শনিবার (১৩ জুন) দুপুর ১টা। মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতাল। ভেতরে কয়েকবার চক্কর দিয়ে প্রধান ফটক থেকে রাস্তায় নামতেই পেছন থেকে দৌড়ে এসে এক নারী জানালেন, আমাদের একজন মারা গেছেন।
Advertisement
ঘটনা বুঝতে পেছনে ফিরতেই কয়েকজন একসঙ্গে কথা বলে উঠলো। কোথায় মরছে? কে মরছে? প্রশ্ন করতেই বললেন, ইনসাফ বারাকাহ হাসপাতালে। আমাদের পাশের বেডের রোগী ছিল।
তাতে আপনাদের সমস্যা কী? আপনারা কি হাসপাতাল ছাড়তে চান না? জবাবে একাধিক নারী-পুরুষ জবাব দিলেন ‘না’। আমরা তো হাসপাতাল থেকে বের হলে নিরাপদ নই। আমাদের রোগীদের অবস্থা ভালো না। কীভাবে যাবো? যারে বের করবো, সেই তো মারা যাবে।
তাদের একজন আরতি রানি মণ্ডল। তার বোন মিতু রানি মণ্ডল কিডনি রোগী। আদ্-দ্বীনে তারা চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার ডায়ালাইসিস দেওয়া লাগে। আরতি রানির প্রশ্ন, আমরা কেন অন্য জায়গায় যেতে চাইবো বলেন?
Advertisement
অনেক রোগী রিলিজ নিচ্ছেন/জাগো নিউজ
কান্তা নামে একজন বলেন, আমার স্বামী আলী আনোয়ারের আজ ডায়ালাইসিসের শিডিউল ছিল। কিন্তু ডায়ালাইসিস নিতে পারছি না। আমি কোথায় যাবো? ডায়ালাইসিসের বিষয়টি এমন, হুট করে কোথাও গেলে সেখানে শিডিউল পাবো না।
আমরা আমাদের আইনজীবীর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করবো, শত শত রোগীর ভোগান্তি ও কষ্ট বিবেচনায় হাসপাতাল চালু রাখার সুযোগ দেওয়া হোক। কারণ, এত রোগী রেফার করা যাচ্ছে না। সরকার বা কর্তৃপক্ষ যেখানে যেখানে সংস্কার বা সংশোধনের সুপারিশ করবে, আমরা করে নেবো।-আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক (এইচআর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল
রোগীর স্বজনদের দেওয়া তথ্য মতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উত্তর গোড়ান সিপাহীবাগের বাসিন্দা কামাল মিয়ার (৫০) পূর্বনির্ধারিত ডায়ালাইসিস শিডিউল ছিল আজ। কিন্তু আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সেই সেবা বন্ধ। তাকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। মগবাজারের ইনসাফ বারাকাহ হাসপাতালে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়েছে।
Advertisement
কামাল মিয়ার স্ত্রী বলেন, আমার পেশেন্ট সকালে ডায়ালাইসিস পেলে এমন হতো না। আমার পেশেন্ট দেড় বছর ধরে ডায়ালাইসিস নিচ্ছিলেন। আজও আদ্-দ্বীনে গেছি। তারা ফেরত দিয়েছে। ছয়টা হাসপাতালে সরকার যাইতে বলছে, যাইতে যাইতে তো অকারেন্স (মৃত্যু) ঘটে গেছে। ছয় বাচ্চা মারা গেছে, সেটার জন্য আরও দুইটা বাচ্চা এতিম হয়ে গেলো।
আরও পড়ুন আদ-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রীআদ্-দ্বীন বন্ধ হওয়ায় এমন দুর্গতি অন্তত সহস্রাধিক মানুষের। ৭শ বেডের এ হাসপাতালে ভর্তির জন্য রোগীদের এমন চাপ থাকতো যে, তদবির করা লাগতো। জরুরি ও বহির্বিভাগ তো আছেই। গত ২৭ মে দিনগত রাতে ছয় শিশু মারা যাওয়ার ঘটনায় সরকার এ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন জটিল রোগাক্রান্তরা। বিশেষ করে, সার্জারি হওয়া, আইসিইউতে থাকা এবং ডায়ালাইসিস নেওয়া রোগীদের দুর্ভোগ অবর্ণনীয়
অ্যাম্বুলেন্সগুলো অলস বসে থাকতে দেখা যায়
শনিবার সকাল থেকে হাসপাতালে। আগের চেয়ে সুনসান। রোগী, স্বজন কিংবা নার্স-চিকিৎসকদের ছোটাছুটি কম। গেটে কয়েকজন সাংবাদিক দেখা যায়। দোতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত করিডোরগুলো প্রায় ফাঁকা। দু-একজনকে হাঁটাচলা করতে দেখা গেল। স্টাফ যে কজন আছেন তাদের কোনো ব্যস্ততা চোখে পড়লো না। হাসপাতালের ঊর্ধ্বতনদের কক্ষও ফাঁকা। তবে রোগী রিলিজ নেওয়ার প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে। নিচে অ্যাম্বুলেন্সগুলো অলস বসে থাকতে দেখা যায়।
সকাল থেকে কিছু কিছু রোগীকে হাসপাতাল ছাড়তে দেখা যায়। কর্তৃপক্ষ বলছে, আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে রোগীদের রেফার করছি। কিন্তু সবাই যেতে চায় না। ৭শ বেডের হাসপাতালে এখনো দুই শতাধিক রোগী আছে। তাদের অনেকের শিফট করার মতো অবস্থা নেই। অনেকে যেতে চায় না। এর মধ্যে শিফট করতে গিয়ে একজন মারা যাওয়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
আরও পড়ুন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল: ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ করতে পারবে আদ্-দ্বীনতবে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক (এইচআর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুলকে পাওয়া গেলো। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এখন তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েই কাজ করছি। আমাদের কয়েকজন কর্মীর অবহেলায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা তাদের শাস্তিও দিয়েছি।’
অ্যাম্বুলেন্সগুলো অলস বসে থাকতে দেখা যায়
মুকুল বলেন, ‘আমরা আমাদের আইনজীবীর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করবো, শত শত রোগীর ভোগান্তি ও কষ্ট বিবেচনায় হাসপাতাল চালু রাখার সুযোগ দেওয়া হোক। কারণ, এত রোগী রেফার করা যাচ্ছে না। সরকার বা কর্তৃপক্ষ যেখানে যেখানে সংস্কার বা সংশোধনের সুপারিশ করবে, আমরা করে নেবো।’
আদ্-দ্বীনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির গতকাল (১২ জুন) রাত ৮টা ৩৭ মিনিটে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে লেখেন, ‘আদ্ দ্বীন হাসপাতালের আইসিইউ, এনআইসিইউ ও ডেলিভারি রোগীদের জরুরিয়াত বিবেচনায় আগামীকাল ই-মেইলের মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আপিল দায়ের করা হবে ইনশাআল্লাহ।’
শনিবার গণমাধ্যমকে তিনি জানান, এই ই-মেইলে আপিল ছাড়া তারা কোর্টেও প্রতিকার চাইবেন।
এ নিয়ে সরকারের অবস্থান এখনো অপরিবর্তিত। শনিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার নির্বাচনি এলাকা নরসিংদীর মনোহরদীতে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘সরকারি সুবিধা পেতে এখন আর কাউকে ঘুস দিতে হয় না। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ, সবাইকে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে কিন্তু লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছি। কিন্তু জামায়াতের নেতারা আজ আদ্-দ্বীনের পক্ষে কথা বলছেন।’
আরও পড়ুন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের রোগীদের ৬ হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার নির্দেশসূত্র বলছে, সরকার কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেও বস্তুত জনস্বার্থে তাদের এ অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। হয়, আপিলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকেই বিভিন্ন শর্তে হাসপাতাল পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায় আদালতে গেলে মানবিক কারণেই আদ্-দ্বীন হাসপাতাল চালানোর সুযোগ পাবে।
তবে সরকারের সিদ্ধান্ত যাই হোক, গত দুদিন ফেসবুক দুনিয়া উত্তাল আদ্-দ্বীন ইস্যুতে। কেউ সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। কেউ আবার বলছে, এটি মাথাব্যথা হলে কেটে ফেলার শামিল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বেশ উত্তাল আদ্-দ্বীন ইস্যুতে। বিএনপিপন্থি চিকিৎসক ও বিশ্লেষক সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত তার পোস্টে লিখেছেন, একটি প্রতিষ্ঠান গড়া এবং নিয়ম-নীতি মেনে তা চালানো অত্যন্ত কঠিন কাজ হলেও সেটি বন্ধ করে দেওয়া খুব সহজ। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি অবশ্যই হওয়া উচিত, তবে তার সমাধান প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা নয়।
এটি বন্ধ না করে আইনানুগ বিচার কিংবা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া যেত এবং হাসপাতালের সমস্যা সমাধানের শর্ত দিয়ে সেটি পরিচালনার সুযোগ দেওয়া যেত বলে মনে করেন তিনি।
রুহুল আমিন সাদী লেখেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল মূলত আকিজ গ্রুপের একটি অলাভজনক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৮০ সাল থেকে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষকে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। এটি বন্ধ হলে আকিজ গ্রুপের ভর্তুকির বোঝা কমবে কিন্তু চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষ।
‘হাসপাতালে কিছু কর্মীর গাফিলতিতে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় কর্তৃপক্ষ দোষীদের শাস্তি, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে এবং পরিবারগুলোও তা গ্রহণে রাজি। এ পরিস্থিতিতে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। তবে হাসপাতালটির মানবিক ও জনকল্যাণমূলক সেবা কার্যক্রম বন্ধ করা বা লাইসেন্স বাতিল করা কোনোভাবেই ঠিক হবে না।’ লেখেন রুহুল আমিন সাদী।
আদ্-দ্বীন ইস্যুতে সাংবাদিক স্বপ্না চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘যে ভবনে ঢুকলে সুস্থ মানুষের সাফোকেশন লাগে সেই ভবনটি এখন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হবে সরকারের কাছে এই প্রত্যাশা।’
আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিলকে সমর্থন জানিয়ে মেহেদী আজাদ মাসুম লেখেন, এমন হাসপাতালগুলোর দৌরাত্ম্য কমবে।
এসইউজে/এএসএ