জোকস

রম্যগল্প: স্বপ্নার গরমিল

এক ছিল মা, আর এক ছিল মেয়ে মেয়েটার নাম স্বপ্না। নামটা যত মিষ্টি, বাস্তবটা ততটাই একটু উল্টাপাল্টা। মানে, স্বপ্না এমন এক মেয়ে, যার জীবনে ঠিকঠাক বলে কিছু ছিল না সবকিছুই একটু এদিক-ওদিক, আর মাঝে মাঝে পুরো উল্টো পাঁচ!

Advertisement

স্বপ্নার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল অংক। অংকের খাতা খুললেই তার চোখে যেন কুয়াশা নেমে আসতো। ২+২=৫ লিখে সে এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বসে থাকতো, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার সে-ই করেছে। মা বলতেন, ‘স্বপ্না, এটা ভুল।’ স্বপ্না বলতো, ‘আম্মু একটু ঘুরায়ে দেখো, ঠিকই আছে!’

তার মা তো একেবারে হাঁফিয়ে উঠেছেন। তবে একটা জায়গায় তিনি খুবই কড়া রান্নাঘর। স্বপ্নাকে তিনি রান্নাঘরের আশেপাশেও ঘেঁষতে দেন না। কারণ? ‘এই মেয়ে কি না কি উল্টাপাল্টা করবে, আগুনে হাত দিবে, হাঁড়ি পাতিল ফেলবে না বাবা, ওর থেকে দূরেই থাকুক রান্নাঘর!’

তবে কাজ দিলে স্বপ্না চেষ্টা করে কিন্তু নিজের মতো করে। একদিন মা বললেন, ‘এই স্বপ্না, এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়।’ স্বপ্না গেলো, কিন্তু ফিরলো একটা খালি গ্লাস নিয়ে। মা বললেন, ‘পানি কই?’

Advertisement

স্বপ্না শান্ত গলায় বললো, ‘আম্মু পানিটা গ্লাসে ঢালতে গিয়ে নিচে পড়ে গেলো, তাই কষ্ট করে আর কেঁচে তুলি নাই!” ভাবলাম, গ্লাস টা অত্যন্ত তোমার কাছে নিয়ে আসি, যেন তুমি ভালো পানি ঢেলে খেতে পারো৷ হিহিহি….’

মা তখন চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তার আর কিছু বলার ভাষা ছিল না। সে তার মেয়ের কথা শুনে হাসবেন, কাঁদবেন নাকি মেয়েকে বুঝিয়ে বলবেন, নাকি বকবেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না।’

এই মেয়ের একটা জিনিস কিন্তু অসাধারণ ঘুম। বালিশে মাথা দিলেই সে সোজা ঘুমের রাজ্যে। কোনো অপেক্ষা নেই, কোনো ভাবনা নেই টুপ করে ঘুম!

একদিন তো মা দেখলেন, স্বপ্না বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মা ডাকলেন, এই! কি করছিস? স্বপ্না ঘুমের ঘোরে বললো, আমি পড়তেছি আম্মু… মা বললেন, কোথায়? স্বপ্না বললো, আমার স্বপ্নে…

Advertisement

স্বপ্নার মা প্রায়ই চিন্তায় থাকেন। রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এই মেয়েটার কি হবে? আমি না থাকলে কে দেখবে ওকে? স্বপ্নার বাবা হেসে বলেন, কিছু হবে না। এই মেয়ে কিছুই পারবে না!

এই কথাটা স্বপ্নার কানে গেলেই তার মনটা কেমন যেন চুপসে যায়। বাইরে থেকে সে হাসে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটু কষ্ট পায়। তবুও সে আশা ছাড়ে না। মনে মনে ভাবে, একদিন না একদিন আমি পারফেক্ট হবোই!

কিন্তু সেই একদিনটা কবে আসবে, সেটা কেউ জানে না স্বপ্না নিজেও না। একদিন বিকেলে, অংকের খাতা নিয়ে বসে বসেই স্বপ্না ঘুমিয়ে পড়ল। এবার সে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল।

স্বপ্নে সে একদম অন্যরকম! সে অংকে ফুল মার্কস পেয়েছে। শিক্ষক দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছেন! সে ঘর গোছাচ্ছে, সব কিছু একদম ঠিক জায়গায় রাখছে একটাও ভুল না! মা অবাক হয়ে বলছেন, এটা কি আমার মেয়ে? বাবা বলছেন, এই আমার মেয়ে! আমি জানতাম! স্বপ্না নিজেই অবাক এইটা কি আমি নাকি অন্য কেউ?

স্বপ্নের ভেতর সে এতটাই খুশি যে নিজের কাছেই নিজে গর্বিত হয়ে যায়। সে মনে মনে বলে, হ্যাঁ! আমি পেরেছি! আমি পারফেক্ট! ঠিক তখনই এই স্বপ্না! উঠ! চোখ খুলতেই সে দেখে বাস্তব। খাতা খোলা, অংক ভুল, চুল এলোমেলো, আর পাশে মা দাঁড়িয়ে।

মা বললেন, কি রে, আবার ঘুমাইছিলি? স্বপ্না একটু লজ্জা পেয়ে বলল, না… মানে… আম্মু, আমি, ইয়ে আর কি একটু…

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এই মেয়েটা কবে মানুষ হবে আল্লাহ-ই জানে…স্বপ্না চুপ করে থাকে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার সেই স্বপ্নটা এখনো ঘুরছে। সে ভাবে, একদিন সত্যিই পারবো… হয়তো একটু দেরি হবে, কিন্তু হবো।

পরের দিন সকাল। মা আবার ডাকছেন, এই স্বপ্না, বাজার থেকে ডিম নিয়ে আয়! স্বপ্না গেলো। আজ কোনো ভুল করবো না৷ আম্মু খুশি হয়ে যাবে। স্বপ্না ফিরে এলো এক ব্যাগ টমেটো নিয়ে।

মা চিৎকার করে বললেন, এইটা কি? স্বপ্না নির্দোষ মুখে বললো, ডিম পাই নাই, তাই ভাবলাম গোল গোল যেটা আছে সেটাই নিয়ে আসি! মা চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর হঠাৎ বললেন- আরে আকাইম্মার ঢেকি, তুই আর বড় হবি না!

স্বপ্না ফ্যাল ফ্যাল করে তাঁকিয়ে রইল। মুখটা এমন হয়ে গেল একদম উল্টো পাঁচের মতো! কিন্তু তার চোখের কোণে তখনো একটু হাসি লুকানো… হয়তো সে আবার কোনো স্বপ্ন দেখার প্ল্যান করছে!

প্রিয় পাঠক, আপনিও অংশ নিতে পারেন আমাদের এ আয়োজনে। আপনার মজার (রম্য) গল্পটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়। লেখা মনোনীত হলেই যে কোনো শুক্রবার প্রকাশিত হবে।

কেএসকে