হজ ইসলাম ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা জীবনে অন্তত একবার পালন করার স্বপ্ন দেখেন লাখো মুসলিম নারী। কিন্তু এই পবিত্র যাত্রা শুধু আত্মিক প্রস্তুতির নয়, শারীরিক প্রস্তুতিরও বড় পরীক্ষা। দীর্ঘ ভ্রমণ, প্রচণ্ড গরম, ভিড় এবং নিয়মিত ইবাদতের চাপ সব মিলিয়ে নারীদের জন্য তৈরি হতে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি।
Advertisement
বিশেষ করে মাসিক, পানিশূন্যতা, সংক্রমণ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে সতর্কতা আরও জরুরি হয়ে ওঠে। তাই হজে যাওয়ার আগে সঠিক স্বাস্থ্যসচেতনতা ও প্রস্তুতি না থাকলে ইবাদতের এই মহান সফর কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে। এজন্য প্রয়োজন আগে থেকেই সচেতন হওয়া এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
হজে যাওয়ার আগে করণীয়হজযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। সুস্থভাবে হজ পালন নিশ্চিত করতে কিছু বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন-
প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। কোভিড-১৯ (বুস্টারসহ), ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং মেনিনজাইটিস (এ, সি, ওয়াই, ডব্লিউ-১৩৫) টিকা অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে। যেসব নারী পূর্ব থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণে আনবেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ (কমপক্ষে ৪০-৪৫ দিনের জন্য) সঙ্গে রাখবেন। গ্লুকোমিটার ও ব্লাড প্রেসার মেশিন সঙ্গে রাখা বাঞ্ছনীয়। ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে নারীদের ক্ষেত্রে হজের অন্তত দুই মাস আগে পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। এতে সুপ্ত রোগ থাকলে আগেই শনাক্ত ও চিকিৎসা সম্ভব হয়। শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিদিন ২-৩ কিলোমিটার হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পায়ের আরামদায়ক স্যান্ডেল ব্যবহার করা জরুরি, কারণ হজে দীর্ঘ সময় হাঁটতে হয়। চূড়ান্ত মেডিকেল চেকআপসরকার নির্ধারিত মেডিকেল সেন্টারে টিকা গ্রহণের সময় নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো (৩ মাসের মধ্যে সম্পন্ন) সঙ্গে রাখতে হবে-
Advertisement
এছাড়া নির্ধারিত মেডিকেল ফর্ম পূরণ করে অনুমোদিত চিকিৎসকের সইসহ জমা দিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কার্ড সংগ্রহ করতে হবে।
প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রস্তুতিহজযাত্রায় ব্যক্তিগত ওষুধের গুরুত্ব অপরিসীম। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনসহ ওষুধ বহন করা উচিত। সাধারণ কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ হতে পারে। যেমন-
জ্বর ও ব্যথার ওষুধ এলার্জির ওষুধ গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ওরস্যালাইন ভিটামিন ও মিনারেল অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিমজটিল রোগের ওষুধ সৌদি আরবে পাওয়া কঠিন এবং ব্যয়বহুল হতে পারে, তাই দেশ থেকেই সংগ্রহ করা বাঞ্ছনীয়।
যেসব ক্ষেত্রে হজে যাওয়া অনুচিতকিছু গুরুতর শারীরিক অবস্থায় হজে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যেমন-
Advertisement
এ ধরনের রোগ গোপন করে হজে যাওয়া নিজের ও অন্যদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
সৌদি আরবে অবস্থানকালে সতর্কতাসৌদি আরবের আবহাওয়া অত্যন্ত গরম ও শুষ্ক। তাই কিছু বিশেষ সতর্কতা জরুরি।
ধূলাবালি ও সংক্রমণ থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করুন। নিয়মিত পানি পান করুন এবং ডিহাইড্রেশন এড়িয়ে চলুন। গরমে শরীর শুষ্ক হয়ে গেলে ত্বকে ময়েশ্চারাইজার বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করুন। ঠান্ডা পানি ও অতিরিক্ত ঠান্ডা পরিবেশ এড়িয়ে চলুন। গলা ব্যথা হলে কুসুম গরম লবণ পানি দিয়ে গড়গড়া করুন। খালি পায়ে হাঁটা থেকে বিরত থাকুন। পায়ে ফোস্কা পড়লে দ্রুত চিকিৎসা নিন। খাবারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। ডায়াবেটিস রোগীরা মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলবেন, আর যাদের আইবিএস আছে তারা দুধজাত খাবার পরিহার করবেন। অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নিন। নারী হজযাত্রীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ গর্ভবতী নারী বা শারীরিকভাবে দুর্বল নারীদের ক্ষেত্রে হজে যাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ঋতুবতী নারীরা যদি মাসিক বন্ধের ওষুধ গ্রহণ করতে চান, তবে তা অবশ্যই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে। ভুল ওষুধ বা ডোজ শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, স্যানিটারি সামগ্রী সঙ্গে রাখা এবং নিরাপদ ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যসেবাবাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবে মক্কা, মদিনা ও জেদ্দায় মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করেছে। এসব সেন্টারে হাজীদের জন্য আউটডোর ও জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয় এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয়।
দেশে ফেরার পর করণীয়হজ শেষে দেশে ফেরার পর ১৪ দিনের মধ্যে যদি জ্বর, সর্দি, কাশি বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে আইসোলেশনে থাকা এবং দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা উচিত।
হজ একটি মহান ইবাদত, কিন্তু এটি শারীরিকভাবে পরিশ্রমসাধ্য। বিশেষ করে নারীদের জন্য সঠিক স্বাস্থ্যসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আগাম প্রস্তুতি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে সুস্থভাবে হজ পালন করা সম্ভব। সুস্থ শরীর ও সচেতন মনই পারে এই পবিত্র ইবাদতকে সফল ও পরিপূর্ণ করে তুলতে।
লেখকডা. মো. সাঈদ হোসেনকনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধানমেডিসিন বিভাগ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, মুন্সীগঞ্জজেএস/