আচ্ছা ভাই, মোহামেডানকে শেষ কবে চ্যাম্পিয়ন হতে দেখেছেন? গত এক সপ্তাহে দর্শক, সমর্থক, ক্রিকেটার, কোচ, সংগঠক, সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের অনেককেই এই প্রশ্ন করা হয়েছিল। বেশিরভাগেরই এক জবাব, ‘না ভাই, দেখিনি।’
Advertisement
আসলে অধিকাংশের কাছেই এ প্রশ্নের উত্তর অজানা। কারণ, মোহামেডান গত ১৬ বছরে একবারও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জিততে পারেনি।
আরও একটি বড় কারণ আছে। এখন যেমন ক্রিকইনফো বা ক্রিকবাজে ঢাকার লিগের পরিসংখ্যান সহজেই পাওয়া যায়, লিস্ট ‘এ’ মর্যাদা পাওয়ার আগের ঢাকা লিগের তথ্য সেসব ওয়েবসাইটে নেই। থাকার কথাও নয়। কারণ, মোহামেডান যখন সর্বশেষ লিগ শিরোপা জিতেছিল, তখন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ এখনও লিস্ট ‘এ’ মর্যাদা পায়নি। ফলে সেই সময়ের রেকর্ড, পরিসংখ্যান, তথ্য ও উপাত্ত খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখনো এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ আর্কাইভ গড়ে ওঠেনি, যেখানে গিয়ে বহু বছরের পুরোনো ম্যাচের তথ্য, পরিসংখ্যান ও স্কোরকার্ড সহজে পাওয়া যাবে।
Advertisement
উল্লেখ্য, ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ৫০ ওভারের প্রতিযোগিতা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ২০১৩-১৪ মৌসুমে লিস্ট ‘এ’ মর্যাদা লাভ করে। অর্থাৎ এক যুগ আগে। এর আগের মৌসুমগুলোর তথ্য জানতে হলে মূলত পুরোনো স্মৃতি, সংবাদপত্র এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
তবে অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা গেছে, মোহামেডান সর্বশেষ লিগ শিরোপা জিতেছিল ২০০৯ সালের (২০০৯-১০ মৌসুম) ২১ ডিসেম্বর। সেবার শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে খালেদ মাসুদ পাইলটের নেতৃত্বাধীন মোহামেডান ৩ উইকেটে হারিয়েছিল সাকিব আল হাসানের আবাহনীকে।
ক্রিকইনফোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ক্রিকেট লেখক মোহাম্মদ ইসামের সহযোগিতায় ১৬ বছর আগের সেই ম্যাচের স্কোরকার্ডও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
এরপর গত ১৬ বছরে অন্তত পাঁচবার রানার্সআপ হলেও একবারের জন্যও শিরোপার নাগাল পায়নি সাদা-কালোরা। অবশেষে এবার ঘুচল সেই দীর্ঘ শিরোপাখরা।
Advertisement
আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ১৬ বছর আগে যেমন আবাহনীকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মোহামেডান, এবারও ঠিক তেমনি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীকে হারিয়েই বহুল কাঙ্ক্ষিত লিগ শিরোপা পুনরুদ্ধার করল ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি।
তবে এবারের সমীকরণটা ছিল খানিকটা ভিন্ন। ১৬ বছর আগে আবাহনীকে হারালেই চ্যাম্পিয়ন হওয়া যেত। কিন্তু এবার হিসাব ছিল অনেক বেশি জটিল। শুধু আকাশি-হলুদদের হারালেই চলতো না, পাশাপাশি শিরোপা দৌড়ে থাকা প্রাইম ব্যাংককেও ঢাকা লেপার্ডসের কাছে হারতে হতো।
অদ্ভুত কাকতালীয়ভাবে সেই সমীকরণও মিলে গেছে। এবারের লিগে আবাহনী ও মোহামেডান দুই জায়ান্টকেই হারানো ঢাকা লেপার্ডস শুক্রবার শেষ ম্যাচে প্রাইম ব্যাংককেও পরাজিত করেছে। আর তাতেই খুলে গেছে মোহামেডানের শিরোপার দুয়ার।
ফলে নেট রানরেট বা হেড-টু-হেডের হিসাব নয়, সরাসরি পয়েন্ট ব্যবধানেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মোহামেডান। ১১ ম্যাচে ৯ জয় ও ২ হারে তাদের সংগ্রহ ১৮ পয়েন্ট। অন্যদিকে আবাহনী ও প্রাইম ব্যাংক, দুই দলেরই ১১ ম্যাচে ৮ জয় ও ৩ হারে ১৬ পয়েন্ট। ফলে দুই পয়েন্টের ব্যবধানে শিরোপা জিতে নেয় সাদা-কালোরা।
এবার ফিরে যাওয়া যাক ২০০৯ সালের সেই শিরোপা-নির্ধারণী আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে।
মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের লড়াইয়ে আগে ব্যাট করে আবাহনী ৯ উইকেটে ২৭৩ রান তুলেছিল।
আবাহনীর সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন পাকিস্তানের খ্যাতিমান অলরাউন্ডার আব্দুল রাজ্জাক। তিনি ৭১ বলে ৮৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত মোহামেডানের বাঁহাতি স্পিনার সাকলাইন সজিবের বলে রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে ফিরতে হয় তাকে। এছাড়া বর্তমান জাতীয় দলের নির্বাচক নাদিফ চৌধুরী ৬৭ বলে ৫৭ রানের ঝকঝকে একটি ইনিংস খেলেছিলেন।
আবাহনীর হয়ে রনি তালুকদার ৫৪ বলে ৪৬ এবং ওয়ানডাউনে নামা মাহবুবুল করিম ২৮ রান করেন। তবে অধিনায়ক সাকিব আল হাসান (১), ওপেনার ইমরুল কায়েস (১২), নাসির হোসেন (১৮) ও মোহাম্মদ রফিক (০) ব্যাট হাতে দলকে উল্লেখযোগ্য কিছু দিতে পারেননি। জবাবে শেষ ওভারের শেষ বলে রুদ্ধশ্বাস জয় তুলে নেয় মোহামেডান।
সেই জয়ের নায়ক ছিলেন অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট। তার ব্যাট থেকে আসা বাউন্ডারিতেই আসে মোহামেডানের স্মরণীয় ও নাটকীয় জয়। নাটকীয় কেন?
কারণ, শেষ বলে মোহামেডানের প্রয়োজন ছিল ৪ রান। স্ট্রাইকে ছিলেন অধিনায়ক পাইলট। বল করার আগে আবাহনী অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ফিল্ডারদের অবস্থান নতুন করে সাজিয়ে নেন। মাঠজুড়ে তখন টানটান উত্তেজনা, একটি বলই নির্ধারণ করবে পুরো মৌসুমের ভাগ্য।
এরপর থার্ড ম্যান বাউন্ডারিতে থাকা ফিল্ডারকে ৩০ গজের বৃত্তের ভেতরে এনে শর্ট থার্ড ম্যান ও গালির মাঝামাঝি একটি পজিশনে দাঁড় করানো হয়। সেই ফিল্ডার ছিলেন নাদিফ চৌধুরী। তাকে বাউন্ডারি লাইন থেকে ডেকে এনে ভেতরে দাঁড় করিয়েছিলেন আবাহনী অধিনায়ক সাকিব।
একই সঙ্গে উইকেটরক্ষকও স্পিনারদের বিপক্ষে স্বাভাবিক নিয়মে স্টাম্পের একেবারে কাছে না দাঁড়িয়ে প্রায় ১০-১২ গজ পেছনে অবস্থান নেন।
বাংলাদেশের কিংবদন্তি বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ রফিকের করা শেষ বলটি খেলতে উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে আসেন খালেদ মাসুদ পাইলট। তিনি জোরে শট খেলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বলটি ব্যাটের মাঝখানে লাগেনি। ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে বল শর্ট থার্ড ম্যান ও উইকেটরক্ষকের মাঝখান দিয়ে সীমানার বাইরে চলে যায়।
আবাহনীর শর্ট থার্ড ম্যান ফিল্ডারের তখন বলের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। আর তাতেই রুদ্ধশ্বাস এক জয় নিশ্চিত করে মোহামেডান।
ঘটনার নাটকীয়তা আরও বেড়ে যায় এই কারণে যে, আগের বলেই একটি উইকেট পড়েছিল এবং নতুন ব্যাটার ক্রিজে এসেছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা আক্রমণাত্মক ফিল্ড সাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাকিব। সে কারণেই বাউন্ডারিতে থাকা ফিল্ডারকে ওপরে তুলে আনা হয়েছিল।
কিন্তু ম্যাচ শেষ হওয়ার পর মোহামেডানের বিজয় উদযাপনের পাশাপাশি ‘হোম অব ক্রিকেট’ মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম মুখরিত হয়ে ওঠে সাকিববিরোধী স্লোগানে।
সেদিনের সেই ফিল্ডিং পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন আবাহনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাও। সমর্থকরাও কম যাননি। অনেকেই কঠোর ভাষায় সমালোচনা করার পাশাপাশি সাকিবের ক্রিকেটীয় বিচারবোধ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন।
আবাহনী শিবিরের অনেকের ধারণা ছিল, থার্ড ম্যান থেকে ফিল্ডারকে ভেতরে না আনলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারতো। তাদের মতে, সেই অবস্থানে ফিল্ডার থাকলে বলটি বাউন্ডারি হতো না; হয়তো এক বা দুই রান হতো। সেক্ষেত্রে ম্যাচটি জিতে শিরোপা ধরে রাখতে পারত আবাহনী।
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং দারুণ উত্থান-পতনে ভরা সেই ম্যাচে ২৭৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মোহামেডানের শুরুটা খুব একটা ভালো হয়নি। দলের প্রধান ব্যাটিং ভরসা মোহাম্মদ আশরাফুল ছাড়া টপ অর্ডারের অন্যরা উল্লেখযোগ্য রান করতে পারেননি। শামসুর রহমান শুভ করেন ১৭, আফতাব আহমেদ ৪ এবং মার্শাল আইয়ুব ৮ রান।
এক পর্যায়ে ৫১ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় মোহামেডান। আশরাফুল কিছুক্ষণ এক প্রান্ত আগলে রাখলেও ইনিংসের মাঝামাঝি সময়ে ৭৬ বলে ৫২ রান করে রানআউট হয়ে ফেরেন তিনি।
এরপর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও বাঁহাতি অলরাউন্ডার ফয়সাল হোসেন ডিকেন্স পঞ্চম উইকেটে ১১৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে দলকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন। রিয়াদ ৮০ বলে ৬৪ রান করে রানআউট হলে ভাঙে এই জুটি। তখন আবার কিছুটা চাপে পড়ে মোহামেডান।
ডিকেন্স অবশ্য লড়াই চালিয়ে যান। তিনি ৮৯ বলে ৭৭ রান করে আউট হওয়ার পরও ম্যাচের উত্তেজনা কমেনি। ৪৭.৪ ওভারে ২৩৮ রানে ডিকেন্স বিদায় নেওয়ার পর মোহামেডানের জয়ের জন্য ১৪ বলে প্রয়োজন ছিল ৩৬ রান।
বলপ্রতি দুইয়েরও বেশি রানের সেই কঠিন সমীকরণ মেলাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন পাকিস্তানি অলরাউন্ডার রানা নাভেদ-উল-হাসান। হার্ডহিটিংয়ের জন্য পরিচিত এই পেসার ১৭ বলে ২৯ রান করে দলকে জয়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে যান। তবে জয়ের জন্য যখন ২ বলে ৪ রান প্রয়োজন, ঠিক তখনই মোহাম্মদ রফিকের বলে আউট হয়ে যান তিনি।
ফলে শেষ বলে মোহামেডানের প্রয়োজন দাঁড়ায় ৪ রান। ক্রিজে আসেন অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট। জয়ের জন্য বাউন্ডারি ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।
রফিকের করা শেষ বলটি পাইলট সামনে খেলতে চেয়েছিলেন। তবে বল ব্যাটের মাঝখানে না লেগে বাইরের কানায় স্পর্শ করে শর্ট থার্ড ম্যানের নাগালের বাইরে দিয়ে সীমানা অতিক্রম করে। সৌভাগ্যপ্রসূত সেই বাউন্ডারিই এনে দেয় মোহামেডানের অবিস্মরণীয় জয়।
যেভাবেই আসুক, সেই চারেই ম্যাচের নায়ক বনে যান খালেদ মাসুদ পাইলট। দমবন্ধ করা স্নায়ুচাপের লড়াইয়ে ৩ উইকেটের রুদ্ধশ্বাস জয় তুলে নিয়ে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জিতে নেয় মোহামেডান। সেটিই ছিল তাদের শেষ লিগ শিরোপা।
এরপর দীর্ঘ ১৬ বছর আর প্রিমিয়ার লিগের ট্রফি ওঠেনি মোহামেডানের ঘরে। এই সময়ে অন্তত চার থেকে পাঁচবার রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে সাদা-কালোদের।
অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। প্রায় দেড় যুগ পর আবারও ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের শীর্ষ আসর প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়ন হলো মোহামেডান।
২০০৯-১০ মৌসুমের শিরোপা জয়ী মোহামেডান একাদশ:
শামসুর রহমান শুভ, মোহাম্মদ আশরাফুল, আফতাব আহমেদ, মার্শাল আইয়ুব, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, ফয়সাল হোসেন ডিকেন্স, রানা নাভেদ-উল-হাসান, খালেদ মাসুদ পাইলট (অধিনায়ক), মোহাম্মদ শাহজাদা, সাকলাইন সজিব ও নাবিল সামাদ।