হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণের (রহ.) মাজারের কারণেই মূলত সিলেট দেশের ‘আধ্যাত্মিক রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। দেশ-বিদেশ থেকে যারাই পূণ্যভূমি সিলেট ভ্রমণে আসেন, তারাই অন্তত একবারের জন্য হলেও এই দুই ওলির মাজার জিয়ারত ও দর্শন করে যান। মাজারে আসা এসব ভক্ত-আশেকানরা মনোবাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে টাকা, সোনা থেকে শুরু করে দান করেন গরু-ছাগল।
Advertisement
বছরের পর বছর ধরে চলছে এমন রীতি। কিন্তু প্রতিদিনই শত শত দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ওঠা লাখ লাখ টাকা ও দান খয়রাতের অন্যান্য জিনিসপত্র কোথায় যায়— এ নিয়ে সিলেটবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ছিলো নানা প্রশ্ন।
দীর্ঘদিনের এই ‘অস্বচ্ছতার প্রথায়’ হস্তক্ষেপ করেছেন দেশজুড়ে আলোচিত সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। এবারই প্রথম প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই মাজারের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। শুক্রবার (১২ জুন) সকালে শাহজালাল মাজার এলাকা পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক। এসময় তিনি মাজারের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন।
‘সিলেটের শাহজালাল ও শাহপরাণের মাজার শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। দেশ-বিদেশ থেকে আগত লাখো দর্শনার্থী ও ভক্ত প্রতিবছর মাজার দুটিতে আসেন। দর্শনার্থীরা মান্নত, নজর-নিয়াজ, দান-সদকা, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন ধরনের উপঢৌকন দেন’
Advertisement
সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটা প্রকল্প চলাকালে মাজারের আয়-ব্যয়ের অস্বচ্ছতার বিষয়টি সামনে আসে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে গত বুধবার এক সভায় মাজার কর্তৃপক্ষের কাছে হিসাব চাওয়া হলে কিছুই দেখাতে পারেনি দুই মাজার কর্তৃপক্ষ।
মাজার কর্তৃপক্ষের দাবি, সভার আগে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করতে পারেননি। প্রশাসনের আচরণে তারা বিস্মিত হয়েছেন বলেও জানান।
যেভাবে প্রশাসনের নজরে আসে আর্থিক অস্বচ্ছতাহযরত শাহজালালের (রহ.) মাজারে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫ কোটি টাকা দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। বাকি পাঁচ কোটি টাকা মাজার কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা দিতে গড়িমসি করেন।
শুক্রবার সকালে শাহজালাল মাজার এলাকা পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম/ছবি-জাগো নিউজ
Advertisement
এই পাঁচ কোটির মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশন তিন কোটি টাকা দিয়েছে। কিন্তু বাকি দুই কোটি টাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। এ কারণেই পরিকল্পনা কমিশন থেকে মাজারের আয়ের উৎস এবং অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চেয়ে জেলা প্রশাসনকে পত্র দেওয়া হয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে বুধবার (১০ জুন) সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সভার আয়োজন করা হয়। সভায় শাহজালাল ও শাহপরাণ মাজার দুটির পরিচালনা কমিটি, সংশ্লিষ্ট মাদরাসা ও মসজিদ কর্তৃপক্ষ, মোতাওয়াল্লি, ওয়াকফ প্রশাসন, সিলেট সিটি করপোরেশন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
‘শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার সিলেটবাসীর পরিচয়ের একটি বড় অংশ। দীর্ঘদিন ধরে এই মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা স্বচ্ছতা ছিল না। মাজারে প্রতিদিন, সপ্তাহে বা মাসে যে পরিমাণ আয় হয়, তার একটি বার্ষিক অডিট এবং পূর্ণ স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এসবের কোনো নজির নেই’
জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দরগাহের আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নথিপত্র উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘদিনের আয়ের কোনো সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য হিসাব দেখাতে পারেনি পরিচালনা কমিটি।
প্রশ্নের মুখে মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনাসিলেটের শাহজালাল ও শাহপরাণের মাজার শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। দেশ-বিদেশ থেকে আগত লাখো দর্শনার্থী ও ভক্ত প্রতিবছর মাজার দুটিতে আসেন। দর্শনার্থীরা মান্নত, নজর-নিয়াজ, দান-সদকা, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন ধরনের উপঢৌকন দেন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৭০০ বছর ধরে চলে আসা এই দানের বিপুল অর্থ কোথায় ব্যয় হয়, কীভাবে পরিচালিত হয়—সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই আয়-ব্যয় নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা ছিল।
আরও পড়ুন সিলেটে হযরত শাহজালালের (র.) ব্যবহার্য সামগ্রী সংরক্ষণের নির্দেশ ‘হাফ প্যান্ট’ পরে ঢোকা যাবে না শাহজালালের মাজারে শাহজালালের মাজারে স্লোগান দিয়ে বিতর্কের মুখে নাহিদ-সারজিসরা খান জাহান আলীর মাজারের দিঘিতে শিশুকে টেনে নিয়ে গেলো কুমির সরানো হলো খানজাহান আলীর মাজারের দিঘির কুমিরটি ৬০০ বছরে প্রথমবারের মতো কুমিরশূন্য খানজাহান আলীর মাজারের দিঘিসিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবিব আহমদ শিহাব জাগো নিউজকে বলেন, ‘শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার সিলেটবাসীর পরিচয়ের একটি বড় অংশ। দীর্ঘদিন ধরে এই মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা স্বচ্ছতা ছিল না। মাজারে প্রতিদিন, সপ্তাহে বা মাসে যে পরিমাণ আয় হয়, তার একটি বার্ষিক অডিট এবং পূর্ণ স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এসবের কোনো নজির নেই।’
তিনি বলেন, ‘মানুষজন মাজারে লাখ লাখ টাকা দান করেন। গরু-ছাগল মান্নত করেন। শরিয়ত অনুযায়ী এই দানগুলোর প্রকৃত হকদার গরিব ও এতিমরা। কিন্তু দেখা যায় বিত্তশালীরা এটি খাচ্ছেন, যা শরিয়তসম্মত নয় এবং সমাজ বিবর্জিত। তাই মাজারের হিসাব-নিকাশ পরিষ্কার হওয়া দরকার।’
‘আয়ের কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। কারণ তা প্রতি মাসে সমান হয় না। যে টাকা আয় হয়, সে টাকা দিয়ে মাজারের কারেন্ট বিল, পানির বিল এবং কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়। আমরা যে খাচ্ছি না তা নয়; আমরা খাচ্ছি, মাজারের খরচও বহন করছি। এভাবেই এতো বছর ধরে চলে আসছে’
জেলা প্রশাসকের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে হাবিব আহমদ শিহাব বলেন, ‘সচেতন মহল যদি ডিসিকে সহযোগিতা করেন, তবে তাহলে উদ্যোগ সফল হবে। কারণ সিলেটের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ এই স্বচ্ছতার পক্ষে।’
শাহজালাল মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান মাজারের দান-খয়রাতের টাকা ভোগ করার বিষযটি স্বীকার করে বলেন, ‘আয়ের কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। কারণ তা প্রতি মাসে সমান হয় না। যে টাকা আয় হয়, সে টাকা দিয়ে মাজারের কারেন্ট বিল, পানির বিল এবং কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়। আমরা যে খাচ্ছি না তা নয়; আমরা খাচ্ছি, মাজারের খরচও বহন করছি। এভাবেই এতো বছর ধরে চলে আসছে।’
তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের আমাদের কাছ থেকে আয়-ব্যয়ের কিছু নথিপত্র নিয়েছে। সেগুলো ডিসির কাছে গেছে। ডিসি সাহেবের সঙ্গে মিটিং ছিল ১১ জুন। তিনি একদিন আগে ১০ জুন মিটিং করেছেন। মিটিংয়ে তিনি বলেছেন, মাজারের আয়-ব্যয়ের কোনো সচ্ছতা বা সঠিক হিসাব নেই।’
মাজারের নথিপত্র দেখছেন জেলা প্রশাসক/ছবি-জাগো নিউজ
মোতোয়াল্লি আরও বলেন, ‘মিটিংয়ে ডিসি রাগান্বিত হয়ে অনেক কথা বলেছেন। তিনি চাইলে আমাদের বাড়িঘরও তো নিয়ে যেতে পারেন। আমরা কী করবো? আমরা তো অসহায়।’
শুক্রবার শাহজালাল মাজার পরিদর্শন করে সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, “মাজারে আসা নগদ টাকা, পশু বা অন্যান্য নজরানার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব রাখা হয় না। মাজার কর্তৃপক্ষ আয়-ব্যয়ের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। কিছু ব্যক্তি মাজারের আয় আদায় করেন এবং নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে খরচ করেন। যেহেতু এটি একটি পাবলিক ‘প্রপার্টি’, তাই এখন থেকে আয়-ব্যয়ের রেকর্ড রাখার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
সরকার থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে জানিয়ে ডিসি বলেন, ‘এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২৫ কোটি টাকা। বাকি পাঁচ কোটি টাকা মাজার কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা দিচ্ছে না। এই পাঁচ কোটির মধ্যে তিন কোটি টাকা সিটি করপোরেশন দিয়েছে। বাকি দুই কোটি টাকা না দেওয়ায় পরিকল্পনা কমিশন থেকে মাজারের আয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে।’
মাজার, মসজিদ এবং মাদরাসাকে একটি সমন্বিত ‘ইসলামিক কমপ্লেক্স’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করে সারওয়ার আলম বলেন, ‘এখানকার মাদরাসাটি যেন উচ্চমানের হয় এবং এখানকারও ছাত্ররা আমল ও এলমে জগতের সেরা হতে পারে, সেই উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
জেএএইচ/এসআর/এএসএম