বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং শিল্পখাতের কাঁচামাল সরবরাহের সঙ্গে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান খাদ্যচাহিদার প্রেক্ষাপটে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। এ বাস্তবতাকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ১১ জুন জাতীয় সংসদে মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খাতগুলোর জন্য মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন। যা দেশের মোট জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ।
Advertisement
অপরদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা, যা ছিল জিডিপির ০.৬১ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরে এ তিন খাতে ৬ হাজার ২০৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ বৃদ্ধি সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।
কৃষিখাতের গুরুত্ববাংলাদেশের কৃষি কেবল খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। দেশের লাখ লাখ কৃষক, মাছ চাষি, খামারি এবং কৃষি উদ্যোক্তা এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কৃষির উন্নয়ন মানেই গ্রামীণ অর্থনীতির চাঙা হওয়া, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাস। বর্তমান বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তা একটি কৌশলগত বিষয়। বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
বাজেটের নীতিগত অগ্রাধিকার খাদ্য নিরাপত্তা ও উৎপাদন বৃদ্ধিসরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ ও পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করা। এ জন্য উচ্চফলনশীল জাতের ফসল সম্প্রসারণ, উন্নত বীজ ব্যবহার, গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। খাদ্যশস্যের পাশাপাশি শাক-সবজি, ফল-মূল, ডাল, তেলবীজ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
Advertisement
কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান সহায়ক হচ্ছে সরকারি ভর্তুকি। সার, বীজ, সেচ এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণে ভর্তুকি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। নতুন বাজেটে কৃষি ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ভর্তুকি কৃষকদের জন্য বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করবে।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণশ্রমিক সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। আধুনিক কৃষিযন্ত্র যেমন কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, পাওয়ার টিলারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে। যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল সংগ্রহে সময় কমবে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং কৃষির আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত হবে।
আরও পড়ুন প্রকৃতির তিনটি উপাদান জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ডিজিটাল কৃষি ও স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিচতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার বিকল্প নেই। নতুন বাজেটে ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি, তথ্যভিত্তিক কৃষি সেবা, কৃষি অ্যাপস, অনলাইন পরামর্শ এবং আধুনিক ডেটা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ড্রোন প্রযুক্তি, সয়েল সেন্সর, আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি পরামর্শ, স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতের কৃষিকে আরও কার্যকর ও লাভজনক করে তুলতে পারে।
কৃষক কার্ড কর্মসূচিএবারের বাজেটে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো কৃষক কার্ড কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় কৃষক কার্ডধারী প্রান্তিক কৃষকেরা বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা পাবেন। এ খাতে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ উদ্যোগ কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি কৃষি কার্যক্রমে উৎসাহ জোগাবে এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে।
Advertisement
বাংলাদেশে কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, গুদামজাতকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এ ক্ষতি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষক যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, সেজন্য বাজার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল বিপণন এবং সরাসরি বাজার সংযোগ স্থাপনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষকের ঋণ মওকুফ ও আর্থিক সহায়তাপ্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, খরা কিংবা বাজারমূল্যের অস্থিরতার কারণে অনেক কৃষক আর্থিক সংকটে পড়েন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ মওকুফ বা বিশেষ আর্থিক সহায়তার বিষয়গুলো নীতিগত আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশেষ গুরুত্বপ্রাপ্ত বিষয়সমূহ কৃষিপণ্যে কর-সুবিধা ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগকৃষিখাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে কৃষিপণ্যে বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধা ও প্রণোদনা কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবে। এতে কৃষিভিত্তিক শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণকৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদনে আগ্রহ কমে যেতে পারে। তাই কৃষিপণ্য সংগ্রহ কার্যক্রম সম্প্রসারণ, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন সবুজ বাংলাদেশ গড়তে পরিবেশ সুরক্ষার বিকল্প নেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারগবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে কৃষিকে আরও লাভজনক করা সম্ভব। উন্নত জাতের বীজ, জৈবপ্রযুক্তি, জলবায়ু সহনশীল ফসল এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা খাদ্য উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।
সেচ সুবিধা সম্প্রসারণকৃষি উৎপাদনের জন্য সেচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাল পুনঃখনন, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি এবং পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
কৃষিতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জোরদারডিজিটাল তথ্যভান্ডার, কৃষক নিবন্ধন, কৃষি উপকরণ বিতরণ, বাজার তথ্য এবং অনলাইন সেবার মাধ্যমে কৃষিখাতকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা যাবে। এতে সরকারি সহায়তা প্রকৃত কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছানো সহজ হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সম্ভাবনাবাংলাদেশে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। মাছ, দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি রপ্তানি আয়ের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। নতুন বাজেটে এ খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে খামার ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, উন্নত জাত সম্প্রসারণ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
টেকসই কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাবাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। বন্যা, লবণাক্ততা, খরা এবং ঘূর্ণিঝড় কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অভিযোজন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এ বাজেটে টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন কৃষিতে কার্বন প্রযুক্তি: নতুন দিগন্ত২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। অতিরিক্ত ৬ হাজার ২০৯ কোটি টাকার বরাদ্দ শুধু একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের কল্যাণ, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার প্রতি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রতিফলন। যদি এ বরাদ্দ যথাযথ পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তবে কৃষিখাত আরও আধুনিক, উৎপাদনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। ফলে কৃষকের জীবনমান উন্নত হবে, খাদ্যনিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং বাংলাদেশ একটি টেকসই ও স্মার্ট কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
এসইউ