• আধুনিকতায় বদলে গেছে যোগাযোগের ধরন• বেশিরভাগ চিঠিই এখন তালাক-আইনি নোটিশ সংক্রান্ত• সরকারি কাজে বেশিরভাগ ব্যবহার হয় ডাকঘর
Advertisement
এক সময় লাল রঙের একটি ডাকবাক্স ছিল শহর কিংবা গ্রামের অলিগলির পরিচিত দৃশ্য। হলুদ খামের চিঠি, ডাক পিয়নের সাইকেলের ট্রিংট্রিং শব্দ আর প্রিয়জনের হাতের লেখার অপেক্ষা ছিল জীবনের আবেগঘন অংশ। সময়ের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারে সেই চিঠির দিনগুলো এখন কেবলই ইতিহাস। মোবাইল ফোনের পর্দায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে যোগাযোগ। এক সময়ের ভালোবাসার নীরব সাক্ষী ডাকঘরগুলোও হারিয়েছে তাদের সেই ব্যস্ততা ও আবেদন।
জানা গেছে, ফেনীর বিভিন্ন উপজেলার ডাকঘরগুলোতে এখন ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। একসময়ের প্রাণবন্ত চিঠিপত্রের জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে বিবাহ বিচ্ছেদের খবর, আদালতের সমন আর ব্যাংকের পাওনা আদায়ের নোটিশের মতো আনুষ্ঠানিক ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। একই সঙ্গে বিভিন্ন পরীক্ষার খাতাও এখন ডাকঘরের মাধ্যমেই আদান-প্রদান করা হচ্ছে, যা ডাকঘরের ভূমিকার নতুন এক দিক তুলে ধরে।
ফেনীর ৬ উপজেলায় ৪৩টি ইউনিয়ন ও ৫টি পৌরসভায় ১৩টি ডাকঘরের অধীনে ৩৮টি শাখা অফিস রয়েছে। ফেনীর সোনাগাজী, দাগনভূঞা, ছাগলনাইয়া, পরশুরাম ও ফুলগাজী এই ডাকঘরগুলোর চিত্র এখন প্রায় অভিন্ন। আগে যেখানে বাবা-ছেলে, স্বামী-স্ত্রী কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকার চিঠির ছড়াছড়ি ছিল, আজ সেখানে শুধুই যান্ত্রিক আর আইনি কাগজপত্রের স্তূপ।
Advertisement
‘আমার দুই ছেলে বহু বছর ধরে প্রবাসে থাকে। চিঠির মাধ্যমেই তাদের খোঁজখবর নেওয়া হতো। দেশ থেকে চিঠি পাঠানোর পর বিদেশ থেকে ডাকবিভাগের মাধ্যমেই উত্তর আসত। মাসে অন্তত দু-একবার ডাকঘরে যেতে হতো। অথচ গত ১২ থেকে ১৫ বছর ধরে আর ডাকমুখো হইনি। এখন ভিডিওকলের মাধ্যমে প্রতিদিনই ছেলেদের সঙ্গে কথা হয়। আগে একসময় পিয়ন চেক নিয়ে বাড়িতে আসতেন। এখন আর চেক নিয়েও তাদের বাড়িতে আসতে হয় না’
সদর উপজেলা বিভাগীয় ডাকঘরের হিসাব বলছে, প্রতি মাসে গড়ে ১৫০ থেকে ১৬০টি বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিশ আসে এখানে। এছাড়া জায়গা-জমি সংক্রান্ত আদালতের চিঠি আসে ১০০টির মতো, শিল্প প্রতিষ্ঠানের চিঠি ৩০০ থেকে ৩৫০টি এবং বিভিন্ন ব্যাংকের চিঠি আসে ৪৫০ থেকে ৪৫০টি। এর বাইরে অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্মের কারণে দিনে গড়ে ৬০০টির মতো পার্সেল বিলি হয়। সঞ্চয়পত্রের লেনদেন করতে আসা গুটিকয়েক গ্রাহক ছাড়া একসময়ের জনপ্রিয় ডাকঘরগুলো এখন একেবারেই নীরব। উপ-ডাকঘরগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। সারাদিন খোলা রাখলেও গ্রাহকের দেখা মেলে না, কাজ না থাকায় পিয়নরাও নিয়মিত আসেন না।
তাঁত শিল্পে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বিদ্যুৎ বিভ্রাটকালনী-কুশিয়ারার পেটে যাচ্ছে শত বছরের জনপদআলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা ইসরাফিল পাটোয়ারী চিঠির যুগের কথা স্মরণ করে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন।
Advertisement
‘আমার এলাকায় জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কিছু চিঠি আসে। এর পাশাপাশি আসে বিবাহ বিচ্ছেদ ও ব্যাংকের নোটিশ। বিদেশ থেকে কবে সর্বশেষ চিঠি এসেছে তা ভুলে গেছি’
তিনি বলেন, আমার দুই ছেলে বহু বছর ধরে প্রবাসে থাকে। চিঠির মাধ্যমেই তাদের খোঁজখবর নেওয়া হতো। দেশ থেকে চিঠি পাঠানোর পর বিদেশ থেকে ডাকবিভাগের মাধ্যমেই উত্তর আসত। মাসে অন্তত দু-একবার ডাকঘরে যেতে হতো। অথচ গত ১২ থেকে ১৫ বছর ধরে আর ডাকমুখো হইনি। এখন ভিডিওকলের মাধ্যমে প্রতিদিনই ছেলেদের সঙ্গে কথা হয়। আগে একসময় পিয়ন চেক নিয়ে বাড়িতে আসতেন। এখন আর চেক নিয়েও তাদের বাড়িতে আসতে হয় না।
ফেনী প্রদান ডাকঘর/ ছবি: জাগো নিউজ
কবি ও সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম জানান, স্কুলজীবন থেকে লেখালেখির অভ্যাস তার। সেই সময় ডাকবিভাগের মাধ্যমেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা পাঠাতেন তিনি। বিনিময়ে ডাকযোগে আসত বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও সাহিত্য পত্রিকা। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও কুরিয়ার সার্ভিসের দাপটে সেসব এখন কেবলই স্মৃতি।
বালিগাঁওয়ের পোস্টমাস্টার জসিম উদ্দিন বলেন, সরকারি চিঠি, চাকরির চিঠি, প্রতিষ্ঠানের নোটিশ আর বিবাহ বিচ্ছেদের চিঠি ছাড়া এখন আর কিছুই আসে না। আগের সেই কর্মব্যস্ততা এখন উধাও। তবে অন্য ডাকঘরের তুলনায় এখানে ডকুমেন্টস কিছুটা বেশি আসে।
‘ডাকবিভাগের সেবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে, যেখানে অনেক কুরিয়ার সার্ভিস এখনো পৌঁছাতে পারেনি। তাছাড়া কুরিয়ারের তুলনায় ডাকবিভাগে খরচও অনেক কম। তা সত্ত্বেও মানুষ এখন কুরিয়ার সার্ভিসের দিকেই বেশি ঝুঁকছে’
সোনাগাজীর ছড়াইত কান্দির পোস্টমাস্টার জাফর উদ্দিন বলেন, আমার এলাকা জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কিছু চিঠি আসে। এর পাশাপাশি আসে বিবাহ বিচ্ছেদ ও ব্যাংকের নোটিশ। বিদেশ থেকে কবে সর্বশেষ চিঠি এসেছে তা ভুলে গেছি।
সোনাগাজী উপজেলা ডাকঘরের মাস্টার দীলিপ কুমার দাস অবশ্য কুরিয়ার সার্ভিসের চেয়ে ডাক বিভাগের সুবিধার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
রূপগঞ্জে বিদ্যুতের ‘লুকোচুরি’, উৎপাদন সংকটে ২ হাজার কলকারখানাবাঁশ-বেতের শিল্পে পাহাড়ের প্রাণ, টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম লাকি চাকমারবন্ধ চিনিকলে বাড়ছে দেনা-দুর্ভোগপরীক্ষার আগে বিদ্যুৎ সংকটে দিশাহারা এসএসসি পরীক্ষার্থীরাছাদবাগান থেকে শুরু, চাঁদপুরে এখন আঙুর চাষে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
তিনি বলেন, ডাকবিভাগের সেবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে, যেখানে অনেক কুরিয়ার সার্ভিস এখনো পৌঁছাতে পারেনি। তাছাড়া কুরিয়ারের তুলনায় ডাকবিভাগে খরচও অনেক কম। তা সত্ত্বেও মানুষ এখন কুরিয়ার সার্ভিসের দিকেই বেশি ঝুঁকছে।
‘সরকারি দপ্তরের চিঠি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে যায়। পোস্ট অফিসে মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার খানেক চিঠি ইস্যু হয়। এগুলো সরকারি কাজে এখন বেশিরভাগ ব্যবহার হচ্ছে’
তথ্য প্রযুক্তির এই প্রবল স্রোতে ডাকঘরগুলো টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে গেছে চিঠির সেই পুরোনো আবেদন। লাল রঙের ডাক বাক্সগুলো যেন আজ নীরবে দাঁড়িয়ে কেবল যান্ত্রিক আর আইনি নোটিশের ভার বহন করে চলেছে।
ফেনীর পোস্টমাস্টার মো. কামাল হোসেন জানান, সরকারি দপ্তরের চিঠি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে যায়। পোস্ট অফিসে মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার খানেক চিঠি ইস্যু হয়। এগুলো সরকারি কাজে এখন বেশিরভাগ ব্যবহার হচ্ছে।
আবদুল্লাহ আল-মামুন/এফএ/এমএস