প্রশংসামূলক কথা শুনতে বা প্রশংসা পেতে কার না ভালো লাগে। সবাই প্রশংসা পেতে চায়। প্রশংসা পেতে কত কিছুই না করা হয়। ইসলামে প্রশংসা করা অবৈধ নয়। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সম্মুখে ব্যক্তি প্রশংসা নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম।
Advertisement
এছাড়া কারো দ্বারা উপকৃত হলে তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা মুমিনের ভূষণ। তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মহানবির (সা.) সুন্নত এবং শিক্ষা। রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। অথবা যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও অকৃতজ্ঞ। (আবু দাউদ) একটি বিষয় আমাদেরকে মনে রাখতে হবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আর সম্মুখে প্রশংসা করা দুটি ভিন্ন বিষয়। মানুষের সব নেক কাজ আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য হওয়া উচিত।
আমাদের সমাজে বর্তমান বেশির ভাগ মানুষই প্রশংসা পেতে খুবই আগ্রহী। অথচ পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তুমি মনে করো না, যারা নিজেদের কৃতকর্মের উপর আনন্দিত হয় এবং না করা বিষয়ের জন্য প্রশংসা কামনা করে, তারা আমার কাছ থেকে অব্যাহতি লাভ করেছে। বস্তুত তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (সুরা আলে ইমরান : আয়াত ১৮৮) ভয়াবহ বিষয় এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহপাক আমাদেরকে ক্ষমা করুন।
মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আমাকে যে মর্যাদা দান করেছেন, তোমরা তার চেয়ে উঁচু মর্যাদা আমাকে দাও, তা আমি পছন্দ করি না।’ (মুসনাদে আহমদ)
Advertisement
আরেকটি হাদিসে এভাবে উল্লেখ রয়েছে, হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি ওমর (রা.)-কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন, আমি মহানবি (সা.)কে বলতে শুনেছি, তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন ঈসা মারইয়াম (আ.) সম্পর্কে নাসারা সম্প্রদায় (খ্রিস্টানরা) বাড়াবাড়ি করেছিল। আমি তাঁর বান্দা, তাই তোমরা বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল।’ (বুখারি)
অথচ মহানবি (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ রসুল, যাকে সৃষ্টি না করলে আল্লাহপাক এই জগৎ সৃষ্টি করতেন না আর তিনি বলছেন তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। কতই না মহান ছিলেন আমাদের প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আমরা যখন সামনাসামনি বা সম্মুখে কারো প্রশংসা করি তখন যাকে প্রশংসা করছি তার মধ্যে এক ধরনের অহমিকা সৃষ্টি হয়। এমন প্রশংসা পেতে পেতে এক সময় তার মধ্যে অহংকার চলে আসে। তাই কারো সামনাসামনি প্রশংসাকে হাদিসে ধ্বংসের কারণ আখ্যায়িত করা হয়েছে। হজরত আবু মুসা আশয়ারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে অপর ব্যক্তির প্রশংসা করতে শুনে বলেন, ‘তোমরা তাকে ধ্বংস করে দিলে বা তোমরা তার মেরুদণ্ড ভেঙে ফেললে।’ (বুখারি)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের মৃতদের ভালো কাজগুলোর আলোচনা করো এবং মন্দ কাজের আলোচনা থেকে বিরত থাকো।’ (আবু দাউদ) কেই মারা গেলে কুলখানি এবং চল্লিশা করার কোনো শিক্ষা ইসলামে নেই বরং মৃতের শোকাহত পরিবারের জন্য খাবার আয়োজন করার নির্দেশ করেছে ইসলাম। (আবু দাউদ)
Advertisement
হাদিসে চাটুকারিতাকে হত্যাতুল্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। মহানবি (সা.) বলেন, ‘তোমরা পরস্পর অতি প্রশংসা তথা তোষামোদি ও চাটুকারিতা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা তা হত্যাতুল্য।’ (ইবনে মাজাহ,)
কারো যদি প্রশংসা করতেই হয় তাহলে আমরা যা বলতে পারি এ বিষয়ে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের যদি কখনো কাউকে প্রশংসা করতেই হয় তাহলে বলবে, আমি অমুককে এইরূপ মনে করি, আল্লাহই তাকে ভালো জানেন (তার পরিপূর্ণ হিসাব সংরক্ষক), আল্লাহর উপরে আমি কাউকে ভালো বলছি না। আমি তাকে অমুক অমুক গুণের অধিকারী বলে মনে করি। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, যার প্রশংসা করা হবে সে যেন এই দোয়া পড়ে, ‘হে আল্লাহ! তারা যা বলে সেজন্য আমাকে অভিযুক্ত করো না এবং তারা যে ব্যাপারে জ্ঞাত নয় সে ব্যাপারে আমাকে ক্ষমা করো। (বুখারি ও বাইহাকি)
আমাদের প্রিয়নবি ও শ্রেষ্ঠনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কারও সামনে তার প্রশংসা করা তার পিঠে ছুরি মারা বা তার গলা কেটে ফেলার সমান।’ (আদাবুল মুফরাদ)
অপর একটি হাদিসে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কেউ তোমাদের সামনাসামনি প্রশংসা করলে তার মুখে তোমরা পাথর ছুড়ে মারো।’ (আদাবুল মুফরাদ)
উক্ত দুটি হাদিস থেকে সামনাসামনি প্রশংসার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। আল্লাহপাক আমাদেরকে এমন কাজ করা থেকে রক্ষা করুন।
হাদিসে আরো উল্লেখ রয়েছে, জনৈক সাহাবি মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অন্য এক সাহাবি সম্পর্কে উচ্চ প্রশংসায় লিপ্ত হলেন। তা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আফসোস! তুমি তো তোমার সাথির গর্দান কেটে ফেললে!’ কথাটি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন বার বললেন। অতঃপর বললেন, ‘যদি কারও প্রশংসা করতেই হয়, তবে সে যেন এভাবে বলে যে, আমি তার ব্যাপারে এমন ধারণা পোষণ করি। কারণ তার প্রকৃত হিসাব মহান আল্লাহতায়ালাই জানেন।’ (মেশকাত) তাই কারো সম্মুখে প্রশংসা করার আগে আমাদেরকে একটু ভাবা উচিত।
তবে যারা আমাদেরকে ছেড়ে আল্লাহপাকের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন তাদের ভালোগুণ নিয়ে আমরা জিকিরে খায়ের করতে পারি।
আমাদের আপনজন কেউ মারা গেলে তাদের আত্মার মাগফেরাত ও শান্তি কামনায় নিকটাত্মীয় জীবিতরা যে কাজগুলো অব্যাহত রাখতে পারেন এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবি (সা.) বর্ণনা করেছেন, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের দরজা বন্ধ হয় না। ক.) সদকায়ে জারিয়া, খ.) যদি কেউ এমন সন্তান রেখে যায়, যে সন্তান বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করবে, গ.) এমন দিনি শিক্ষা রেখে যায়, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হতে থাকে।’ (মুসলিম)
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মানুষকে কোনো ইলম শিক্ষা দেবে, সে ওই ইলম অনুযায়ী আমলকারীর সমতুল্য প্রতিদান পাবে; অথচ আমলকারীর প্রতিদানে কোনো কমতি হবে না।’ (ইবনে মাজাহ)
তবে কারও মৃত্যুর পর তার জন্য বিলাপ করে কান্না করা, মাতম করা, পকেট ছেঁড়া, গালে বা পিঠে আঘাত করা ইসলামের নিষেধ। যে ব্যক্তি এমন করে তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতের বাইরের লোক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গালে থাপ্পড় মারে, পকেট ছিঁড়ে ফেলে ও জাহেলিয়াতের রীতিনীতির প্রতি আহ্বান করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (বুখারি) আমাদের উচিত মৃত ব্যক্তির ভালো কাজকে স্মরণ ও প্রকাশ করা।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের মৃতদের ভালো কাজগুলোর আলোচনা করো এবং মন্দ কাজের আলোচনা থেকে বিরত থাকো।’ (আবু দাউদ) কেই মারা গেলে কুলখানি এবং চল্লিশা করার কোনো শিক্ষা ইসলামে নেই বরং মৃতের শোকাহত পরিবারের জন্য খাবার আয়োজন করার নির্দেশ করেছে ইসলাম। (আবু দাউদ)
আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করে চলার তৌফিক দান করুন, আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ। masumon83@yahoo.com
এইচআর/জেআইএম