মতামত

সুখের দাম কত?

একজন রিকশাচালক সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, যানজটের শহরে মানুষ টেনে বাড়ি ফেরেন। হাতে হয়তো এক হাজার টাকারও কম আয়। রাতে ঘরে ফিরে ছোট্ট সন্তানটি দৌড়ে এসে তাঁর গলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। মানুষটি হাসেন। সেই হাসির মূল্য কত?

Advertisement

অন্যদিকে, বহুতল ভবনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে থাকা একজন উচ্চ আয়ের পেশাজীবী রাত গভীর পর্যন্ত কাজ করেন। ব্যাংক হিসাবে টাকা আছে, গাড়ি আছে, ফ্ল্যাট আছে, বিদেশ ভ্রমণের ছবিও আছে। কিন্তু ঘুম নেই, প্রশান্তি নেই, সম্পর্কের উষ্ণতা নেই। তাঁর অসুখের নাম উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা কিংবা অবসাদ। প্রশ্ন জাগে—তাহলে সুখের দাম কত?

মানবসভ্যতার ইতিহাসে মানুষের সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি সম্ভবত এটি। অর্থনীতি, দর্শন, ধর্ম, সাহিত্য ও মনোবিজ্ঞান—সবাই নিজস্ব ভাষায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে। কিন্তু আজকের ভোগবাদী ও প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে প্রশ্নটি যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সম্পদ অর্জন করছে, কিন্তু সুখী হওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছে না।

বিশ্বের প্রাচীন দার্শনিকরা সুখকে দেখেছেন মানুষের অন্তর্গত অর্জন হিসেবে। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, সুখ কোনো ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি নয়; এটি একটি অর্থবহ ও গুণসম্পন্ন জীবনের ফল। বৌদ্ধ দর্শনে সুখের উৎস বলা হয়েছে আকাঙ্ক্ষার নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক প্রশান্তিকে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “সুখকে ধরিতে গেলে সে ধরা দেয় না, তাকে অনুভব করিতে হয়।”

Advertisement

কিন্তু আধুনিক সমাজ সুখকে ক্রমশ একটি ভোগ্যপণ্যে পরিণত করেছে। বিজ্ঞাপন আমাদের প্রতিনিয়ত বোঝায়—নতুন ফোন কিনলে সুখ আসবে, বড় গাড়ি কিনলে সুখ আসবে, আরও বড় বাড়ি হলে সুখ আসবে। ফলে আমরা সুখকে একটি গন্তব্য মনে করি, যেখানে পৌঁছাতে হলে আরও কিছু অর্জন করতে হবে। অথচ সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর পরও দেখা যায়, সুখ আবার কয়েক কদম সামনে সরে গেছে।

মনোবিজ্ঞানে এ ঘটনাকে বলা হয় হেডোনিক ট্রেডমিল। অর্থাৎ মানুষ নতুন কোনো অর্জন বা সুবিধা পেলে সাময়িক আনন্দ অনুভব করে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেটিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। তারপর আবার নতুন কিছু চায়। ফলে দৌড় চলতেই থাকে, কিন্তু স্থায়ী সুখ ধরা দেয় না।

অর্থনীতির সঙ্গে সুখের সম্পর্ক অবশ্যই আছে। দারিদ্র্য কখনো সুখের পূর্বশর্ত নয়। ক্ষুধার্ত মানুষ, চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষ বা অনিশ্চিত জীবনে বসবাসকারী মানুষকে সুখের দার্শনিক পাঠ শোনানো নিষ্ঠুরতা। মৌলিক চাহিদা পূরণ, নিরাপদ বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সম্মানজনক আয়—এসব মানুষের সুখের ভিত্তি নির্মাণ করে।

আধুনিক সমাজ সুখকে ক্রমশ একটি ভোগ্যপণ্যে পরিণত করেছে। বিজ্ঞাপন আমাদের প্রতিনিয়ত বোঝায়—নতুন ফোন কিনলে সুখ আসবে, বড় গাড়ি কিনলে সুখ আসবে, আরও বড় বাড়ি হলে সুখ আসবে। ফলে আমরা সুখকে একটি গন্তব্য মনে করি, যেখানে পৌঁছাতে হলে আরও কিছু অর্জন করতে হবে। অথচ সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর পরও দেখা যায়, সুখ আবার কয়েক কদম সামনে সরে গেছে।

Advertisement

অর্থনীতিবিদ রিচার্ড ইস্টারলিনের গবেষণায় দেখা গেছে, আয় একটি নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত মানুষের সুখ বাড়ায়। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করার পর অতিরিক্ত আয় সুখকে খুব বেশি বাড়াতে পারে না। অর্থাৎ অর্থ প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রশংসনীয়। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, অবকাঠামো উন্নত হয়েছে, জীবনযাত্রার মানও অনেক ক্ষেত্রে উন্নত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে মানসিক চাপ, নগর নিঃসঙ্গতা, পারিবারিক দূরত্ব এবং উদ্বেগ।

ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন লক্ষ মানুষ ছুটছে। কেউ অফিসে, কেউ ব্যবসায়, কেউ কোচিংয়ে, কেউ অতিরিক্ত আয়ের সন্ধানে। কিন্তু এই ছুটে চলার শেষ কোথায়? আমরা কি সুখের দিকে ছুটছি, নাকি শুধু আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠছি?

আজকের সমাজে সুখের একটি বড় সংকট হলো তুলনার সংস্কৃতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা অন্যের জীবনের সেরা মুহূর্তগুলো দেখি এবং নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করি। অন্যের বিদেশ ভ্রমণ, নতুন গাড়ি, নতুন বাড়ি কিংবা সাফল্যের ছবি দেখে মনে হয়, আমরা পিছিয়ে আছি। অথচ সেই ছবির আড়ালে থাকা উদ্বেগ, ব্যর্থতা কিংবা একাকীত্ব আমাদের চোখে পড়ে না।

ফলে মানুষ ক্রমশ এমন একটি প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ছে, যার কোনো শেষ নেই।

বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন প্রতিবছর আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশগুলোর তালিকায় নিয়মিতভাবে স্থান পায় ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড ও নরওয়ে। এসব দেশের সাফল্যের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়; বরং সামাজিক আস্থা, শক্তিশালী পরিবারব্যবস্থা, মানসম্মত জনসেবা, কাজ ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা বড় ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ সুখের বাজারমূল্য নেই, কিন্তু সামাজিক মূল্য আছে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের দিকে তাকালেও আমরা সুখের অন্য এক চিত্র দেখতে পাই। অনেক পরিবার হয়তো আর্থিকভাবে খুব সমৃদ্ধ নয়, কিন্তু পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক বন্ধন ও আত্মীয়তার কারণে তারা মানসিকভাবে শক্তিশালী। আবার শহরে বহু মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হয়েও নিঃসঙ্গতার বোঝা বহন করেন।

তাহলে কি সুখের প্রকৃত মুদ্রা অর্থ নয়?

আংশিকভাবে তাই। গবেষণাগুলো বলছে, দীর্ঘমেয়াদি সুখের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে সুস্থ সম্পর্ক, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, অর্থপূর্ণ কাজ, সামাজিক সংযোগ, কৃতজ্ঞতা এবং জীবনের উদ্দেশ্যবোধ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডিগ্রি, একটি পদোন্নতি কিংবা একটি নতুন গাড়ি আনন্দ দিতে পারে; কিন্তু মায়ের সঙ্গে এক কাপ চা, বন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ, সন্তানের হাসি কিংবা প্রিয় মানুষের উপস্থিতি যে গভীর তৃপ্তি দেয়, তার কোনো বাজারদর নেই।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে সাফল্য শেখায়, কিন্তু সুখ শেখায় না। আমরা শিশুদের প্রতিযোগিতা শেখাই, কিন্তু মানসিক স্থিতি শেখাই না। আমরা কর্মজীবনের প্রস্তুতি দিই, কিন্তু জীবনযাপনের প্রস্তুতি দিই না। ফলে অনেক মানুষ পেশাগতভাবে সফল হলেও ব্যক্তিগতভাবে ক্লান্ত ও অসুখী হয়ে পড়েন।

সুখের প্রশ্নটি তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি সামাজিক ও নীতিগত প্রশ্নও। একটি রাষ্ট্র যদি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে লক্ষ্য করে, কিন্তু মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ, অবসর এবং সাংস্কৃতিক জীবনের দিকে নজর না দেয়, তাহলে উন্নয়নের ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।

আমাদের শহরগুলোকে আরও বাসযোগ্য করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারে একসঙ্গে সময় কাটানোর সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনদক্ষতা শিক্ষা গুরুত্ব পেতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৃত্রিম প্রতিযোগিতার বাইরে বাস্তব সম্পর্ককে মূল্য দিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, সুখকে ভোগের ফল নয়, জীবনের গুণমান হিসেবে দেখতে শিখতে হবে। কারণ সুখের দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না। যদি তা যেত, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষেরাই সবচেয়ে সুখী হতেন। বাস্তবতা কিন্তু তা বলে না।

সুখের দাম হয়তো একটি বিকেলের অবসর, যখন পরিবার একসঙ্গে বসে। সুখের দাম হয়তো একটি ফোনকল, যা অনেক দিন পর কোনো পুরোনো বন্ধুকে করা হয়। সুখের দাম হয়তো অসুস্থ বাবার পাশে কয়েক ঘণ্টা বসে থাকা। সুখের দাম হয়তো একটি গাছ লাগানো, একটি বই পড়া, কিংবা কোনো অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে প্রায় সবকিছুর মূল্য নির্ধারণ করা যায়। জমির দাম আছে, স্বর্ণের দাম আছে, ডলারের দাম আছে, এমনকি মানুষের সময়েরও বাজারমূল্য নির্ধারিত হয়। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলোর কোনো দাম নেই—কারণ সেগুলোর মূল্য পরিমাপের কোনো মুদ্রা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

তাই “সুখের দাম কত?”—এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত অর্থনীতির কোনো পাঠ্যবইয়ে নেই। সুখের দাম একটি সন্তানের হাসি, একটি পরিবারের উষ্ণতা, একটি নিশ্চিন্ত ঘুম, একটি শান্ত বিবেক এবং এমন একটি জীবন, যার দিকে ফিরে তাকিয়ে মানুষ বলতে পারে—“আমি শুধু বেঁচে থাকিনি, আমি সত্যিই জীবনকে অনুভব করেছি।”

আর যে দিন আমরা এই সত্যটি বুঝতে পারব, সে দিন হয়তো উপলব্ধি করব—সুখের দাম আসলে অনেক বেশি, কারণ তা কেনা যায় না; আবার অনেক কম, কারণ তা পেতে প্রয়োজন শুধু একটি মানবিক, অর্থবহ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com

এইচআর/জেআইএম