বৃষ্টি থেমেছে, তবে আলো যথেষ্ট না থাকায় খেলা শুরু হয়নি। বিকেএসপির ৪ নম্বর মাঠে লড়াই চলছিল ঢাকা লিওপার্ডস ও প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাবের। পাশেই ৩ নম্বর মাঠে আবাহনী ও মোহামেডান। দুই মাঠের উইকেটই তখনও কাভার দিয়ে ঢাকা। মোহামেডানের কর্মকর্তা, খেলোয়াড় থেকে কোচরা নিজেদের মাঠ ছেড়ে চলে এসেছেন ৪ নম্বর মাঠে। সবার মুখেই তখন অপেক্ষার ছাপ, কখন ম্যাচটির ফল ঘোষণা করা হবে।
Advertisement
নিজেদের ম্যাচ ভুলে তাদের সব মনোযোগ প্রাইম ব্যাংক-লিওপার্ডস ম্যাচে। প্রাইম ব্যাংকের অধিনায়ক আকবর আলী বারবার বলছিলেন, বৃষ্টি থেমে গেছে, খেলা শুরু হোক! এই সুযোগে ৪ নম্বর মাঠে আসা মোহামেডান ক্রিকেটারদের একটু স্লেজিংও করলেন, ‘ভয় লাগছে?’
তবে শেষ পর্যন্ত আর খেলা শুরু করা যায়নি। বৃষ্টি থামার প্রায় ঘণ্টাখানেক পর কয়েক দফায় মাঠের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বৃষ্টি আইনে লিওপার্ডসকে ৯ রানে জয়ী ঘোষণা করেন আম্পায়াররা। ফল ঘোষণা হতেই উল্লাসে ফেটে পড়েন মোহামেডান ক্রিকেটার থেকে সমর্থকরা। ৪ নম্বর মাঠ থেকে প্রায় ছোটখাটো একটি বিজয় মিছিল করতেই তারা নিজেদের মাঠে ফেরেন। ততক্ষণে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের ফলও পাওয়া গেছে, বৃষ্টি আইনে ৬৩ রানে জয়ী সাদা-কালো শিবির।
কেনইবা উল্লাস করবেন না! ১৬ বছরের অপেক্ষা শেষ হওয়া তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। হ্যাঁ, ১৬ বছর পর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জিতেছে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেড। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ লিস্ট ‘এ’ স্বীকৃতি পাওয়ার পর এটাই তাদের প্রথম শিরোপা। এর আগে ২০০৯ সালের ২১ ডিসেম্বর সর্বশেষ শিরোপা জয়ের উল্লাসে মেতেছিল দলটি।
Advertisement
এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৬ বছর। বদলে গেছে প্রজন্ম, বদলেছে দল, বদলেছেন ক্রিকেটাররা। কিন্তু শিরোপার আক্ষেপটা থেকে গেছে একই রকম। প্রতি মৌসুমেই স্বপ্ন নিয়ে শুরু, শেষে হতাশা। কখনও খুব কাছে গিয়েও ধরা দেয়নি কাঙ্ক্ষিত ট্রফি। গত বছরও শিরোপার একদম কাছে গিয়েও ফিরতে হয়েছিল খালি হাতে। সেই অপেক্ষা, সেই না-পাওয়ার বেদনা আর বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা হতাশার অবসান হলো অবশেষে।
তাই শেষ বাঁশি বাজার আগেই মোহামেডানের চোখ ছিল অন্য মাঠে। আর যখন নিশ্চিত হলো শিরোপা, তখন সেটি ছিল শুধু একটি জয়ের আনন্দ নয়; ছিল ১৬ বছরের জমে থাকা আবেগের বিস্ফোরণ। ক্রিকেটারদের উল্লাস, সমর্থকদের চিৎকার, কর্মকর্তা-কোচদের স্বস্তির হাসি—সব মিলিয়ে বিকেএসপির আকাশে তখন একটাই গল্প, শিরোপা ফিরেছে মোহামেডানে।
এদিন আবাহনীর বিপক্ষে শুধু জিতলেই চলতো না মোহামেডানের। পাশাপাশি অন্য মাঠে ঢাকা লিওপার্ডসের কাছে প্রাইম ব্যাংকের হারও প্রয়োজন ছিল। এমন চাপের ম্যাচে বোলারদের বিপক্ষে রীতিমত তাণ্ডব চালান মোহামেডানের দুই ব্যাটার এনামুল হক বিজয় ও পারভেজ হোসেন ইমন।
ইমনের ইনিংসটি ছিল একক আধিপত্যের প্রতিচ্ছবি। ১১৬ বলে ১০ চার ও ১২ ছক্কায় ১৫০ রান করেন তিনি। তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১২৯.৩১। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করা এই ডানহাতি ব্যাটার প্রতিপক্ষ বোলারদের ওপর চড়াও হন, খেলেন একের পর এক দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি।
Advertisement
অন্য প্রান্তে এনামুল হক বিজয়ও কম যাননি। উইকেটের চারদিকে চোখজুড়ানো সব শট খেলে ১১৫ বলে ১১ চার ও ৯ ছক্কায় ১৪১ রান করেন তিনি। তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১২২.৬১। দুইজনের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে রানের পাহাড় গড়ে মোহামেডান।
এরপর ঝড় তোলেন আফিফ হোসেন ধ্রুব। মাত্র ৩৩ বলে ৬ চার ও ৪ ছক্কায় ৬১ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন তিনি। শেষদিকে আনিসুল ইসলাম ইমনও ১৬ বলে ৩০ রানের অপরাজিত ক্যামিও উপহার দেন। তাদের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ভর করে ৪০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করে মোহামেডান।
মোহামেডান-আবাহনীর দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাসে এর আগে কোনো দল ৪০০ রানের দেখা পায়নি। দুই দলের লড়াইয়ে সর্বোচ্চ স্কোরের আগের রেকর্ডটি ছিল আবাহনীর দখলে। বিকেএসপির একই মাঠে এক ম্যাচে লিটন দাস ও ভারতের সাবেক তারকা ক্রিকেটার দিনেশ কার্তিকের জোড়া সেঞ্চুরিতে ৩৯০ রান তুলেছিল আকাশি-নীলরা। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় নাম লেখায় মোহামেডান।
রান তাড়ায় ওপেনিংয়ে নামা অনিক সরকার করেন ৬৪ বলে ৬ চার ও ৫ ছক্কায় ৮৫ রান। তবে অন্যপ্রান্তে বাকিরা তাকে সঙ্গে দিতে পারেননি। তিনে নামা জিসান আলম ৫ ও অধিনায়ক মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন করেন ৯ রান। তাতে ৭৯ রানের ৩ উইকেট উইকেট হারায় আবাহনী। ২৪.৪ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৭৮ রান তোলার পর বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হয়। আর শুরু না করলে ডাকওয়ার্স লুইস আইনে জিতে যায় মোহামেডান।
একই সময়ে পাশের মাঠে আগে ব্যাটিং করে ২৬৬ রান করেন প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব। রান তাড়ায় ঢাকা লিওপার্ডস ২৯.১ ওভারের ৩ উইকেটে ১৪২ রান তুলেছিল। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে মোহাম্মদ মিঠুন ১৩ বলে ৭ ও সৈকত আলি ৭ বলে করেন ৫ রান। এই মাঠেও খেলা শুরু করতে না পারায় ডাকওয়ার্থ লুইস আইনে ৯ রানে জিতে যায় লিওপার্ডস।
এসকেডি/এমএমআর