বিভীষিকাময় শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। শব্দটার উৎপত্তি কোথায় খুঁজে পাবো, বুঝতে না পেরে রাত তিনটায় চলে গেলাম বারান্দায়। সেখানেই ঘটলো বিদঘুটে অলৌকিক ঘটনা। একটা মরা কাক বারান্দায় পড়ে আছে। এত বড় কাক এখানে কী করে এলো, বোঝা দায়। ভয়ের শুরুটা এখানেই।
Advertisement
নতুন বাসায় ওঠার পর থেকেই অনেক ধরনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যেগুলোর উত্তর আমার কাছে নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমি বাড়ির মালিকের সঙ্গে যতবার কথা বলতে চেয়েছি, সে এড়িয়ে গেছে। বাড়ির মালিকের চেহারাটাও কেমন যেন সুবিধার না।
এলাকায় খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আমি যে ফ্ল্যাটে উঠেছি, সেখানে আগে এক বৃদ্ধ একা থাকতেন। ছেলে-মেয়ে চারজন, দুই ছেলে দুই মেয়ে, সবাই বিদেশে। বৃদ্ধের স্ত্রী বহু বছর আগেই মারা গেছেন। মানুষটা নাকি সারাদিন একটা কাকের সঙ্গে কথা বলতেন। কাকটাও অদ্ভুত ছিল। ডেকে উঠলে দূর থেকে উড়ে এসে বৃদ্ধের কাঁধে বসতো।
আমি বাসায় ওঠার কয়েকদিন আগেই বৃদ্ধ হঠাৎ উধাও হয়ে যান। কেউ বলে, ছেলে-মেয়েরা নিয়ে গেছে। কেউ বলে, মারা গেছেন। আবার কেউ ফিসফিস করে বলে, বৃদ্ধ কোথাও যাননি।
Advertisement
সেই রাতে মরা কাকটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ খেয়াল করলাম, কাকটার একটা চোখ খোলা। চোখটা সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ভয়ে পিছিয়ে এলাম। ঠিক তখনই কাকটা নড়ে উঠল। মনে হলো, মৃত পাখিটার বুকের ভেতর একটা দীর্ঘশ্বাস জমে ছিল। ফট করে সে মাথাটা ঘুরিয়ে দিলো। আমি আর দাঁড়াইনি। দরজা বন্ধ করে বিছানায় গিয়ে বসে রইলাম।
আরও পড়ুন রহমত মিয়া ও লালুভোর হওয়ার অপেক্ষা। ফজরের আজানের পর সাহস করে আবার বারান্দায় গেলাম। কাকটা নেই। শুধু কয়েকটা কালো পালক পড়ে আছে।
সেদিন অফিস থেকে ফেরার সময় বাড়ির মালিককে আটকে ধরলাম, ‘চাচা, ওই বৃদ্ধের নাম কী ছিল?’লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘যা দেখছেন, না দেখার ভান করেন।’‘কেন?’‘ওই কাকটার অস্তিত্ব সত্যি না। খালি দেখবেন। কিছু বোঝার দরকার নাই!’আমি হেসে ফেললাম। লোকটা হাসলো না।‘বৃদ্ধের একটা অভ্যাস ছিল। রাতে কাকটাকে নিয়ে ছাদে যেতেন। কারও সঙ্গে কথা বলতেন। একদিন পাশের বাসার লোক শুনেছিল, বৃদ্ধ বলছেন, ‘তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমি মরে গেলে তুইও যাবি’।’‘তারপর?’‘কাকটা কখনো বৃদ্ধকে ছেড়ে যায়নি। মাঝেমধ্যে কাকটা বৃদ্ধের স্ত্রীর কবরের কাছে যেতো। কা কা ডাকতো। মনে হতো বৃদ্ধের পাঠানো কোনো বার্তা মৃত স্ত্রীকে দিচ্ছে।’কথাগুলো শুনে গা শিউরে উঠল। কথা আর এগোলো না!
সেই রাতেই আবার একটা শব্দ হলো। ঠক! ঠক! ঠক! বারান্দার কাঁচে কে যেন ঠোকরাচ্ছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখি, বিশাল এক কাক রেলিংয়ে বসে আছে। চাঁদের আলোয় তার চোখ দুটো লাল হয়ে জ্বলছে। সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁটে কিছু একটা। সাহস করে দরজা খুলতেই কাকটা জিনিসটা ফেলে উড়ে গেল। একটা পুরাতন চাবি।
Advertisement
পরদিন সকালে পুরো বাসা খুঁজতে খুঁজতে রান্নাঘরের দেওয়ালের একটা আলমারি চোখে পড়লো। আমি খুব ভয়ে ভয়ে চাবিটা ঢুকাতেই আলমারি খুলে গেল। ভেতরে একটা ডায়েরি। বৃদ্ধের হাতের লেখা। শেষ পাতায় লেখা—‘আমার ছেলেমেয়েরা আমার সম্পত্তির জন্য আমাকে মেরে ফেলতে চায়। সবাইকে বিশ্বাস করেছি, ভুল করেছি। শুধু কালু আমাকে ছেড়ে যায়নি। যদি আমি হারিয়ে যাই, জেনে নিও আমি স্বেচ্ছায় যাইনি। কালু তোমাকে পথ দেখাবে।’কালু! তাহলে কাকটার নাম কালু! ডায়েরির নিচে একটা ছবি। বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। কাঁধে বিশাল এক কাক। ছবির পেছনে লেখা—‘যে এই ঘরে থাকবে, সত্যিটা তার জানা দরকার।’আমার হাত কাঁপছিল। ঠিক তখনই ডায়েরির ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল। তাতে একটা ঠিকানা। বাড়ির পেছনের পরিত্যক্ত কুয়োর।
আরও পড়ুন রোদ গলা দুপুরসেদিন রাতেই কাকটা আবার এলো। এবার সে উড়ে গিয়ে কুয়োর ধারে বসল। আমি যেন সম্মোহিতের মতো তার পেছনে হাঁটতে লাগলাম। কুয়োর ভেতর টর্চের আলো ফেলতেই দেখি—একটা মানুষের একটা কঙ্কাল। হাতে একটা মরিচা ধরা আংটি। পাশে বৃদ্ধের লাঠি। আর কঙ্কালের মাথার খুলির ওপর বসে আছে কালো কাকটা। সে আমার দিকে তাকিয়ে একবার ডেকে উঠল, ‘কা...’। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, কাকটা ভয় দেখাতে আসেনি। সে এতদিন ধরে পাহারা দিচ্ছিল। বৃদ্ধের হত্যার সাক্ষী হয়ে।
পরদিন সকালে আমি এলাকার লোকজন সবাইকে জড়ো করতেই পুলিশ ডাকা হলো। তদন্ত হলো। ধীরে ধীরে বহু বছরের পুরোনো রহস্য বেরিয়ে এলো। বৃদ্ধকে সম্পত্তির লোভে হত্যা করে কুয়োয় ফেলে রাখা হয়েছিল। পুলিশ ফাইল হলো। কেস কনটিনিউ। বৃদ্ধকে হত্যার জন্য যারা দায়ী, সবাইকে একে একে তলব করলো পুলিশ।
সবকিছু ভালোভাবে শেষ হওয়ার পর একদিন ভোরে বারান্দায় গিয়ে দেখি, কালু রেলিংয়ে বসে আছে। আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। তারপর ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উড়ে গেল। আর কোনো দিন তাকে দেখা যায়নি। তবে আজও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মাঝে মাঝে মনে হয়, বারান্দার রেলিংয়ে কেউ বসে আছে। অন্ধকারে দুটি জ্বলজ্বলে চোখ। আর খুব চেনা একটা ডাক—‘কা... কা...’। কিন্তু এখন আর আমি ভয় পাই না। কারণ আমি জানি, কাক অমঙ্গলের দূত নয়। কিছু কাক শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাদের প্রিয় মানুষটার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকে।
এসইউ