প্রবাস

ধন্যবাদ সাংবাদিকতা এবং কিছু কথা

তখন অনলাইন পোর্টাল বা মাল্টিমিডিয়ার যুগ ছিল না। ছাপা পত্রিকার জন্য সারাদিন মাঠে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করতাম, আর সন্ধ্যায় অফিসে বসে লিখতাম দিনের সংবাদগুলো। জনপ্রিয় পত্রিকা কুমিল্লার কাগজেই আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি।ওই সময় প্রতিদিন সকালে জাতীয় পত্রিকার সাথে স্থানীয় পত্রিকা পড়েই শুরু হতো দিনের কর্মযজ্ঞ।

Advertisement

একদিন স্থানীয় এক পত্রিকার চমকপ্রদ একটি শিরোনামে চোখ আটকে গেলো। ‌‘রক্তাক্ত অবস্থায় পানক (গোখরা) সাপ উদ্ধার’।

সংবাদের ভেতরে যা ছিল, তা আরও বিস্ময়কর। সকালে এক ব্যক্তি বাড়ির সামনে হাঁটুসমান উঁচু তালগাছের চারার ওপর ফণা তুলে থাকা পানক সাপটি দেখে সাবধানে পা ফেলে চলে যান। পরে বাড়ি থেকে ডেকে এনে লোকজন জড়ো করে সাপটিকে পিটিয়ে আধামরা করা হয়। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় সাপ উদ্ধারকারীদের তালিকায় প্রায় কুড়িজনের নাম ছাপা হয় পত্রিকায়।

পরে আরেক সহকর্মীর কাছ থেকে জানলাম, সংবাদটি ছাপাতে প্রতিবেদককে অফিসে ৫০০ টাকা দিতে হয়েছিল। আর প্রকাশের পর ওই প্রতিবেদক সেই উদ্ধারকারীদের কাছ থেকে (যাদের নাম ছাপা হয়েছিল) ২০/৫০ টাকা করে সংগ্রহ করেছিলেন পত্রিকায় ছাপা হওয়া নাম দেখিয়ে।

Advertisement

১৬ বছর পেরিয়ে গেছে। বদলেছে মাধ্যম, কিন্তু বদলায়নি মানসিকতা। এখন দেখছি টাকার বিনিময়ে হত্যার খবরের ভাষা পাল্টে যায়। প্রধান আসামির শুভেচ্ছা বিজ্ঞাপনও জায়গা পায় পত্রিকার প্রথম পাতায়। যিনি সাজাপ্রাপ্ত, এখন জামিনে মুক্ত থেকে আবার অপরাধ জগতেই সক্রিয়।

এসব সাংবাদিকরা নিজেদের সৎ ও জ্ঞানী হিসেবে তুলে ধরেন। অথচ আড়ালে শেখান কীভাবে সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করতে হয়। প্রকাশ্যে বলতেও দ্বিধাবোধ করে না যে টাকা পেলে সব সম্ভব। ইঞ্জিন ছাড়া যেমন ট্রেনের বগি অচল, টাকা ছাড়া নিউজও অচল/অপ্রকাশিত থাকবে। এদের লজ্জা নেই, সংকোচও নেই।

ফেসবুকের কল্যাণে এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কেউ কেউ চাঁদাবাজিকে যেন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ভুল বানানে ভরা পোস্ট দিয়ে তারা নিউজফিড দখল করে রাখে। চাঁদাবাজি যদি শিল্প হয়, তবে তারা নিঃসন্দেহে একেকজন কুখ্যাত শিল্পী।

আরেকটা মজার বিষয় বলি। ওইসব লোকগুলো কারো কাছ থেকে যদি চাহিদামতো সুবিধা না পান, তখন ফেসবুকে লিখে অমুক ডাক্তার কিংবা তমুক ইঞ্জিনিয়ার ভালো না। তার বিরুদ্ধে অচিরেই সংবাদ প্রকাশ করব বলে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। তবে দিন যায়, মাস পেরোয় কিংবা বছর যায়, ওই রিপোর্ট আর প্রকাশ হয় না।

Advertisement

আচ্ছা, কারো বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ থাকে, তাহলে এত ঘোষণা দেওয়ার দরকার কী? তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে নিউজ করে দিলেই তো হয়। এবার আসি অন্য ঘটনায়। যেসব ইভেন্টে সম্মানী আছে, সেসব অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেলে কিংবা না পেলেও সবার আগে উপস্থিত থাকেন ওইসব গণমাধ্যমকর্মীরা।

চেয়ার টেনে বসে এমন এক ভাব ধরেন, মনে হয় উনি সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য কিছুক্ষণ আগে পুলিৎজার পুরস্কারটা ট্রাম্প মিয়ার হাত থেকে নিয়ে এসেছেন। যদিও কিছুক্ষণ পর কিংবা কখনোই তিনি এক লাইনও লিখবেন না। হয় কপি করবেন, না হয় সহকর্মীকে বলবেন তাকে যেন নিউজটা দেওয়া হয় ছবি ও ভিডিওসহ।

তবে সত্যটাও স্বীকার করতেই হবে, সব সাংবাদিক খারাপ নয়। এখনও সৎ সাংবাদিক আছেন। তারা কমিটেডও। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সমাজ তাদের কতটা মূল্যায়ন করে?

দিনশেষে আরও একটা প্রশ্ন ঘুরপাক করে মনে, জেলা সদরগুলোতে অনুষ্ঠিত কিংবা তথাকথিত ধন্যবাদ সাংবাদিকতার দাপটে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রায় হারিয়েই যাচ্ছে।

এমআরএম