ফ্যাটি লিভার বা যকৃতে চর্বি জমা হওয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বাড়তে থাকা স্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি একটি নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক মানুষ বছরের পর বছর ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত থাকলেও কোনো উপসর্গ অনুভব করেন না। ফলে রোগটি ধীরে ধীরে জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
Advertisement
বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সচেতনতা, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এই রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
ফ্যাটি লিভার কী?যখন যকৃতের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়, তখন তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। সাধারণভাবে যকৃতের ৫ শতাংশের বেশি অংশে চর্বি জমা হলে এটি ফ্যাটি লিভার হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ রোগকে অনেক ক্ষেত্রে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD) নামে অভিহিত করা হয়। এটি শুধু যকৃতের রোগ নয়, বরং ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
Advertisement
আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনই এর প্রধান কারণ। বিশেষ করে—
অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতাডায়াবেটিসউচ্চ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডশারীরিক পরিশ্রমের অভাবঅতিরিক্ত মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণকোমরের চারপাশে চর্বি বৃদ্ধিঅনিয়মিত জীবনযাপন
বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি বিশেষ বিষয় হলো, অনেকেই দেখতে খুব বেশি মোটা না হলেও তাদের শরীরে, বিশেষ করে পেটের চারপাশে, চর্বি জমে থাকে। ফলে স্বাভাবিক ওজনের মানুষও ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হতে পারেন।
উপসর্গ কী?ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অধিকাংশ রোগীর কোনো উপসর্গ থাকে না।
Advertisement
তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে—
সহজে ক্লান্ত হয়ে যাওয়াডান পাশের উপরের পেটে অস্বস্তিদুর্বলতামনোযোগ কমে যাওয়া
অনেক সময় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা আলট্রাসাউন্ড করার সময় হঠাৎ করেই রোগটি ধরা পড়ে।
রোগ নির্ণয় কীভাবে হয়?বর্তমানে ফ্যাটি লিভার নির্ণয়ের জন্য কয়েকটি সহজ পদ্ধতি রয়েছে।
রক্ত পরীক্ষা (লিভার এনজাইম)আলট্রাসাউন্ডফাইব্রোস্ক্যান (FibroScan)বিশেষ ক্ষেত্রে এমআরআই বা লিভার বায়োপসি
ফাইব্রোস্ক্যান বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যথাহীন পরীক্ষা, যা লিভারে চর্বি ও ফাইব্রোসিস বা শক্ত হয়ে যাওয়ার মাত্রা নির্ণয় করতে সাহায্য করে।
ফ্যাটি লিভার কি বিপজ্জনক?অনেকেই মনে করেন ফ্যাটি লিভার একটি সাধারণ সমস্যা। কিন্তু বাস্তবে এটি অবহেলা করলে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ফ্যাটি লিভার থেকে—লিভারে প্রদাহফাইব্রোসিসসিরোসিসলিভার ক্যানসারপর্যন্ত হতে পারে।
এছাড়া ফ্যাটি লিভার আক্রান্ত ব্যক্তিদের হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগের ঝুঁকিও বেশি থাকে।
চিকিৎসার মূল ভিত্তি কী?সুখবর হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্যাটি লিভার অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং কিছু ক্ষেত্রে উল্টে দেওয়াও সম্ভব।
চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো জীবনযাত্রার পরিবর্তন।
১. ওজন কমানো
শরীরের মোট ওজনের ৭–১০ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতে পারে।
২. নিয়মিত ব্যায়াম
সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটা, সাইকেল চালানো বা অন্য কোনো শারীরিক কার্যক্রম উপকারী।
৩. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
বেশি শাকসবজি ও ফলপরিমিত মাছ ও প্রোটিনকম চিনি ও কোমল পানীয়কম প্রক্রিয়াজাত খাবারঅতিরিক্ত ভাত ও মিষ্টি নিয়ন্ত্রণ
৪. ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ
এসব রোগ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের জন্য নতুন কিছু ওষুধ নিয়ে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়েছে। তবে সবার জন্য ওষুধ প্রয়োজন হয় না। রোগের অবস্থা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ বার্তাবাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। আমাদের খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং দ্রুত নগরায়নের কারণে এই রোগ বাড়ছে।
তাই যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ কোলেস্টেরল বা পারিবারিক ইতিহাস আছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত।
শেষ কথাফ্যাটি লিভার একটি নীরব রোগ, কিন্তু এর পরিণতি নীরব নয়। সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সময়মতো রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে আমরা এই ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবিলা করতে পারি।
বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবসে আসুন আমরা সবাই একটি প্রতিজ্ঞা করি—নিজের লিভারের যত্ন নেব, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করব এবং পরিবার ও সমাজে ফ্যাটি লিভার সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেব। সুস্থ লিভার মানেই সুস্থ জীবন।
লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক।
এইচআর/এএসএম