মতামত

বাজেটে ব্যাংক হিসাবে টিআইএন বাধ্যবাধকতা বুমেরাং হতে পারে

সম্প্রতি ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাব সচল বা নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) বা কর শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলক করার একটি প্রস্তাবনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং করের জাল বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যে আপাতদৃষ্টিতে এটিকে একটি সংস্কারমুখী পদক্ষেপ মনে হলেও, দেশের বর্তমান সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি একটি আত্মঘাতী এবং ‘বুমেরাং’ সিদ্ধান্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেখানে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো প্রথাগত ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে, সেখানে এ ধরনের কড়াকড়ি দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion) এবং ধুঁকতে থাকা ব্যাংকিং খাতের ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

Advertisement

বর্তমান ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিনডেক্স ডাটাবেজের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। বিগত এক দশকে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এবং এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কল্যাণে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক সেবার বিস্তার ঘটলেও, মূলধারার ব্যাংকিংয়ে আমানতকারীর সংখ্যা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাত খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং গ্রাহকের আস্থার ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশ। এমন একটি নাজুক পরিস্থিতিতে যেখানে সাধারণ মানুষকে ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে উৎসাহিত করা উচিত, সেখানে টিআইএন-এর মতো জটিল আইনি প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়া ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের গতিকে আরও শ্লথ করে দেবে।

কেন এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতি ও বুমেরাং হবে?

একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো তার আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। সাধারণ মানুষ যখন তার ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যাংকে রাখে, তখন ব্যাংক সেই অর্থকে বড় বড় শিল্পে বিনিয়োগ বা ঋণ হিসেবে প্রদান করে। ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তটি নিম্নলিখিত কারণে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে:

Advertisement

১. ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক সঞ্চয়কারীদের ব্যাংকিং বিমুখতা

বাংলাদেশের অধিকাংশ ব্যাংক হিসাবই সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, চাকরিজীবী, প্রান্তিক কৃষক, এবং ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশের ব্যাংক হিসাবগুলোর প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশেরই আমানতের পরিমাণ ক্ষুদ্র বা মাঝারি পরিসরের। একজন সাধারণ কৃষক বা গৃহিণী যিনি মাসে সামান্য কিছু টাকা ব্যাংকে জমিয়ে রাখছেন, তার পক্ষে টিআইএন নেওয়া এবং প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার আইনি ঝামেলার মধ্য দিয়ে যাওয়া অসম্ভব। এর ফলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যাবে এবং তাদের সঞ্চয় প্রথাগত ব্যাংকিংয়ে না এসে ঘরে অলস পড়ে থাকবে অথবা ঝুঁকিপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে যাবে।

২. অনানুষ্ঠানিক (Informal) অর্থনীতির বিস্তার ও হুন্ডি বৃদ্ধি

যখনই বৈধ পথে ব্যাংকিং সেবাকে সাধারণ মানুষের জন্য জটিল করা হয়, তখনই অনানুষ্ঠানিক বা ‘শ্যাডো ইকোনমি’ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মানুষ তখন ব্যাংকে টাকা রাখার বদলে নগদ লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা পুরোপুরি ক্যাশ-ভিত্তিক হয়ে পড়বে। এর চেয়েও বড় শঙ্কা হলো, প্রবাসী আয়ের (Remittance) ক্ষেত্রে। ব্যাংকে হিসাব রাখা বা লেনদেন জটিল হলে প্রবাসীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে অবৈধ ‘হুন্ডি’র দিকে ঝুঁকবেন। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।

৩. এজেন্ট ব্যাংকিং ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অগ্রযাত্রা ব্যাহত হওয়া

বিগত বছরগুলোতে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবায় আনার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’। লাখ লাখ গ্রামীণ মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নারীরা এর মাধ্যমে ব্যাংকিং ছাতার নিচে এসেছেন। ব্যাংক হিসাবে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের এই অভাবনীয় সাফল্য ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। গ্রামীণ নারীরা, যারা মূলত সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে হিসাব খোলেন, তারা আয়কর নথির ভয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিতে পারেন।

৪. ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট আরও তীব্র হওয়া

বর্তমানে অনেক ব্যাংকই তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ধার নিয়ে দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই অবস্থায় নতুন আমানত বা ডিপোজিট আসা কমে গেলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হবে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে গেলে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে দাঁড়াবে, যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে সরাসরি আঘাত করবে।

Advertisement

রাজস্ব বোর্ডের (NBR) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে টিআইএন ধারীর সংখ্যা ১ কোটি পার হলেও নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মানুষ। অর্থাৎ, টিআইএন থাকলেই কর আদায় বাড়ে না, যদি না কর প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সদিচ্ছা থাকে।

বিশ্বের যেসব দেশ দ্রুত ক্যাশলেস সোসাইটি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে গেছে (যেমন- ভারত বা কেনিয়া), তারা কিন্তু শুরুতেই সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বা আইনি জটিলতা চাপিয়ে দেয়নি। ভারতে ‘জন ধন যোজনা’র মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের শূন্য ব্যালেন্সের ব্যাংক হিসাব খুলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার প্রায় ৮০ শতাংশের ওপরে নেওয়া হয়েছে। সেখানে কর আদায়ের জন্য ব্যাংকিং সেবাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়নি, বরং ব্যাংকিং ডেটা ব্যবহার করে পরবর্তীতে বড় লেনদেনকারীদের করের আওতায় আনা হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কৌশলটি উল্টো হচ্ছে। কর ফাঁকি দেওয়া বড় বড় ব্যবসায়ী বা খেলাপিদের ধরতে না পেরে, সাধারণ আমানতকারীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে, যা কর আদায়ের মূল নীতির পরিপন্থী।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি বড় নীতিগত অসঙ্গতি রয়েছে। একদিকে সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে ‘ক্যাশলেস’ বা নগদহীন লেনদেনকে উৎসাহিত করছে, বাংলা কিউআর (Bangla QR) এর মতো প্রযুক্তির বিস্তার ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে, ব্যাংক হিসাবে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে মানুষকে আবার নগদ টাকা লেনদেন করার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কোনো একটি দেশের নীতিমালায় এমন বিপরীতমুখী অবস্থান অর্থনীতির জন্য কখনো ইতিবাচক ফল আনে না।

আয়কর অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত যাদের করযোগ্য আয় আছে তাদের চিহ্নিত করা, সাধারণ মানুষের মৌলিক আর্থিক অধিকার বা সঞ্চয়ের পথ রুদ্ধ করা নয়।

বিকল্প পথ ও সুপারিশমালা

রাজস্ব বাড়ানো অবশ্যই জরুরি, তবে তা ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করে বা সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিতাড়িত করে নয়। বিকল্প হিসেবে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:

• লেনদেনের সীমা নির্ধারণ: সব ব্যাংক হিসাবের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক না করে একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক লেনদেন বা আমানতের সীমা (যেমন- বছরে ৫ বা ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন) নির্ধারণ করা যেতে পারে। এই সীমার নিচে থাকা ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের টিআইএন-এর আওতামুক্ত রাখা উচিত।

• প্রযুক্তির সমন্বয়: এনবিআর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে। ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বাধ্যতামূলক। এনবিআর এনআইডি ডাটাবেজ ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড় বড় লেনদেনকারীদের চিহ্নিত করতে পারে, এর জন্য সাধারণ গ্রাহককে হয়রানি করার প্রয়োজন নেই।

• কর নেটের বিস্তার: ব্যাংকের পেছনে না ছুটে যারা বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ির মালিক বা বড় বড় বাণিজ্যিক লাইসেন্সধারী, তাদের কর জালের আওতায় আনা বেশি কার্যকর।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক হিসাবের ওপর টিআইএন-এর এই শর্তটি চাপিয়ে দেওয়া হলে তা দেশের প্রান্তিক অর্থনীতির চাকা শ্লথ করে দেবে। এটি কর আদায় বাড়ানোর পরিবর্তে সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আরও বেশি আস্থাহীন এবং বিমুখ করে তুলবে, যা বর্তমান ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের জন্য হবে এক মরণকামড়। তাই দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রেমিট্যান্সের টেকসই প্রবাহ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ধারা বজায় রাখতে এই ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা এবং এটি সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: করপোরেট ট্রেইনার, ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট, প্রফেসর অব প্র্যাকটিস, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

এইচআর/এএসএম