ধর্ম

ইবরাহীম আলী তশনা (রহ.), মরমি কবি ও প্রখ্যাত আলেম

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যারা একাধারে আলেম, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাহিত্যসাধক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শাহ মোহাম্মদ ইবরাহীম আলী তশনা (রহ.) তাদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন না; বরং ছিলেন সমাজজাগরণের এক নিরলস কর্মী, শিক্ষা বিস্তারের একজন পথিকৃৎ, খিলাফত আন্দোলনের সাহসী সৈনিক এবং মরমি সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার জীবন ও কর্মের দিকে তাকালে দেখা যায়, জ্ঞান, কর্ম, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তার ব্যক্তিত্বে।

Advertisement

জন্ম ও পারিবারিক ঐতিহ্য

১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার বাটইশাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শাহ মোহাম্মদ ইবরাহীম আলী। তার পরিবার ছিল ধর্মীয় জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ধারক। পিতা শাহ আব্দুর রহমান কাদেরি ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম ও মুফতি। পারিবারিক সূত্রে তারা শাহজালাল (রহ.) এর সফরসঙ্গী শাহ তকী উদ্দীনের বংশধর বলে পরিচিত।

শৈশব থেকেই ইবরাহীম আলী ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তার বড় ভাই মাওলানা ইসমাঈল আলমও ছিলেন বাংলা ভাষাভাষী উর্দু কবিদের অন্যতম।

জ্ঞানার্জনের অভিযাত্রা

প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছে শেষ করে তিনি ভর্তি হন সিলেটের তৎকালীন খ্যাতিমান শিক্ষাকেন্দ্র ফুলবাড়ী আজিরিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে মৌলিক শিক্ষার স্তর অতিক্রম করে তিনি পাড়ি জমান ভারতীয় মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে।

Advertisement

দেওবন্দে তিনি দীর্ঘ নয় বছর অধ্যয়ন করেন। ফজল হক দেওবন্দি, মুহাম্মদ মুনির নানুতুবি এবং হাফেজ মুহাম্মদ আহমদের মতো প্রখ্যাত শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও ইসলামী জ্ঞানচর্চায় নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা শেষে তিনি যখন নিজ গ্রামে ফিরে আসেন, তখন তিনি শুধু একজন শিক্ষার্থী নন; বরং একজন পূর্ণাঙ্গ আলেম ও চিন্তাবিদ।

তবে তার জ্ঞানপিপাসা তখনও শেষ হয়নি। ১৯০২ সালে তিনি পুনরায় দিল্লি গমন করেন। সেখানে দুই বছর উচ্চতর হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। তার জ্ঞানার্জনের অদম্য আগ্রহ দেখে তার শিক্ষক তাকে ‘তশনা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ফারসি ভাষায় ‘তশনা’ অর্থ তৃষ্ণার্ত বা পিপাসিত। জ্ঞানের জন্য যে মানুষ সারাজীবন পিপাসার্ত থাকেন, তার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত উপাধি আর কী হতে পারে!

এরপর থেকেই তিনি ইবরাহীম আলী তশনা নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন হজরত শাহজালাল ইয়েমেনি (রহ.) শিক্ষা বিস্তারে এক নিরলস সাধক

দেশে ফিরে তিনি উপলব্ধি করেন যে মুসলিম সমাজের উন্নতির প্রধান চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। তাই তিনি নিজেকে শিক্ষাবিস্তার আন্দোলনে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন।

Advertisement

১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন উমরগঞ্জ ইমদাদুল উলুম মাদ্রাসা। এ প্রতিষ্ঠান বৃহত্তর জৈন্তা অঞ্চলের ধর্মীয় শিক্ষার নবজাগরণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এটি ছাড়াও তিনি সড়কের বাজার আহমদিয়া মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।

সে সময় এ অঞ্চলে তাজবীদের নিয়মে কোরআন শিক্ষার প্রচলন ছিল না। তশনার উদ্যোগেই বিশুদ্ধ কোরআন শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে চালু হয়। তার শিক্ষা আন্দোলন পুরো অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছিল।

ইসলামি জলসার প্রবর্তক

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯০৬ সালে ইবরাহীম আলী তশনাই সর্বপ্রথম বৃহৎ পরিসরে ইসলামি জলসার সূচনা করেন। তার আয়োজিত জলসাগুলো ছিল জনজাগরণের কেন্দ্র। হাজার হাজার মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এসে তার বক্তব্য শুনত।

তার জলসা ছিল জ্ঞানচর্চা, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের এক সম্মিলিত মঞ্চ। খুব দ্রুত এ আয়োজন সিলেট ও আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে যে ওয়াজ মাহফিল সংস্কৃতি বাংলার মুসলিম সমাজে এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তার অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ইবরাহীম আলী তশনা।

আজ বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে ওয়াজ মাহফিল ও ইসলামি জলসা একটি সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষঙ্গ।

স্বাধীনতার সংগ্রামে এক সাহসী কণ্ঠ

ইবরাহীম আলী তশনা শুধু ধর্মীয় নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন রাজনৈতিক সচেতনতারও প্রতীক।

শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দির আহ্বানে তিনি খিলাফত আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকার কারণে তাকে কারাবরণও করতে হয়।

বাংলা ও উর্দু ভাষায় তার অসাধারণ বক্তৃতা করার ক্ষমতা ছিল। ১৯২২ সালের ২৩ মার্চ কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদ্রাসার বার্ষিক জলসা উপলক্ষে একটি বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। তশনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান শুরু হলেও ব্রিটিশ প্রশাসন সভাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং ১৪৪ ধারা জারি করে।

কিন্তু জনগণের ঢল থামেনি। অবশেষে প্রশাসনের নির্দেশে পুলিশ গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই কয়েকজন শহীদ হন এবং বহু মানুষ আহত হন। এ ঘটনা সিলেটের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে আছে।

আরও পড়ুন শতাব্দী প্রাচীন বাবা আদম মসজিদের ইতিহাস মরমি কবি হিসেবে তশনা

রাজনৈতিক কর্মী, আলেম ও শিক্ষাবিদ পরিচয়ের পাশাপাশি তশনার আরেকটি উজ্জ্বল পরিচয় হলো—তিনি ছিলেন একজন মরমি কবি।

বাংলা, উর্দু ও ফারসি ভাষায় তিনি অসংখ্য গান, কাসিদা ও কবিতা রচনা করেন। তার রচনায় মানবপ্রেম, আল্লাহপ্রেম, নবীপ্রেম এবং আত্মার গভীর আকুতির সুর একাকার হয়ে গেছে।

খিলাফত আন্দোলনের পর তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে সরে এসে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হন। সেই সাধনার ফলস্বরূপ জন্ম নেয় তার অসংখ্য মরমি গান।

তিনি লিখেছেন—

“ছুটিল বসন্ত হাওয়া গোলাপ ফুটিল, ভ্রমর ব্যাকুল হইয়া উড়িল উড়িল।”

এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতেই ধরা পড়ে সৌন্দর্যের প্রতি এক আত্মিক আকর্ষণ। আবার অন্যত্র তিনি বলেন—

“উদাসী তশনায় বলে অগ্নিকুণ্ডে বসি, জ্বলন্ত আগুন্নির মধ্যে কী সন্ধানে বাস করি।”

এ যেন আত্মার গভীর অনুসন্ধান, সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের আকুতি।

তার গানে বৈষ্ণব কাব্যের ভাষা, সুফি দর্শনের গভীরতা এবং বাংলা লোকসাহিত্যের প্রাণস্পন্দন একত্রে মিলিত হয়েছে। ফলে তার রচনাগুলো শুধু ধর্মীয় সাহিত্য নয়, বাংলা সংস্কৃতিরও মূল্যবান সম্পদ।

অগ্নিকুণ্ড: নবীপ্রেমের জ্বলন্ত ভাষ্য

তশনার শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে ‘অগ্নিকুণ্ড’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি মূলত নবীপ্রেম ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির গীতিমালা।

এ গ্রন্থে প্রেম কোনো জাগতিক বিষয় নয়; বরং আত্মার পরম সত্যের অনুসন্ধান। নবীপ্রেম, আল্লাহপ্রেম ও মানবপ্রেমের যে অপূর্ব সমন্বয় এতে দেখা যায়, তা বাংলা মরমি সাহিত্যে বিরল।

সিলেটের মরমি ধারায় হাসন রাজা, আরকুম শাহ, শিতালং শাহদের মতো সাধকদের পাশে ইবরাহীম তশনার নামও সমান মর্যাদায় উচ্চারিত হয়।

আরও পড়ুন পীরদের পীর হজরত শাহ পরান (রহ.) সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান

তশনা শুধু কবিতা রচনা করেননি; তিনি তাজবিদ, শরহে কাফিয়া, শরহে উসুলুসসাশীসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। তার লেখালেখি উত্তর ভারতেও সমাদৃত হয়েছিল।

বিখ্যাত উর্দু কবি আকবর এলাহাবাদী তার কবিতার প্রশংসা করতেন। উত্তর ভারতের বিভিন্ন সাময়িকীতে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো।

তার উর্দু কবিতায় মুসলিম সমাজের অধঃপতন, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব এবং আত্মপরিচয়ের সংকটও উঠে এসেছে।

মৃত্যু

১৯৩১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, ভাদ্র মাসের শেষ শুক্রবার, নিজ বাড়িতে ইবরাহীম আলী তশনা ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৬১ বছর।

ইবরাহীম আলী তশনার জীবন আমাদের সামনে এক বিরল আদর্শ উপস্থাপন করে। তিনি দেখিয়েছেন, একজন আলেম কেবল মসজিদ বা মাদ্রাসার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নন; তিনি হতে পারেন সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতা, সাহিত্যিক এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক।

জ্ঞানের জন্য তার অদম্য তৃষ্ণা তাকে দিয়েছিল ‘তশনা’ উপাধি। কিন্তু বাস্তবে তিনি শুধু জ্ঞানের তৃষ্ণায় আর্ত ছিলেন না; তিনি ছিলেন সত্য, ন্যায়, প্রেম ও মানবকল্যাণেরও এক নিরলস অনুসন্ধানী।

সিলেটের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই মহৎ ব্যক্তিত্ব আজও ইতিহাসের পাতায়, মানুষের স্মৃতিতে এবং তার মরমি গানের সুরে বেঁচে আছেন।

ওএফএফ