স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য চালু করা ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার নো-ফ্রিলস (এনএফএ) ব্যাংক হিসাবগুলোতে আমানত ও হিসাব সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে ৫১৯ কোটি টাকা, হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ১০ লাখ ৮০ হাজার ১১৯টি।
Advertisement
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ২০১০ সালে সরকার ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে বিশেষ হিসাব খোলার সুযোগ চালু করে।
নো-ফ্রিলস নামে পরিচিত এসব হিসাবে ন্যূনতম ব্যালেন্স রাখার বাধ্যবাধকতা নেই, নেই কোনো সার্ভিস চার্জও। কৃষক, পোশাকশ্রমিক, অতি দরিদ্র, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এ সুবিধা পাচ্ছেন। সাধারণ সঞ্চয় হিসাবের তুলনায় এসব হিসাবে তুলনামূলক বেশি সুদও দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে নো-ফ্রিলস হিসাবগুলোতে মোট আমানত ছিল ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪০৭ কোটি টাকায়। ফলে এক বছরে আমানত বেড়েছে ৫১৯ কোটি টাকা বা ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
Advertisement
শুধু এক বছরের নয়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেও আমানতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তা বেড়ে ৫ হাজার ৪০৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ তিন মাসে আমানত বেড়েছে ২৯১ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
হিসাব সংখ্যার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে নো-ফ্রিলস হিসাব ছিল ২ কোটি ৮২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৭০টি। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৩ লাখ ১৬ হাজার ৮৮৯টিতে। অর্থাৎ এক বছরে নতুন হিসাব যুক্ত হয়েছে ১০ লাখ ৮০ হাজার ১১৯টি।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে হিসাবের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৯২ লাখ ৩২ হাজার ৫৭০টি। তিন মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৯৩ লাখ ১৬ হাজার ৮৮৯টি। এ সময়ে নতুন হিসাব বেড়েছে ৮৪ হাজার ৩১৯টি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, নো-ফ্রিলস হিসাবের মাধ্যমে প্রবাসী আয়ও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এসব হিসাবের মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছিল ৮২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪৫ কোটি ১৭ লাখ টাকায়। ফলে তিন মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
Advertisement
খাতভিত্তিক আমানতের চিত্রেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে কৃষকদের আমানত বেড়ে হয়েছে ৮৬৩ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ৮০৮ কোটি টাকা। পোশাকশ্রমিকদের আমানত ৪৭৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০৬ কোটি টাকা। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের আমানত এক হাজার ৮০৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯০২ কোটি টাকায়।
তবে অতি দরিদ্রদের আমানত ৩৪৭ কোটি টাকা থেকে কমে ২৭৭ কোটি টাকায় নেমেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের হিসাবে আমানত প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ৯৯০ কোটি টাকায় রয়েছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, গত বছরের রাজনৈতিক ও আর্থিক অস্থিরতার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষও আবার ব্যাংকে সঞ্চয় রাখতে আগ্রহী হচ্ছেন। একই সঙ্গে আর্থিক খাত স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগও আমানত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ব্যাংক খাত গবেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, নো-ফ্রিলস হিসাবে আমানত ও হিসাব বৃদ্ধির প্রবণতা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ইতিবাচক প্রতিফলন। সরকারি ভাতা, কৃষি সহায়তা, শ্রমিকদের মজুরি এবং প্রবাসী আয়ের একটি অংশ সরাসরি ব্যাংক হিসাবে বিতরণ হওয়ায় এসব হিসাবে অর্থের প্রবাহ বেড়েছে।
তিনি বলেন, ন্যূনতম জমা বা সার্ভিস চার্জ না থাকা এবং তুলনামূলক বেশি সুদের সুবিধা নিম্ন আয়ের মানুষকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা বাড়ায় আগে যারা নগদ অর্থ বা অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে সঞ্চয় করতেন, তাদের অনেকেই এখন ব্যাংকমুখী হচ্ছেন।
তবে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, আমানতকারীদের আস্থা বজায় রাখা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তার মতে, সাম্প্রতিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আমানত বৃদ্ধির গতি কমে যেতে পারে।
ইএআর/কেএসআর