায় ছিলেন। এত কঠিন সময়ে মানসিক শক্তি কোথা থেকে পান?ব্লেয়ার টিকনার: হ্যাঁ, এটা আমার পুরো পরিবারের জন্যই কঠিন সময় ছিল। তবে আমরা ধাপে ধাপে এগিয়েছি-যেমন ক্রিকেটে বা জীবনে করি। এই পরিস্থিতিতেও সেভাবেই এগিয়েছি। এখন তার চিকিৎসা শেষ হয়েছে। সময়টা কঠিন ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব সময় একটা আলো থাকে। আশা করি এখন আমরা সেটা পেরিয়ে এসেছি।
জাগো নিউজ: জীবনের সেই কঠিন সময়গুলো থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী পেয়েছেন?ব্লেয়ার টিকনার: সম্ভবত সবচেয়ে বড় শিক্ষা আমার মেয়েকে ঘিরেই। তার সঙ্গে সময় কাটানো এবং তাকে দেখানো যে মনস্থির করলে যেকোনো কিছু করা যায়-এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। জাগো নিউজ: এখন আপনি আবার নিউজিল্যান্ড দলে। আপনার পরিবারের জন্য, বিশেষ করে মেয়ের জন্য এই মুহূর্ত কতটা বিশেষ?ব্লেয়ার টিকনার: দুই বছর নিউজিল্যান্ডের হয়ে না খেলার পর এটা বিশেষ। ২০১৯ থেকে ব্ল্যাক ক্যাপসে প্রথম সময়টায় অনেক ম্যাচ খেলেছিলাম, কিন্তু সবসময় ভালো করতে পারিনি। এখন মনে হয় আমার ওপর তেমন চাপ নেই। আমি খেলাটা উপভোগ করছি এবং আশা করি দলের জন্য ভালো ফল এনে দিতে পারব।
জাগো নিউজ: গতকাল আপনার একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। সেখানে বলেছিলেন, ‘ক্রিকেটের চেয়ে জীবন বড়।’ এই উপলব্ধি আপনার খেলায় কীভাবে প্রভাব ফেলেছে?ব্লেয়ার টিকনার: এখন ছোটখাটো বিষয় নিয়ে চাপ নেই। বুঝতে পারি এটা শুধু একটা খেলা, তাই শৈশবের মতো উপভোগ করতে চাই। নিউজিল্যান্ডের হয়ে প্রথম খেলতে শুরু করার সময় যে চাপ ছিল এখন তা নেই-এটাই ভালো।
জাগো নিউজ: কয়েক বছর পর যখন আপনি অবসর নেবেন, মানুষ আপনাকে কীভাবে মনে রাখুক চান?ব্লেয়ার টিকনার: হয়তো একজন ভালো মানুষ হিসেবে, ভালো একজন ক্রিকেটার হিসেবে-যে আক্রমণাত্মকভাবে খেলতো এবং ম্যাচের পর প্রতিপক্ষের সঙ্গেও কথা বলতে পারতো, জিতুক বা হারুক।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশের পেস আক্রমণকে কীভাবে দেখেন, বিশেষ করে ২৩ বছর বয়সী নাহিদ রানাকে?ব্লেয়ার টিকনার: বাংলাদেশের পেসারদের উন্নতি আমরা দেখছি। নাহিদ খুবই প্রতিভাবান একজন ফাস্ট বোলার এবং তার গতিও ধরে রাখছে। তাকে খেলতে দেখা দারুণ লাগে, মনে হয় সে অনেক দূর যাবে।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশের পেসাররা এখন পুরো ইনিংস জুড়ে ১৪০ প্লাস গতিতে বল করছে। এতে কি অবাক হয়েছেন?ব্লেয়ার টিকনার: অবাক হইনি, কারণ আমরা জানতাম। পাকিস্তান সিরিজের পর থেকেই জানতাম তাদের ভালো পেসার আছে। পার্থক্যটা মূলত বাউন্সে। নিউজিল্যান্ডে বাউন্স বেশি থাকে। এখানে বল কিছুটা স্কিড করে এবং স্লোয়ার বলের ভিন্নতা আছে। অতিরিক্ত গতি আর কম বাউন্স এটাকে কঠিন করেছে।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ প্রায় প্রতি বছর নিউজিল্যান্ড সফরে যায়। কিন্তু এখনও জিততে পারেনি। ভবিষ্যতে নাহিদ রানা খেললে কি বাংলাদেশ কিছু জিততে পারবে?ব্লেয়ার টিকনার: এখন বাংলাদেশের ভালো পেস বোলারের একটি দল আছে। তাই তারা নিউজিল্যান্ডের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবে। যেমন আমাদের বাংলাদেশে মানিয়ে নিতে হয়, তেমনি তাদেরও নিউজিল্যান্ডে মানিয়ে নিতে হবে। তবে তাদের সেই সক্ষমতা আছে।
জাগো নিউজ: গতকাল নাজমুল হোসেন সেঞ্চুরি করেছেন, লিটন দাস করেছেন ৭৬ রান। এই দুই ব্যাটারকে কীভাবে দেখেন?ব্লেয়ার টিকনার: তারা অবশ্যই ভালো ব্যাটার। বাংলাদেশের উইকেটে মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট নেওয়া কঠিন, যদি না চাপ তৈরি করা যায়। তাই এটা কঠিন। তবে এটাই আমাদের শেখার জায়গা-কীভাবে মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট নেওয়া যায়।
জাগো নিউজ: জীবনে এত কিছু অভিজ্ঞতা হওয়ার এখন আপনার কাছে জীবন আসলে কেমন?ব্লেয়ার টিকনার: জীবন ভালো। আবার ব্ল্যাক ক্যাপস দলে ফিরেছি, ভালো মানুষের সঙ্গে আছি, দারুণ একটি দেশে ক্রিকেট খেলছি। আশা করি টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিততে পারব এবং সুখে বাড়ি ফিরব।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশি খাবার খেয়েছেন? কোনটা পছন্দ?ব্লেয়ার টিকনার: হ্যাঁ, গুলাব জামুন পছন্দ করি। কিছু কারিও (ঝোল) খেয়েছি। ঐতিহ্যবাহী খাবারও খেতে ভালো লাগে-খুব ভালো খাবার পেয়েছি।
এসকেডি/এমএমআর