লাইফস্টাইল

ঐশ্বরিয়ার এই লাল লেহেঙ্গা তৈরিতে লেগেছিল ছয় মাস

 

বলিউডের ইতিহাসে কিছু পোশাক আছে, যেগুলো শুধু সিনেমার কস্টিউম হয়ে থাকেনি-সময়ের সঙ্গে সেগুলো ফ্যাশনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ‘যোধা আকবর’-এ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের পরা লাল লেহেঙ্গাটি ঠিক তেমনই এক সৃষ্টি।

Advertisement

মুক্তির এত বছর পরও পোশাকটি নিয়ে আলোচনা থামেনি। বরং ২০২৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যাকাডেমি মিউজিয়ামের ‘কালার ইন মোশন’ প্রদর্শনীতে জায়গা পাওয়ার পর এটি আবারও নতুন করে আলোচনায় আসে।

২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া যোধা আকবর শুধু বক্স অফিসেই সাফল্য পায়নি, বরং সেট ডিজাইন, সংগীত, অভিনয় ও কস্টিউমের জন্যও আলাদা প্রশংসা কুড়িয়েছিল। বিশেষ করে ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের রাজকীয় উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। যোধা বাঈ চরিত্রে তার পরা লাল লেহেঙ্গা অনেকের কাছেই ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে স্মরণীয় ব্রাইডাল লুকগুলোর একটি।

তবে পর্দায় যে পোশাক এত নিখুঁত দেখিয়েছে, সেটি তৈরি করতে ডিজাইনার নিতা লুল্লাকে পেরোতে হয়েছে দীর্ঘ ও কঠিন এক সৃজনশীল যাত্রা।

Advertisement

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে নীতা লুল্লা জানান, ‘যোধা আকবর’-এর জন্য তাকে প্রায় ২,৬০০ পোশাক ডিজাইন করতে হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সিনেমাটির চিত্রগ্রহণ পদ্ধতি।পরিচালক আশুতোষ গোয়ারিকর এবং সিনেমার ডিওপি অধিকাংশ দৃশ্য প্রাকৃতিক আলোতে ধারণ করছিলেন। সাধারণত ঝলমলে কাপড় বা ভারী শাইন ক্যামেরায় খুব দ্রুত চোখে পড়ে যায়। ফলে পোশাকে বাড়তি চকচকে ভাব থাকলে তা পুরো দৃশ্যের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারত।

ছবি: ডিজাইনার নীতা লুল্লা

এই কারণেই প্রতিটি লেহেঙ্গা, দোপাট্টা ও পোশাকে ম্যাট ফিনিশ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোনো ধরনের শিমার বা অতিরিক্ত উজ্জ্বলতা রাখা হয়নি। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। মুঘল আমলের রাজকীয় পোশাক মানেই জাঁকজমক, ভারী কারুকাজ আর সমৃদ্ধ অলঙ্করণ। সেখানে চাকচিক্য ছাড়াই কীভাবে একটি কনের পোশাককে রাজকীয় দেখানো যায়-সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

এই ভাবনা থেকেই ঐশ্বরিয়ার আইকনিক লাল লেহেঙ্গার নির্মাণ শুরু হয়। নীতা লুল্লা ও তার দল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন অর্গানিক কটন ও মসলিন কাপড়। এরপর কাপড়ের ওপর হাতে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি করা হয় কাসাব ও রেশমি সুতা দিয়ে, যাতে এটি ব্রোকেডের মতো সমৃদ্ধ টেক্সচার পায়।

Advertisement

এরপর ধাপে ধাপে যুক্ত করা হয় গোটা পট্টি, কুন্দন ও ধাতব অলঙ্করণ। তবে পুরো কাজটিই করা হয়েছিল ম্যাট ফিনিশে, যেন পোশাকটি ক্যামেরায় বিলাসবহুল দেখায় কিন্তু অতিরিক্ত ঝলমলে না লাগে। দূর থেকে পোশাকটি ছিল রাজকীয় ও সমৃদ্ধ, অথচ কাছ থেকে দেখলে বোঝা যেত এর মৃদু, প্রায় অনুজ্জ্বল ফিনিশ। এই বৈপরীত্যই লেহেঙ্গাটিকে অন্য সব সিনেমার পোশাক থেকে আলাদা করে তোলে।

শুধু সুন্দর পোশাক বানালেই কাজ শেষ হয়নি। পুরো ডিজাইন প্রক্রিয়ার আগে নীতা লুল্লা কয়েক মাস ধরে গবেষণা করেছেন মুঘল ও রাজপুত ইতিহাস নিয়ে। তিনি কাপড়ের ধরন, মোটিফ, অলঙ্করণ ও ঐতিহাসিক নকশা নিয়ে বিস্তারিত কাজ করেন। প্রায় দুই থেকে তিন মাস গবেষণার পর শুরু হয় মূল নির্মাণ প্রক্রিয়া। এরপর আরও চার মাস সময় লাগে এমব্রয়ডারি, টেক্সচার তৈরি এবং কাপড়ে পুরনো আমলের আবহ ফুটিয়ে তুলতে।

প্রতিটি বুটি, প্রতিটি জারদৌজি নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যেন তা ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য লাগে, আবার ক্যামেরাতেও ভারী না দেখায়।

নীতা লুল্লার মতে, এই লেহেঙ্গার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো-এটি শুধু সিনেমার পোশাক হয়ে থাকেনি। বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য কনে নিজেদের বিয়ের দিনের জন্য সেই একই ধাঁচের লেহেঙ্গা তৈরি করিয়েছেন। একটি সিনেমার পোশাক যখন বাস্তব জীবনের মানুষের স্বপ্নের অংশ হয়ে যায়, তখন সেটি কেবল কস্টিউম থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক স্মৃতি।

‘যোধা আকবর’-এর লাল লেহেঙ্গাটি ঠিক সেই জায়গাতেই পৌঁছেছে। সময় বদলেছে, ফ্যাশনের ধারা বদলেছে, কিন্তু ঐশ্বর্য রাইয়ের সেই রাজকীয় লুক এখনো ভারতীয় ব্রাইডাল ফ্যাশনের অন্যতম অনুপ্রেরণা।

বিশ্বজুড়ে ১১০ কোটির বেশি আয় করা যোধা আকবর শুধু ব্যবসায়িকভাবেই সফল হয়নি, বরং কস্টিউম ডিজাইনকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। আর সেই সাফল্যের বড় অংশজুড়ে আজও জ্বলজ্বল করে ঐশ্বর্য রাইয়ের সেই আইকনিক লাল লেহেঙ্গা।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

জেএস/