সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর দ্বিগুণ করা হচ্ছে- এমন আলোচনা ও বিভ্রান্তির মধ্যে কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে করহার বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব সরকার থেকে নেই। বরং প্রস্তাবিত অর্থ বিল, ২০২৬-এ আনা পরিবর্তনের ফলে স্বল্প আয়ের অনেক বিনিয়োগকারী আগের তুলনায় বেশি সুবিধা পেতে পারেন।
Advertisement
বিদ্যমান আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা ১০ শতাংশ করই চূড়ান্ত কর (ফাইনাল ট্যাক্স) দায় হিসেবে গণ্য হতো। ফলে সাধারণভাবে ওই আয়ের বিপরীতে করদাতাকে অতিরিক্ত কর দিতে হতো না।
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত অর্থ বিল, ২০২৬-এ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর আদায়ের কাঠামোয় পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন অনুযায়ী উৎসে কর চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে বিবেচিত হবে না, বরং অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য হবে। সেই সঙ্গে করহার ১০ শতাংশই বহাল রাখা হয়েছে।
এখন অর্থ বিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে ওই ১০ শতাংশ কর আর চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং এটি অগ্রিম কর (অ্যাডভান্স ট্যাক্স) হিসেবে গণ্য হবে। ফলে সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত মুনাফা করদাতার মোট করযোগ্য আয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং ব্যক্তিগত আয়কর স্ল্যাব অনুযায়ী চূড়ান্ত কর নির্ধারণ করা হবে।
Advertisement
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবেন স্বল্প আয়ের করদাতারা। যাদের মোট আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকবে অথবা যাদের কার্যকর করহার ১০ শতাংশের কম, তারা উৎসে কেটে রাখা কর সমন্বয় বা ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ফলে অনেক ছোট বিনিয়োগকারীর প্রকৃত করের বোঝা কমতে পারে।
আরও পড়ুন বড় প্রণোদনায় পুনরুজ্জীবিত হতে পারে কৃষিখাতঅন্যদিকে উচ্চ আয়ের করদাতাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। যাদের আয়কর হার ১০ শতাংশের বেশি, তাদের জন্য উৎসে কাটা ১০ শতাংশ কর কেবল অগ্রিম পরিশোধ হিসেবে গণ্য হবে। আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় প্রযোজ্য হার অনুযায়ী বাকি কর পরিশোধ করতে হবে।
কর বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সরকার করের হার বাড়াচ্ছে না, বরং সঞ্চয়পত্রের আয়কে সাধারণ আয়কর ব্যবস্থার আওতায় আনছে। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে উপকৃত হলেও উচ্চ আয়ের বিনিয়োগকারীদের কর দায় বাড়তে পারে।
আরও পড়ুন মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ নামিয়ে আনা বাস্তবসম্মত নাকি প্রতিশ্রুতি? বিভিন্ন সময়ে করহার পরিবর্তনতথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে সঞ্চয়পত্রে যে কোনো অঙ্কের বিনিয়োগে ১০ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়। পরে ২০১৯ সালে পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসে কর কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে ১০ শতাংশ করা হয়।
Advertisement
তবে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ রহিত করে ২০২৩ সালে নতুন আয়কর আইন প্রণয়ন করা হলে সেখানে সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে আবারও এককভাবে ১০ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়। এ আইনের গেজেট প্রকাশিত হয় ওই বছরের ২২ জুন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রধান কার্যালয় রাজস্ব ভবন/ফাইল ছবি
গেজেট প্রকাশের পরপরই ১০ শতাংশ উৎসে কর কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় ইনপুট না দেওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের আগ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সিস্টেমে ইনপুট দেওয়ার মাধ্যমে সবার ক্ষেত্রেই ১০ শতাংশ উৎসে কর কার্যকর করা হয়। সেই সঙ্গে এই মাসে সঞ্চয়পত্রের সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের মুনাফার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ হারে কাটা হয়।
এরপর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আবার ৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগকারীদের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর কাটা শুরু হয়। নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনের আগ পর্যন্ত এই হারে উৎসে কর কাটা হয়েছে। তবে আইনে সঞ্চয়পত্রের সব ধরনের বিনিয়োগকারীর ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশই নির্ধারণ করা রয়েছে।
সঞ্চয়পত্রের করহার বাড়ার বিষয়টি সত্য নয়। আইন অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রের উৎসে করহার বর্তমানে ১০ শতাংশ রয়েছে, আগামীতেও ১০ শতাংশই থাকবে। সুতরাং সঞ্চয়পত্রের করহার পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাব করা হয়নি।- কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া
এ পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত অর্থ বিল, ২০২৬-এ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর আদায়ের কাঠামোয় পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন অনুযায়ী উৎসে কর চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে বিবেচিত হবে না, বরং অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য হবে। সেই সঙ্গে করহার ১০ শতাংশই বহাল রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেনযোগাযোগ করা হলে কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া জাগো নিউজকে বলেন, সঞ্চয়পত্রের করহার বাড়ার বিষয়টি সত্য নয়। আইন অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রের উৎসে করহার বর্তমানে ১০ শতাংশ রয়েছে, আগামীতেও ১০ শতাংশই থাকবে। সুতরাং সঞ্চয়পত্রের করহার পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাব করা হয়নি।
আরও পড়ুন বড় বাজেটে কৃষির হিস্যা ছোটতিনি জানান, সঞ্চয়পত্রের করের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন হয়েছে তা হলো- বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা ১০ শতাংশ করই চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য হয়। অর্থ বিল, ২০২৬-এ প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ফলে এই ১০ শতাংশ কর আর চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচিত হবে না, বরং এটি অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য হবে।
এতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে- এমন প্রশ্ন করা হলে এই কর বিশেষজ্ঞ বলেন, এই পরিবর্তনের ফলে স্বল্প আয়ের করদাতারা সুবিধা পাবেন। যাদের মোট আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকবে অথবা যাদের কার্যকর করহার ১০ শতাংশের কম, তারা উৎসে কেটে রাখা কর সমন্বয় বা ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
আরও পড়ুন প্রস্তাবিত বাজেট জনকল্যাণমুখী ও ব্যবসাবান্ধব: বিজিএমইএতবে বড় বিনিয়োগকারী এবং বেশি আয়ের করদাতাদের করের পরিমাণ বাড়বে বলে জানান স্নেহাশীষ। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, যাদের প্রযোজ্য করহার ১০ শতাংশের বেশি, যেমন ১৫, ২০ বা তারও বেশি, তাদের জন্য উৎসে কাটা ১০ শতাংশ কর কেবল আংশিক পরিশোধ হিসেবে গণ্য হবে। আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় বাকি কর পরিশোধ করতে হবে।
আইনে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে করহার ১০ শতাংশ থাকলেও এনবিআরের নির্দেশে ৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বর্তমানে ৫ শতাংশ হারে কাটা হচ্ছে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে সামনে কর হার বাড়ছে, এটা বলা যায় কি না- এমন প্রশ্ন করলে স্নেহাশীষ বলেন, ‘আমি আইন অনুযায়ী কথা বলবো। আইনে তো করহারে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। আইনে যে হার নির্ধারণ করা হবে, সেটাই কার্যকর। কোনো কর্তৃপক্ষ যদি কর নাও কেটে থাকে, এই কর দেওয়ার দায়িত্ব আপনার।’
এমএএস/একিউএফ